রোহিঙ্গা ত্রাণে অনিয়ম: জাতিসংঘের অডিটে গুরুতর অব্যবস্থাপনা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

রোহিঙ্গা ত্রাণে অনিয়ম: জাতিসংঘের অডিটে গুরুতর অব্যবস্থাপনা

আরাফাত হোসেন  avatar   
আরাফাত হোসেন
রোহিঙ্গা ত্রাণে অনিয়ম: জাতিসংঘের অডিটে গুরুতর অব্যবস্থাপনা
রোহিঙ্গা ত্রাণে অনিয়ম: জাতিসংঘের অডিটে গুরুতর অব্যবস্থাপনা
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য পরিচালিত মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে গুরুতর অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম এবং ত্রাণ সহায়তার অপব্যবহার...

বাংলাদেশের কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীর জন্য পরিচালিত মানবিক সহায়তা কার্যক্রমে গুরুতর অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম এবং ত্রাণ সহায়তার অপব্যবহারের চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা সংস্থা অফিস অব ইন্টারনাল ওভারসাইট সার্ভিসেস (ওআইওএস)-এর একটি প্রতিবেদনে এই চিত্র প্রকাশিত হয়েছে, যা রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও এনজিও খাতের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের ওপর পরিচালিত এই অডিটে ইউএনএইচসিআর (UNHCR) পরিচালিত রোহিঙ্গা সহায়তা প্রকল্পগুলোতে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম এবং স্বার্থের সংঘাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই প্রতিবেদন এমন এক সময়ে এসেছে যখন রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে নিরাপত্তা পরিস্থিতি ক্রমেই অবনতি হচ্ছে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এনজিও কার্যক্রম নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে।

জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে ইউএনএইচসিআর-এর বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো আনা হয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এতে দেখা গেছে, একই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, নকশা প্রণয়ন এবং বৈদ্যুতিক স্থাপনার কাজ করানো হয়েছে, যা স্পষ্টভাবে স্বার্থের সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। এটি কেবল আর্থিক অনিয়মের ইঙ্গিত দেয় না, বরং সমগ্র সহায়তা কার্যক্রমের নৈতিক ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। অতীতেও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন এনজিওর বিরুদ্ধে ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ২০১৮ সালের প্রথম দিকে, নয়টি এনজিওর বিরুদ্ধে নিম্নমানের পণ্য কিনে প্যাকেটে ভরে বেশি খরচ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। এসব এনজিওকে এনজিওবিষয়ক ব্যুরো তলব করেছিল। এমনকি কিছু এনজিওর বিরুদ্ধে এখতিয়ারবহির্ভূত কার্যক্রম পরিচালনা এবং রাষ্ট্রের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও ছিল। ২০১৯ সালে, ৪১টি এনজিওকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ভেতরে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, কারণ তাদের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের উস্কানি দেওয়া, নির্ধারিত শর্তাদি ভঙ্গ করা এবং প্রত্যাবাসনবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে কেবল আর্থিক অনিয়মই নয়, সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিও উদ্বেগজনকভাবে খারাপ হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে ক্যাম্পগুলোতে হত্যা, অপহরণ, মাদক পাচার, চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী তৎপরতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ২০২৩ সালের জুলাই মাসে এক প্রতিবেদনে জানায় যে, বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং অপরাধী চক্রের সহিংসতা থেকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের রক্ষা করতে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিচ্ছে না। আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (আরসা) সহ তিনটি সন্ত্রাসী গ্রুপ এবং সাতটি ডাকাত দল ক্যাম্পগুলোতে সক্রিয় রয়েছে। এই অস্থিতিশীল পরিবেশ একদিকে যেমন মানবিক সহায়তা কার্যক্রমকে ব্যাহত করছে, তেমনি অন্যদিকে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার দাবি জানিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘস্থায়ী প্রভাবে স্থানীয়রা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন এবং এনজিওগুলোর কার্যক্রমে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

সরকার রোহিঙ্গা ক্যাম্পের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এবং এনজিও কার্যক্রমের ওপর নজরদারি বাড়াতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে নতুন কৌশল গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে রয়েছে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা এবং গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি। দেশি-বিদেশি এনজিওগুলোকে তাদের সব কর্মীর তালিকা ও সব ধরনের সরঞ্জাম নিয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসকের কাছে রিপোর্ট করতে হয় এবং তাদের রাষ্ট্র, সরকার ও প্রত্যাবাসনবিরোধী কার্যক্রমে জড়িত না থাকার বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এনজিও বিষয়ক ব্যুরোও এনজিও খাতে আর্থিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নিরীক্ষার মানোন্নয়নে পরামর্শ সভা আয়োজন করছে। তবে, সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক দাতাগোষ্ঠীর অর্থায়ন কমে যাওয়ায় মানবিক সহায়তা প্রকল্পগুলো সংকুচিত হয়ে পড়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ক্যাম্পে কর্মরত হাজারো স্থানীয় নারী-পুরুষের ওপর, বিশেষ করে নারীরা চাকরি হারিয়ে মানসিক অবসাদ ও হতাশার শিকার হচ্ছেন। তহবিল সংকটের কারণে অনেক রোহিঙ্গা নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি নিয়ে ট্রানজিট ক্যাম্প থেকে মূল ক্যাম্পে ফিরতে বাধ্য হচ্ছেন।

এই সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও এনজিও খাতের সমস্যাগুলো কেবল বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং কাঠামোগত দুর্বলতা এবং সমন্বয়হীনতার ফল। এক দশক ধরে চলমান এই সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহায়তা অপরিহার্য হলেও, সেই সহায়তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এনজিওগুলোর মধ্যে জবাবদিহিতার অভাব, স্থানীয় প্রশাসনের সাথে সমন্বয়হীনতা এবং কিছু ক্ষেত্রে অসৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করার প্রবণতা এই সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। এছাড়াও, ক্যাম্পের অভ্যন্তরে অপরাধী চক্রের বিস্তার এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে এনজিওদের সম্পর্কের টানাপোড়েন পরিস্থিতিকে আরও নাজুক করে তুলেছে। ত্রাণের অর্থ আত্মসাৎ, নিম্নমানের সামগ্রী সরবরাহ এবং পরিবেশের ক্ষতি করার মতো অভিযোগগুলো এই খাতের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

সুপারিশ: রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও এনজিও খাতের এই গভীর সংকট নিরসনে একটি সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা আবশ্যক। প্রথমত, জাতিসংঘের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, এনজিও বিষয়ক ব্যুরো এবং স্থানীয় প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয় আরও জোরদার করতে হবে, যাতে এনজিও কার্যক্রমের ওপর সার্বক্ষণিক ও নিবিড় নজরদারি নিশ্চিত করা যায়। তৃতীয়ত, এনজিওদের আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন অডিট প্রক্রিয়া চালু করা উচিত, যেখানে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে। চতুর্থত, ক্যাম্পের নিরাপত্তা জোরদার করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। পঞ্চমত, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা এবং তাদের অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একটি কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে, যাতে এনজিও কার্যক্রমের কারণে তারা ক্ষতিগ্রস্ত না হন। পরিশেষে, তহবিল সংকটের দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাথে নিবিড় আলোচনা চালিয়ে যেতে হবে এবং মানবিক সহায়তার প্রতিটি অর্থ যেন প্রকৃত অর্থে ক্ষতিগ্রস্তদের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: আরাফাত হোসেন

আরাফাত হোসেন, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: রোহিঙ্গা ক্যাম্প ও এনজিও (NGO) অডিট।

Walang nakitang komento


News Card Generator