বাংলাদেশের স্পোর্টস সায়েন্স ও অ্যাথলিট পারফরম্যান্স: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয় | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বাংলাদেশের স্পোর্টস সায়েন্স ও অ্যাথলিট পারফরম্যান্স: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়

ড. আসিফ রায়হান  avatar   
ড. আসিফ রায়হান
বাংলাদেশের স্পোর্টস সায়েন্স ও অ্যাথলিট পারফরম্যান্স: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়
বাংলাদেশের স্পোর্টস সায়েন্স ও অ্যাথলিট পারফরম্যান্স: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত ‘ন্যাশনাল স্পোর্টস সায়েন্স ইনস্টিটিউট’ (NSSI) স্থাপনের প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই কমিটির প্রতিবেদন দেশের ক্রীড...

সম্প্রতি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত ‘ন্যাশনাল স্পোর্টস সায়েন্স ইনস্টিটিউট’ (NSSI) স্থাপনের প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই কমিটির প্রতিবেদন দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এই প্রতিবেদন বাংলাদেশের ক্রীড়া বিজ্ঞান ও অ্যাথলিট পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সংকটগুলো যেমন চিহ্নিত করেছে, তেমনি বিশ্বমানের ক্রীড়া অবকাঠামো এবং বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক সাফল্য অর্জনের একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপও তুলে ধরেছে। বিশেষত, ২০২৪ প্যারিস অলিম্পিকে বাংলাদেশের কোনো অ্যাথলেটের সরাসরি যোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থতা এবং বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স র‍্যাঙ্কিংয়ে শীর্ষ ১০০-এ নামমাত্র উপস্থিতি, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বনে প্রশিক্ষণের অভাবকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে, NSSI-এর মতো একটি প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা কেবল সময়ের দাবি নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী ক্রীড়া উন্নয়নের জন্য একটি অপরিহার্য পদক্ষেপ।

বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে অ্যাথলিট পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে মূল সংকটগুলির মধ্যে অন্যতম হলো আধুনিক ক্রীড়া বিজ্ঞানের প্রয়োগে অপ্রতুলতা। ফিজিওলজি, বায়োমেকানিক্স, স্পোর্টস নিউট্রিশন, স্পোর্টস সাইকোলজি এবং ডাটা অ্যানালাইসিসের মতো অত্যাবশ্যকীয় ক্ষেত্রগুলোতে বিশেষজ্ঞের অভাব প্রকট। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (BOA) এবং বিভিন্ন জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোর বাজেট বরাদ্দে ক্রীড়া বিজ্ঞান গবেষণার জন্য বরাদ্দ খুবই সীমিত, যা অ্যাথলেটদের শারীরিক সক্ষমতা, আঘাত প্রতিরোধ ও পুনরুদ্ধার, এবং মানসিক প্রস্তুতির বিজ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নে বড় বাধা। World Bank-এর এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ক্রীড়া গবেষণায় বিনিয়োগের দিক থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে, যেখানে প্রতিবেশী দেশ ভারত ও শ্রীলঙ্কা তাদের ক্রীড়া বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশ ক্রীড়া বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উন্নয়নে ব্যয় করছে। এর ফলস্বরূপ, আমাদের অ্যাথলেটরা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় প্রায়শই শারীরিক ও মানসিক দৃঢ়তার অভাবে পিছিয়ে পড়ছে, যা তাদের ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স এবং সামগ্রিক দলের ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

