ঘরোয়া ক্রীড়া একাডেমি: শুধু ক্রিকেট-ফুটবল কেন, অন্যান্য খেলার ভবিষ্যৎ কী? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ঘরোয়া ক্রীড়া একাডেমি: শুধু ক্রিকেট-ফুটবল কেন, অন্যান্য খেলার ভবিষ্যৎ কী?

কামরুল ইসলাম  avatar   
কামরুল ইসলাম
ঘরোয়া ক্রীড়া একাডেমি: শুধু ক্রিকেট-ফুটবল কেন, অন্যান্য খেলার ভবিষ্যৎ কী?
ঘরোয়া ক্রীড়া একাডেমি: শুধু ক্রিকেট-ফুটবল কেন, অন্যান্য খেলার ভবিষ্যৎ কী?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৪-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের চলমান ক্রীড়া একাডেমিগুলোর ৯২ শতাংশই ক্রিকেট ও ফুটবলকে কেন্দ্র করে গড়...

সম্প্রতি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৪-এ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের চলমান ক্রীড়া একাডেমিগুলোর ৯২ শতাংশই ক্রিকেট ও ফুটবলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি বাংলাদেশের ক্রীড়া অঙ্গনে একটি গভীর প্রবণতার প্রতিচ্ছবি, যেখানে অন্যান্য সম্ভাবনাময় খেলার ভবিষ্যৎ অনেকটাই অনুজ্জ্বল থেকে যাচ্ছে। ঢাকার সাভারের জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ একাডেমি থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যায়ের ছোট ছোট উদ্যোগ পর্যন্ত, সর্বত্রই যেন এই দুটি খেলার একচ্ছত্র আধিপত্য। অথচ, একুশ শতকের প্রতিযোগিতামূলক ক্রীড়া বিশ্বে শুধুমাত্র দু-একটি খেলার ওপর নির্ভর করে আন্তর্জাতিক সাফল্য অর্জন করা এক অলীক স্বপ্নমাত্র।

এই একপেশে প্রবণতার মূল কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যায়, বাণিজ্যিকীকরণ ও তাৎক্ষণিক সাফল্যের প্রত্যাশা একটি বড় ভূমিকা পালন করে। ক্রিকেট ও ফুটবলের মতো জনপ্রিয় খেলাগুলোতে বিনিয়োগ করলে স্পনসরশিপ ও মিডিয়া কাভারেজ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে, যা একাডেমির আর্থিক স্থায়িত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে, এই বাণিজ্যিকীকরণ একটি চক্র তৈরি করে, যেখানে অন্যান্য খেলাগুলো প্রয়োজনীয় তহবিল ও অবকাঠামোর অভাবে পিছিয়ে পড়ে। উদাহরণস্বরূপ, সাঁতার, অ্যাথলেটিক্স, ভলিবল বা হ্যান্ডবলের মতো খেলাগুলোর জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষক, সরঞ্জাম ও অনুশীলন সুবিধার অভাব প্রকট। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্থানীয় পর্যায়ে যে সীমিত সুযোগ-সুবিধা আছে, সেগুলোর মানও আন্তর্জাতিক মানের ধারেকাছে নেই। বাংলাদেশ সরকারের ক্রীড়া নীতিমালায় সকল খেলার সমান বিকাশের কথা বলা হলেও, মাঠ পর্যায়ে এর প্রতিফলন খুবই দুর্বল। World Bank-এর 'Sports for Development' বিষয়ক এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যেসব দেশে ক্রীড়া অবকাঠামো বহুমুখী, সেসব দেশের তরুণদের মধ্যে শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিক স্বাস্থ্যের উন্নতি তুলনামূলকভাবে বেশি। বাংলাদেশে এই ভারসাম্যহীনতা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় ক্রীড়া প্রতিভার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে।

শুধু অবকাঠামো বা আর্থিক সীমাবদ্ধতাই নয়, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিও এই সমস্যার একটি বড় অংশ। অভিভাবক ও তরুণদের মধ্যেও ক্রিকেট-ফুটবলের প্রতি এক ধরনের সহজাত আকর্ষণ তৈরি হয়েছে, যা অন্যান্য খেলার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের ক্রীড়া কার্যক্রমেও এই দুটি খেলার প্রাধান্য থাকে, ফলে ছোটবেলা থেকেই শিশুরা অন্য খেলাধুলা সম্পর্কে জানতে বা অনুশীলন করতে আগ্রহী হয় না। Asian Development Bank (ADB)-এর 'Youth Sports Participation in South Asia' শীর্ষক একটি গবেষণা পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও মিডিয়া প্রচারণার অভাব অন্যান্য খেলার প্রতি জনরুচি তৈরিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। যদি সরকার এবং সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করে, তাহলে ব্যাডমিন্টন, টেবিল টেনিস, হকি, কাবাডি বা এমনকি মার্শাল আর্টের মতো খেলাগুলোও জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য সাফল্য আনতে পারে। প্রয়োজন শুধু সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, প্রশিক্ষক উন্নয়ন কর্মসূচি এবং প্রতিটি জেলার জন্য অন্তত একটি বহুমুখী ক্রীড়া কমপ্লেক্স স্থাপন। এই বহুমুখী একাডেমিগুলো কেবল খেলাধুলাই নয়, ক্রীড়া বিজ্ঞান, পুষ্টি ও মনোবিজ্ঞানের মতো সহায়ক ক্ষেত্রগুলোতেও প্রশিক্ষণ প্রদান করতে পারে।

খেলার ধরন মোট একাডেমির সংখ্যা (২০২৩) জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে নিবন্ধিত খেলোয়াড় (২০২৩) আন্তর্জাতিক পদক প্রাপ্তি (২০২০-২০২৩)
ক্রিকেট ৪৫০ ১,৫০,০০০ ১২ (দলগত ও ব্যক্তিগত)
ফুটবল ৩২০ ১,২০,০০০ ৭ (দলগত)
অন্যান্য (সাঁতার, অ্যাথলেটিক্স, হকি, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন ইত্যাদি) ৮০ ৩০,০০০ ৫ (ব্যক্তিগত)

উৎস: যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ক্রীড়া পরিষদ (জাতীয় ক্রীড়া একাডেমি সমীক্ষা ২০২৪)

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় অবিলম্বে 'বহুমুখী ক্রীড়া একাডেমি স্থাপন নীতিমালা' প্রণয়ন করুক, যেখানে প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন মাল্টি-স্পোর্টস একাডেমি স্থাপনের রূপরেখা থাকবে এবং এর জন্য বাংলাদেশ সরকারের বার্ষিক বাজেটে সুনির্দিষ্ট বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে।
  • জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এবং সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া ফেডারেশনগুলো যৌথভাবে একটি 'জাতীয় প্রতিভা অন্বেষণ ও উন্নয়ন কর্মসূচি' চালু করুক, যা ক্রিকেট-ফুটবলের বাইরেও অন্যান্য খেলার জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ ক্যাম্প এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষক নিয়োগের ব্যবস্থা করবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যক্রমে 'শারীরিক শিক্ষা ও ক্রীড়া বিজ্ঞান' অন্তর্ভুক্ত করে অন্যান্য খেলার নিয়মকানুন, ইতিহাস এবং স্বাস্থ্যগত উপকারিতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করুক, এবং স্কুলভিত্তিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ক্রিকেট ও ফুটবলের পাশাপাশি অন্তত তিনটি ভিন্ন খেলার বাধ্যতামূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য 'শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্রীড়া উন্নয়ন আইন' সংশোধন করুক।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ঘরোয়া স্পোর্টস অবকাঠামো ও একাডেমি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator