প্যারিস ২০২৪: বাংলাদেশের অ্যাথলেটিক্সের 'ওয়াইল্ড কার্ড' নির্ভরতা ও ভবিষ্যৎ পথ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

প্যারিস ২০২৪: বাংলাদেশের অ্যাথলেটিক্সের 'ওয়াইল্ড কার্ড' নির্ভরতা ও ভবিষ্যৎ পথ

রায়হান রশীদ  avatar   
রায়হান রশীদ
প্যারিস ২০২৪: বাংলাদেশের অ্যাথলেটিক্সের 'ওয়াইল্ড কার্ড' নির্ভরতা ও ভবিষ্যৎ পথ
প্যারিস ২০২৪: বাংলাদেশের অ্যাথলেটিক্সের 'ওয়াইল্ড কার্ড' নির্ভরতা ও ভবিষ্যৎ পথ
ছবি: সংগৃহীত
প্যারিস ২০২৪ অলিম্পিক গেমসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অ্যাথলেটিক্স আবারও 'ওয়াইল্ড কার্ড' নামক এক অনিশ্চিত বাস্তবতার মুখোমুখি। ২০২৩ সালের বিশ্ব অ্যাথল...

প্যারিস ২০২৪ অলিম্পিক গেমসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশের অ্যাথলেটিক্স আবারও 'ওয়াইল্ড কার্ড' নামক এক অনিশ্চিত বাস্তবতার মুখোমুখি। ২০২৩ সালের বিশ্ব অ্যাথলেটিক্স চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের কোনো অ্যাথলেট সরাসরি অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্জন করতে পারেননি, যা প্যারিস অলিম্পিকের সরাসরি অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এক গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে। এই অবস্থা বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অ্যাথলেটিক্সের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পৌঁছানোর ব্যর্থতাকে প্রকটভাবে তুলে ধরে। বিগত কয়েকটি অলিম্পিক আসরেও বাংলাদেশের অ্যাথলেটরা মূলত বৈশ্বিক অ্যাথলেটিক্স সংস্থার দেওয়া 'ইউনিভার্সালিটি প্লেস' বা ওয়াইল্ড কার্ডের ওপর নির্ভর করে অংশগ্রহণ করেছেন, যা দেশের ক্রীড়াঙ্গনের জন্য একটি সম্মানজনক কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ চিত্র উপস্থাপন করে। এই নির্ভরতা কেবল অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টি করে, কিন্তু আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতামূলক পারফরম্যান্সের পথ সুগম করে না, যা বাংলাদেশের ক্রীড়া কূটনীতি এবং বৈশ্বিক ক্রীড়া মঞ্চে দেশের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

বাংলাদেশের অ্যাথলেটিক্সের এই 'ওয়াইল্ড কার্ড' নির্ভরতার মূল কারণগুলি বহুমাত্রিক এবং গভীর। প্রথমত, আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ পদ্ধতির অভাব প্রকট। দেশের ক্রীড়া প্রশিক্ষণের ধরণ এখনও অনেকটাই ঐতিহ্যবাহী এবং প্রথাগত, যেখানে পুষ্টি, ক্রীড়া মনোবিজ্ঞান, বায়োমেকানিক্স এবং অত্যাধুনিক ফিটনেস মূল্যায়নের মতো বিষয়গুলির যথাযথ প্রয়োগ অনুপস্থিত। বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) এবং সংশ্লিষ্ট ক্রীড়া ফেডারেশনগুলির বাজেট বরাদ্দের সিংহভাগই স্বল্পমেয়াদী প্রতিযোগিতামূলক অংশগ্রহণের পেছনে ব্যয় হয়, দীর্ঘমেয়াদী প্রতিভা অন্বেষণ ও বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন নেই। উদাহরণস্বরূপ, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত ক্রীড়া উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে বরাদ্দকৃত তহবিল প্রায়শই নির্মাণ অবকাঠামো বা সরঞ্জাম ক্রয়ে সীমাবদ্ধ থাকে, যা সরাসরি অ্যাথলেটদের উচ্চতর প্রশিক্ষণে তেমন ভূমিকা রাখে না। আন্তর্জাতিক মানের কোচিং স্টাফ ও প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সহায়তা নিশ্চিত করতে না পারাও এই দুর্বলতার অন্যতম প্রধান কারণ।

দ্বিতীয়ত, তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রতিভা অন্বেষণ এবং তাদের দীর্ঘমেয়াদী পরিচর্যার একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থার অনুপস্থিতি। বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অ্যাথলেটিক্সের চর্চা অত্যন্ত সীমিত এবং প্রতিযোগিতার মানও আন্তর্জাতিক স্তরের ধারেকাছে নেই। বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করলেও, সেগুলোর সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ এবং কার্যকর ব্যবহারের ক্ষেত্রে ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং এডিবি (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে ঋণ বা অনুদান দিতে আগ্রহী হলেও, তাদের শর্তাবলী এবং বাংলাদেশের নিজস্ব ক্রীড়া নীতিমালার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দেখা যায়। এর ফলে, অবকাঠামো তৈরি হলেও তার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত হয় না। পাশাপাশি, অ্যাথলেটদের জন্য পর্যাপ্ত আর্থিক প্রণোদনা, বৃত্তি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাবও অনেক প্রতিভাবানকে এই ক্ষেত্র থেকে বিমুখ করে তোলে। খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে নেওয়ার ক্ষেত্রে সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা তাদের অন্য পেশায় ধাবিত করে, যা দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে মেধাশূন্য করে তোলে।

তৃতীয়ত, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক এক্সপোজারের অভাব বাংলাদেশের অ্যাথলেটদের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে পৌঁছাতে প্রধান বাধা। শুধুমাত্র জাতীয় বা আঞ্চলিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে একজন অ্যাথলেট আন্তর্জাতিক মানের চাপ, কৌশল এবং পারফরম্যান্সের সাথে পরিচিত হতে পারেন না। আন্তর্জাতিক ফেডারেশনগুলির রেটিং পয়েন্ট অর্জন করতে হলে নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক ইভেন্টগুলিতে অংশগ্রহণ করা জরুরি, যা ওয়াইল্ড কার্ডের নির্ভরতা কমাতে সাহায্য করবে। বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের স্বল্প বাজেট এবং আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টের উচ্চ খরচ প্রায়শই এই সুযোগগুলিকে সীমিত করে। এর ফলস্বরূপ, অ্যাথলেটরা পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জন করতে ব্যর্থ হন এবং যখন অলিম্পিকের মতো বড় মঞ্চে সুযোগ পান, তখন তারা পারফরম্যান্সের দিক থেকে পিছিয়ে পড়েন। এই চক্রাকার সমস্যাটি বাংলাদেশের অ্যাথলেটিক্সকে একটি স্থবির অবস্থায় আটকে রেখেছে, যেখানে শুধুমাত্র অংশগ্রহণের জন্য অংশগ্রহণই মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, পদক জয়ের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাচ্ছে।

অলিম্পিক আসর মোট অংশগ্রহণকারী অ্যাথলেট অ্যাথলেটিক্সে অংশগ্রহণকারী ওয়াইল্ড কার্ডের মাধ্যমে অংশগ্রহণকারী সরাসরি যোগ্যতা অর্জনকারী
সিওল ১৯৮৮ ৬ ৪ ৪ ০
বার্সেলোনা ১৯৯২ ৬ ৪ ৪ ০
আটলান্টা ১৯৯৬ ৪ ২ ২ ০
সিডনি ২০০০ ৪ ২ ২ ০
অ্যাথেন্স ২০০৪ ৪ ২ ২ ০
বেইজিং ২০০৮ ৫ ২ ২ ০
লন্ডন ২০১২ ৫ ২ ২ ০
রিও ২০১৬ ৭ ২ ২ ০
টোকিও ২০২০ ৬ ২ ২ ০

উৎস: বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (BOA) এবং আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (IOC) প্রতিবেদন, বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত।

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে 'জাতীয় ক্রীড়া নীতিমালা ২০১৮' এর আলোকে একটি সুনির্দিষ্ট 'অ্যাথলেটিক্স ট্যালেন্ট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে আগামী ১০ বছরের জন্য প্রতিভা অন্বেষণ, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মানের কোচ নিয়োগের জন্য বার্ষিক বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করা হবে। এই কর্মসূচিতে বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) এবং বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থাগুলির মধ্যে সমন্বয় সাধন করা অত্যাবশ্যক।
  • বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ) এবং বাংলাদেশ অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনকে ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং এডিবি'র 'ক্রীড়া উন্নয়ন তহবিল'-এর সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে একটি 'আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্স এক্সপোজার ফান্ড' প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এই ফান্ডের মাধ্যমে প্রতি বছর ন্যূনতম ২০ জন সম্ভাবনাময় অ্যাথলেটকে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প এবং উচ্চ-স্তরের প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে, যা আন্তর্জাতিক রেটিং পয়েন্ট অর্জনে সহায়ক হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'ক্রীড়া বৃত্তি আইন' প্রণয়ন করতে হবে, যার মাধ্যমে অ্যাথলেটিক্সের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের জন্য মাসিক বৃত্তি, শিক্ষা খরচ এবং অবসরকালীন ভাতার ব্যবস্থা করা হবে। এই আইন অ্যাথলেটিক্সকে একটি টেকসই পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সাহায্য করবে এবং তরুণদের এই খাতে আসতে উৎসাহিত করবে, যার তত্ত্বাবধানে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এবং অর্থ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রায়হান রশীদ

রায়হান রশীদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: অলিম্পিক ও আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্স। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator