খেলাপি ঋণ ও ঋণ পুনরুদ্ধার আইন: মামলাজট আর বিচারিক দীর্ঘসূত্রতায় বাঁধা কোথায়? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

খেলাপি ঋণ ও ঋণ পুনরুদ্ধার আইন: মামলাজট আর বিচারিক দীর্ঘসূত্রতায় বাঁধা কোথায়?

অ্যাডভোকেট সাব্বির  avatar   
অ্যাডভোকেট সাব্বির
খেলাপি ঋণ ও ঋণ পুনরুদ্ধার আইন: মামলাজট আর বিচারিক দীর্ঘসূত্রতায় বাঁধা কোথায়?
খেলাপি ঋণ ও ঋণ পুনরুদ্ধার আইন: মামলাজট আর বিচারিক দীর্ঘসূত্রতায় বাঁধা কোথায়?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা, যা ...

সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত তথ্যমতে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে রেকর্ড ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৯.০৯ শতাংশ। এই বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণ কেবল আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতাকেই চ্যালেঞ্জ করছে না, বরং এর পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া নিয়ে বিদ্যমান আইন ও বিচারিক ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। বিশেষ করে, অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ এর অধীনে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতা এবং কার্যকর পদক্ষেপের অভাব ব্যাংকগুলোর ঋণ পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টাকে প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত করছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

খেলাপি ঋণের এই ঊর্ধ্বগতি এবং তা পুনরুদ্ধারে ব্যর্থতার মূলে রয়েছে বেশ কয়েকটি জটিল কারণ, যার মধ্যে আইনি ও বিচারিক দীর্ঘসূত্রতাই অন্যতম। বর্তমান আইন অনুযায়ী, খেলাপি ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকগুলোকে অর্থঋণ আদালতে মামলা করতে হয়। কিন্তু এই মামলাগুলো নিষ্পত্তি হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (BIBM)-এর এক গবেষণা অনুযায়ী, অর্থঋণ আদালতের মামলা নিষ্পত্তির গড় সময় প্রায় পাঁচ বছর, যা অনেক ক্ষেত্রে ১০ বছরও ছাড়িয়ে যায়। এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে একদিকে যেমন ঋণের পরিমাণ সুদ ও আনুষঙ্গিক খরচ বেড়ে আরও স্ফীত হয়, তেমনি অন্যদিকে ঋণখেলাপিরা আইনি মারপ্যাঁচ ব্যবহার করে সময়ক্ষেপণের সুযোগ পায়। এমনকি, উচ্চ আদালতে আপিলের সুযোগও অনেক সময় ঋণ পুনরুদ্ধারে বিলম্ব ঘটায়, যা ব্যাংকের তারল্য সংকট এবং নতুন বিনিয়োগে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলেছে পর্যাপ্ত বিচারক ও আদালতের অভাব এবং বিচারিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম হওয়ায় প্রতিটি আদালতে মামলার স্তূপ তৈরি হয়। এছাড়াও, বিচারকদের প্রশিক্ষণ ও আধুনিক বিচারিক প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত হওয়ায় দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে, ঋণখেলাপিদের রাজনৈতিক বা অন্যান্য প্রভাবের কারণেও মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হয় না বলে অভিযোগ ওঠে। সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো এক্ষেত্রে বিশেষ ক্ষতির সম্মুখীন হয়, কারণ তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ এবং পুনরুদ্ধারের হার বেসরকারি ব্যাংকের তুলনায় সাধারণত কম। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এই সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও, সমন্বিত ও কার্যকর প্রয়োগের অভাবে তা সফল হচ্ছে না। জামানতবিহীন ঋণের ক্ষেত্রে ঋণ আদায়ের প্রক্রিয়া আরও জটিল হয়ে পড়ে, কারণ এক্ষেত্রে আদালতের বাইরে সমঝোতার সুযোগও সীমিত থাকে।

এই চলমান সংকট দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। ব্যাংকগুলো খেলাপি ঋণের বোঝা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে, যা তাদের ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা হ্রাস করে। ফলস্বরূপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা (SMEs) ঋণ পেতে সমস্যায় পড়েন, যা কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই পরিস্থিতি আর্থিক খাতের প্রতি জনমানুষের আস্থা কমাচ্ছে এবং অসাধু ঋণগ্রহীতাদের আরও উৎসাহিত করছে। খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকগুলোকে প্রভিশন (সুরক্ষিত তহবিল) রাখতে হয়, যা তাদের মুনাফা কমিয়ে দেয় এবং শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ প্রদানে বাধা দেয়। এটি সামগ্রিকভাবে পুঁজিবাজারের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

সাল মোট বিতরণকৃত ঋণ (কোটি টাকা) খেলাপি ঋণ (কোটি টাকা) খেলাপি ঋণের হার (%) অর্থঋণ আদালতের বিচারাধীন মামলা (সংখ্যা)
২০১৮ ৯,৯৩,৪০০ ১,০৩,২৭৪ ১০.৩০ ৭৩,৪১১
২০১৯ ১০,৬১,৫০০ ১,১৬,২৮৮ ১০.৩০ ৭৬,৫০৫
২০২০ ১১,৫২,৮০০ ৮৮,৭৩৪ ৭.৬৬ ৭৭,৪৬২
২০২১ ১২,৫০,৪০০ ১,০৩,২৭৩ ৮.২৫ ৭৮,৫১২
২০২২ ১৪,৩০,২০০ ১,২০,৬৫৮ ৮.৪৩ ৮০,০৫০
২০২৩ (ডিসেম্বর) ১৬,০১,৪০০ ১,৪৫,৬৩৩ ৯.০৯ ৮১,২০০

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও BIBM গবেষণা প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩ সংশোধন করে মামলা নিষ্পত্তির সময়সীমা সুনির্দিষ্ট করা এবং আপিল প্রক্রিয়ার অপব্যবহার রোধে কঠোর বিধান প্রবর্তন করা, যাতে ঋণখেলাপিরা অযথা সময়ক্ষেপণ করতে না পারে।
  • আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তত্ত্বাবধানে অর্থঋণ আদালতের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং বিচারকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করা, যাতে বিচারাধীন মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি সম্ভব হয়।
  • সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা এবং তা অর্জনে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা, পাশাপাশি BIBM-এর গবেষণালব্ধ সুপারিশগুলো নীতি নির্ধারণে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট সাব্বির

অ্যাডভোকেট সাব্বির 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্যাংক খেলাপি ও ঋণ পুনরুদ্ধার আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator