বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও… | আই নিউজ বিডি

বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

ড. তৌফিক এলাহী  avatar   
ড. তৌফিক এলাহী
বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়ার প্রাথমিক তথ্য উপাত্ত জনমনে নতুন করে নির্বাচনকালীন স্বচ্ছতা ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়ার প্রাথমিক তথ্য উপাত্ত জনমনে নতুন করে নির্বাচনকালীন স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, যেখানে প্রায় ৫২ লক্ষ নতুন ভোটারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ভোটারের তথ্য যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়ায় ত্রুটির অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনাটি কেবল একটি প্রশাসনিক ত্রুটি হিসেবে চিহ্নিত না হয়ে, বরং বৃহত্তর রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জনআস্থা এবং স্বচ্ছতার অনুপস্থিতির একটি প্রতিচ্ছবি হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিশেষ করে, যখন ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)-এর মতো আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগীরা বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক সংস্কার এবং জবাবদিহিতার মানদণ্ড পূরণে ধারাবাহিক তাগিদ দিয়ে আসছে, তখন এই ধরনের ঘটনাগুলি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে আরও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে, যেখানে বায়োমেট্রিক ভোটার তালিকা প্রণয়নে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, সেখানেও পরবর্তীতে নানা সময়ে ভোটার নিবন্ধন ও তালিকা হালনাগাদ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে, যা নির্বাচন প্রক্রিয়ার উপর জনগণের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জকে আরও জটিল করে তুলেছে।

নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং জনআস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো এবং স্বাধীন প্রতিষ্ঠান অপরিহার্য। নির্বাচন কমিশন (ইসি) আইন, ২০২২ অনুযায়ী ইসি-কে স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা দেওয়া হলেও, এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রায়শই প্রশ্ন ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাচনে অর্থায়ন, বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর অনুদান এবং ব্যয় নিরীক্ষণে ইসির সক্ষমতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইন, ২০০৮ অনুযায়ী দলগুলোকে তাদের বার্ষিক আর্থিক বিবরণী ইসিতে জমা দিতে হয়, কিন্তু এই তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং অনিয়ম পেলে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের প্রক্রিয়া যথেষ্ট দুর্বল। World Bank-এর 'Worldwide Governance Indicators' (WGI) রিপোর্টে বাংলাদেশের 'Voice and Accountability' এবং 'Control of Corruption' সূচকে ধারাবাহিক নিম্নগতি এই দুর্বলতারই প্রতিফলন। এই সূচকগুলোতে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে আইন থাকলেও তার প্রয়োগ এবং কার্যকর তদারকির অভাবে জনআস্থা ক্ষুণ্ন হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং এর সিদ্ধান্ত গ্রহণে নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ কমানো এখন সময়ের দাবি, যাতে তারা ভোটার তালিকা প্রণয়ন থেকে শুরু করে নির্বাচন পরিচালনা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে পারে।

রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র এবং তাদের আর্থিক স্বচ্ছতাও জনআস্থা তৈরিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এডিবি তাদের 'Governance in Bangladesh' শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব দেশের সামগ্রিক সুশাসনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। দলীয় মনোনয়ন প্রক্রিয়া, যার ওপর ভিত্তি করে প্রার্থীরা নির্বাচনে অংশ নেন, প্রায়শই অস্বচ্ছ থাকে এবং দলীয় হাইকমান্ডের একক সিদ্ধান্তে প্রভাবিত হয়। এই প্রক্রিয়াকে আরও গণতান্ত্রিক ও অংশগ্রহণমূলক করার জন্য কোনো সুস্পষ্ট আইন বা নীতিমালা নেই, যা সাধারণ ভোটারদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। এছাড়াও, নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো দ্রুত এবং নিরপেক্ষভাবে নিষ্পত্তি না হওয়াও জনমনে নির্বাচন প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সংশয় তৈরি করে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্বাচনী আইন ও বিধিমালা যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও, তার বাস্তবায়ন এবং প্রয়োগে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব পরিলক্ষিত হয়। এই সমস্যা সমাধানের জন্য শুধুমাত্র আইন প্রণয়নই যথেষ্ট নয়, বরং আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং সকল অংশীজনের মধ্যে একটি নৈতিক কাঠামোর উন্নয়ন অপরিহার্য।

বিষয়বস্তু ২০০৮-২০০৯ ২০১৪-২০১৫ ২০১৮-২০১৯ ২০২২-২০২৩
World Bank WGI: Voice and Accountability (১০০-এর মধ্যে পার্সেন্টাইল র‍্যাঙ্ক) ৩২.১ ২১.৫ ১৯.২ ১৬.৮
ADB Governance Assessment: Political Stability (১-৬ স্কেলে, ৬ সর্বোচ্চ) ৩.৫ ২.৮ ২.৫ ২.২
নির্বাচন কমিশন কর্তৃক নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৩৯ ৪১ ৩৯ ৪৫
নির্বাচনী ব্যয় নিরীক্ষণে অনিয়মের অভিযোগ (প্রতিবেদনিত) নগণ্য ১৪% ২২% ২৮%

উৎস: World Bank Worldwide Governance Indicators (WGI), ADB Governance Indicators, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন বার্ষিক প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • নির্বাচন কমিশন (ইসি) আইন, ২০২২-এর অধীনে ইসির আর্থিক ও প্রশাসনিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ইসির বাজেট বরাদ্দ সরাসরি জাতীয় সংসদ থেকে নিশ্চিত করা এবং ইসির নিজস্ব সচিবালয়কে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে। একই সাথে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগে একটি স্বাধীন অনুসন্ধান কমিটি (Search Committee) গঠন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে, যেখানে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সুস্পষ্ট ভূমিকা থাকবে।
  • রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইন, ২০০৮ এবং নির্বাচন আচরণ বিধিমালা, ২০০৮-এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষত, রাজনৈতিক দলগুলোর বার্ষিক আর্থিক বিবরণী নিরীক্ষার জন্য নির্বাচন কমিশনের অধীনে একটি স্বাধীন অডিট উইং প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা World Bank-এর 'Public Financial Management' (PFM) ফ্রেমওয়ার্ক অনুসরণ করে কাজ করবে। নির্বাচনী ব্যয়সীমা লঙ্ঘন এবং অর্থায়নে অস্বচ্ছতার ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে এবং প্রতিটি অভিযোগের দ্রুত ও জনসমক্ষে নিষ্পত্তি নিশ্চিত করতে হবে।
  • তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং ইসির সকল কার্যক্রমে 'ওপেন ডেটা' নীতি অনুসরণ করতে হবে। ভোটার তালিকা, নির্বাচনী ফলাফল এবং রাজনৈতিক দলের আর্থিক বিবরণীর সকল তথ্য একটি উন্মুক্ত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করতে হবে, যা ADB-এর 'Digital Governance' সুপারিশের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে এই বিষয়ে ইসির সাথে কাজ করে একটি সমন্বিত ডিজিটাল ডেটাবেজ তৈরি করতে হবে, যা নাগরিক সমাজ এবং গণমাধ্যমের জন্য সহজে ব্যবহারযোগ্য হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. তৌফিক এলাহী

ড. তৌফিক এলাহী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

לא נמצאו הערות


News Card Generator