তবে, এই সংকটের মধ্যেও রয়েছে অপার সম্ভাবনা। বাংলাদেশের তরুণ জনসংখ্যা এবং খেলাধুলার প্রতি তাদের সহজাত আগ্রহ একটি বিশাল শক্তি। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত ‘জাতীয় ক্রীড়া নীতি ২০১৯’-এ ক্রীড়া বিজ্ঞান ও আধুনিক প্রশিক্ষণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে, যা একটি ইতিবাচক দিক। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) তাদের ‘Sports for Development’ কর্মসূচির আওতায় উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ক্রীড়া অবকাঠামো এবং প্রশিক্ষণ পদ্ধতিতে বিনিয়োগের সুযোগ দিচ্ছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে অত্যাধুনিক স্পোর্টস ল্যাবরেটরি, অ্যাথলেটিকস ট্র্যাক, উচ্চতা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং ফিটনেস ফ্যাসিলিটি তৈরি করা সম্ভব। এছাড়া, বিদেশি প্রশিক্ষক এবং ক্রীড়া বিজ্ঞানীদের সাথে সহযোগিতামূলক চুক্তি স্থাপন করে স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের ক্রীড়া বিজ্ঞান ভিত্তিকে শক্তিশালী করবে। বিশেষ করে, ক্রিকেট এবং ফুটবল ছাড়াও আরচারি, শুটিং, সুইমিং এবং অ্যাথলেটিক্সের মতো অলিম্পিক ডিসিপ্লিনগুলোতে বৈজ্ঞানিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অ্যাথলেটদের পারফরম্যান্স আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। ক্রীড়া ডাটা অ্যানালাইসিস প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতিটি অ্যাথলেটের পারফরম্যান্সের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ এবং ব্যক্তিগত প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করা গেলে তা তাদের সক্ষমতাকে বহুলাংশে বাড়িয়ে দেবে।

সূচক ২০১৫ ২০২০ ২০২৪ (প্রাথমিক)
ক্রীড়া বিজ্ঞান গবেষণায় জাতীয় বাজেটের শতাংশ ০.০৫% ০.০৭% ০.০৮%
জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনগুলির স্পোর্টস সায়েন্টিস্ট নিয়োগের হার ১০% ১৫% ১৮%
আন্তর্জাতিক অলিম্পিক ডিসিপ্লিনে শীর্ষ ৫০ র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশী অ্যাথলেট ১ ০ ০
জাতীয় ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অত্যাধুনিক ল্যাবের সংখ্যা ২ ৩ ৩

উৎস: যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন, World Bank ক্রীড়া উন্নয়ন প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রস্তাবিত ‘ন্যাশনাল স্পোর্টস সায়েন্স ইনস্টিটিউট’ (NSSI) দ্রুততম সময়ে প্রতিষ্ঠা করা এবং এর জন্য বাংলাদেশ সরকারের বার্ষিক বাজেটে একটি সুনির্দিষ্ট ও পর্যাপ্ত বরাদ্দ নিশ্চিত করা। এই ইনস্টিটিউটের অধীনে বায়োমেকানিক্স, স্পোর্টস ফিজিওলজি, স্পোর্টস নিউট্রিশন ও স্পোর্টস সাইকোলজির মতো বিভাগগুলো স্থাপন করে আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়া বিজ্ঞানী ও প্রশিক্ষক নিয়োগের পাশাপাশি দেশীয় বিশেষজ্ঞদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
  • বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (BOA) এবং সংশ্লিষ্ট জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে তাদের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (ADP) ন্যূনতম ২০% বাজেট ক্রীড়া বিজ্ঞান গবেষণা, অ্যাথলিট মনিটরিং এবং আঘাত প্রতিরোধ ও পুনরুদ্ধারের জন্য বরাদ্দ রাখা। World Bank এবং ADB-এর 'Sports for Development' কর্মসূচির অধীনে প্রাপ্ত ঋণ বা অনুদান ব্যবহার করে বৈজ্ঞানিক সরঞ্জাম ক্রয় এবং বিদেশি বিশেষজ্ঞ আনার জন্য একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়া তৈরি করা।
  • জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (NSC) কর্তৃক ‘ক্রীড়া বিজ্ঞান প্রয়োগ ও অ্যাথলিট পারফরম্যান্স উন্নয়ন নীতিমালা’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা, যেখানে সকল জাতীয় দলের জন্য নির্দিষ্ট ক্রীড়া বিজ্ঞানী, ফিজিওথেরাপিস্ট ও মনোবিজ্ঞানী নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা হবে। এই নীতিমালার আওতায় স্কুল পর্যায় থেকে প্রতিভাবান অ্যাথলেটদের বিজ্ঞানভিত্তিক নির্বাচন, প্রশিক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদী পরিচর্যার জন্য একটি জাতীয় ডাটাবেজ তৈরি করা এবং নিয়মিত তাদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. আসিফ রায়হান

ড. আসিফ রায়হান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: স্পোর্টস সায়েন্স ও অ্যাথলিট পারফরম্যান্স। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator