জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ

ড. আদনান সামি  avatar   
ড. আদনান সামি
জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
ছবি: সংগৃহীত
২০২৩ সালের ডিসেম্বরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) প্রকাশিত সর্বশেষ স্বাস্থ্য বুলেটিনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য গবেষণা খাতে জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্...

২০২৩ সালের ডিসেম্বরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (DGHS) প্রকাশিত সর্বশেষ স্বাস্থ্য বুলেটিনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য গবেষণা খাতে জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তির প্রয়োগে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি, যা বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বেশ পিছিয়ে। বিশেষ করে, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস এবং সংক্রামক ব্যাধি যেমন ডেঙ্গুর জিনোমিক সিকোয়েন্সিং এবং টার্গেটেড থেরাপির গবেষণায় বিনিয়োগ ও বাস্তবায়নে লক্ষণীয় ঘাটতি রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (BSMMU) এবং ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ নিউরোসায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটাল (NINSH)-এর মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সক্ষমতা বাড়াতে হিমশিম খাচ্ছে, যা দেশের জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

জিনোমিক্স ও বায়োটেকনোলজির মতো উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো কেবল রোগের কারণ অনুসন্ধান বা শনাক্তকরণেই নয়, বরং ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা (Precision Medicine) প্রদানের ক্ষেত্রেও বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। অথচ, বাংলাদেশে এই খাতের গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে সমন্বয়ের অভাব প্রকট। যেমন, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক প্রণীত জাতীয় স্বাস্থ্য নীতিতে জিনোমিক্স গবেষণার গুরুত্ব উল্লেখ থাকলেও, এর বাস্তবায়নে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ বা পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ প্রায়শই অনুপস্থিত থাকে। ফলস্বরূপ, সংক্রামক রোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (IEDCR) কোভিড-১৯ চলাকালীন ভাইরাস সিকোয়েন্সিংয়ে প্রশংসনীয় কাজ করলেও, সেই গতিকে অন্যান্য স্থানীয় রোগের জিনোমিক গবেষণায় ধরে রাখতে পারেনি। এছাড়া, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) নতুন জিনোমিক-ভিত্তিক থেরাপি বা ডায়াগনস্টিক কিটের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় এখনো সনাতন পদ্ধতি অনুসরণ করছে, যা আন্তর্জাতিক মান ও গতিশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এর ফলে, অত্যাধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিগুলো সময়মতো দেশের রোগীদের কাছে পৌঁছাতে পারছে না, যা রোগীদের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত করছে এবং তাদের চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাড়ি দিতে বাধ্য করছে।

অপর্যাপ্ত মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাও এই খাতের ব্যর্থতার অন্যতম প্রধান কারণ। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (NIMH) মানসিক স্বাস্থ্যের জিনোমিক্স নিয়ে গবেষণার উদ্যোগ নিলেও, প্রয়োজনীয় বায়োইনফরমেটিক্স বিশেষজ্ঞ ও উচ্চপ্রযুক্তির ল্যাব সরঞ্জামের অভাবে তা পূর্ণাঙ্গ রূপ পাচ্ছে না। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জিনোমিক্স, বায়োইনফরমেটিক্স, এবং বায়োটেকনোলজি বিষয়ে উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ সীমিত। বিদ্যমান কোর্সগুলোতে আধুনিক বিশ্বের চাহিদা অনুযায়ী সিলেবাসের হালনাগাদ না থাকায়, ডিগ্রিধারীরাও আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা বা শিল্পে অবদান রাখতে পারছেন না। উপরন্তু, গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যয়বহুল রি-এজেন্ট ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে দীর্ঘসূত্রিতা এবং শুল্ক সংক্রান্ত জটিলতা গবেষকদের নিরুৎসাহিত করছে। স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বা উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে কার্যকর অংশীদারিত্ব অনুপস্থিত, যা নতুন প্রযুক্তির বিকাশে বাধা সৃষ্টি করছে। এই চিত্র বাংলাদেশের চিকিৎসা গবেষণা ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে একটি কাঠামোগত দুর্বলতাকে নির্দেশ করে, যার আশু সমাধান প্রয়োজন।

সূচক ২০১৮ ২০২০ ২০২২ ২০২৪ (প্রক্ষেপিত)
স্বাস্থ্য খাতে জিডিপি-র অংশ (%) ২.৮ ২.৫ ২.২ ২.০
জিনোমিক গবেষণা প্রকল্পে সরকারি বরাদ্দ (কোটি টাকা) ৫.০ ৪.৫ ৩.৮ ৩.০
বায়োইনফরমেটিক্স বিশেষজ্ঞের সংখ্যা (প্রায়) ১৫০ ১৭৫ ২০০ ২২০
নতুন বায়োটেক পণ্য/সেবার DGDA অনুমোদন ২ ১ ০ ১
উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি গবেষণাপত্র (প্রতি বছর) ৩২ ২৭ ২২ ১৮

উৎস: DGHS বার্ষিক প্রতিবেদন, MOHFW বাজেট বরাদ্দ বিশ্লেষণ, IEDCR গবেষণা সারসংক্ষেপ, বাংলাদেশ ব্যাংক অর্থনৈতিক সমীক্ষা

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) অবিলম্বে একটি জাতীয় জিনোমিক্স ও বায়োটেকনোলজি গবেষণা কাউন্সিল গঠন করবে, যা গবেষণা অগ্রাধিকার, তহবিল বরাদ্দ এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে একটি সমন্বিত কৌশল প্রণয়ন করবে। এই কাউন্সিলকে কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকার একটি বার্ষিক গবেষণা তহবিল প্রদান করা হবে, যার ৫০% বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে প্রতিযোগিতামূলক অনুদানের মাধ্যমে বিতরণ করা হবে।
  • ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) জিনোমিক-ভিত্তিক থেরাপি ও ডায়াগনস্টিক কিটের দ্রুত অনুমোদনের জন্য একটি 'ফাস্ট-ট্র্যাক' অনুমোদন প্রক্রিয়া চালু করবে এবং এই প্রক্রিয়ার জন্য আন্তর্জাতিক মানের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করবে। একইসাথে, DGDA-কে অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি সরঞ্জাম এবং প্রশিক্ষিত জনবল দ্বারা সজ্জিত করতে হবে, যাতে নতুন প্রযুক্তির গুণগত মান ও নিরাপত্তা যাচাই করা সহজ হয়।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) যৌথভাবে দেশের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে (যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, বিএসএমএমইউ) জিনোমিক্স, বায়োইনফরমেটিক্স এবং বায়োটেকনোলজিতে স্নাতকোত্তর ও ডক্টরাল প্রোগ্রাম চালু করবে এবং বিদ্যমান কারিকুলামকে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী আধুনিকীকরণ করবে। প্রতি বছর কমপক্ষে ৫০ জন গবেষককে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ও ফেলোশিপের ব্যবস্থা করা হবে, বিশেষ করে IEDCR এবং NIMH-এর মতো প্রতিষ্ঠানে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. আদনান সামি

ড. আদনান সামি 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

نظری یافت نشد


News Card Generator