আব্দুল কাইয়ুম নাহিদ ,সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) প্রতিনিধি :
বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে ত্রুটির কারণে এক সপ্তাহ ধরে চলমান গ্যাস সংকট দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তীব্র ভোগান্তি তৈরি করেছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও থেকে শুরু করে সারা দেশেই এর প্রভাব স্পষ্ট। এই সংকটের ফলে শিল্পকারখানাগুলি তাদের উৎপাদন কার্যক্রমে বাধার সম্মুখীন হচ্ছে, যার ফলে অর্থনৈতিক কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।
গৃহস্থালিতে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় অনেক পরিবারকে বাধ্য হয়ে মাটির চুলায় রান্না করতে হচ্ছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজেলার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, গ্যাসের অভাবে তাদের দৈনন্দিন কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটছে।
সিএনজি স্টেশনগুলোতেও গ্যাসের সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। চালকরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাচ্ছেন না, যা তাদের দৈনন্দিন আয় রোজগারের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলায় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্যাস সংকট চরম আকার ধারণ করেছে, যার ফলে জনজীবন ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। গ্যাসের অভাবে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা রান্নাবান্নার জন্য বাধ্য হয়ে মাটির চুলা ও জ্বালানি কাঠের মতো আদিম পদ্ধতির দিকে ঝুঁকছেন। এই সংকটের ফলে সোনারগাঁয়ের মানুষজন চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছেন এবং এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে, বিশেষ করে ফেসবুকে সোনারগাঁয়ের বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজে গ্যাস সংকট নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) দিনভর গ্যাস না থাকায় নেটিজেনরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এবং অনেকেই নেতিবাচক মন্তব্য ও পোস্ট করছেন। এক ক্ষুব্ধ নাগরিক লিখেছেন, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশের যুগে এসেও পেটের দায়ে ফের মাটির চুলার ধোঁয়া টানতে হচ্ছে, এর চেয়ে বড় লজ্জা আর কী হতে পারে!’
স্থানীয় গৃহিণী আসমা বেগম জানান, ‘দিনের বেলা তো দূরের কথা, রাতের গভীর কিংবা ভোরের দিকেও গ্যাসের দেখা মেলে না।’
পৌরসভার তাজপুর এলাকার বাসিন্দা শান্তা ইসলাম হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘গ্যাসের অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে রান্নার সময় পার হয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে মাটির চুলায় কাঠ পুড়িয়ে রান্না করতে হচ্ছে। এতে বাড়তি খরচ ও সময়ের অপচয়ের পাশাপাশি অস্বাস্থ্যকর ধোঁয়ায় পরিবারের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে।’
মেঘনা শিল্পাঞ্চল এলাকার বাসিন্দা নিলা আকতার বলেন, ‘চুলায় সামান্য আঁচও থাকে না। মাসের নির্ধারিত গ্যাস বিল ঠিকই দিতে হয়, অথচ রান্নার জন্য বিকল্প হিসেবে কাঠ বা অতিরিক্ত টাকা দিয়ে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে। এই গ্যাস সংকটের যন্ত্রণায় আমাদের জীবন অতিষ্ঠ।’
নাগরিকদের এই তীব্র ক্ষোভ এবং প্রতিবাদের মুখে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের মেঘনা শাখার ম্যানেজার সুরজিত সাহা জানান, গ্যাস সংকট শুধু সোনারগাঁয়ের স্থানীয় কোনো সমস্যা নয়, এটি একটি জাতীয় সমস্যা। বৈরী আবহাওয়ার কারণে এলএনজিবাহী জাহাজ থেকে গ্যাস খালাসে বিঘ্ন ঘটায় সরবরাহ কমেছে। জাতীয় গ্রিড থেকে পর্যাপ্ত গ্যাস বরাদ্দ না পাওয়ায় গ্রাহকদের চাহিদা মেটানো সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, ‘অবৈধ সংযোগ ও গ্যাস চুরির বিষয়ে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।’ এই সংকটের ফলে সোনারগাঁ এলাকায় দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় যে বিশাল প্রভাব পড়েছে, তা সমাধানের জন্য কর্তৃপক্ষের কার্যকরী পদক্ষেপ জরুরি। দীর্ঘমেয়াদী সমাধান হিসেবে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
গ্যাস সংকটের এই সমস্যা সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে জনজীবনের দুর্ভোগ আরও বাড়বে এবং স্থানীয় অর্থনীতি ও সামাজিক জীবনে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সরকারের এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্বশীল পদক্ষেপের মাধ্যমে এই সংকটের সমাধান করা জরুরি।