পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ

সায়েম মালিক  avatar   
সায়েম মালিক
পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা-এ বিনিয়োগ, ঝুঁকি ও সম্ভাবনার পরিমাপ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কর্তৃক সেচ কার্যক্রমে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমাতে এবং ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে একটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়ন...

সম্প্রতি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কর্তৃক সেচ কার্যক্রমে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার কমাতে এবং ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়াতে একটি পাইলট প্রকল্প বাস্তবায়নের ঘোষণা বাংলাদেশের পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করে। এই প্রকল্পটি শুধু ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিই নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট খরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি টেকসই সমাধানের ইঙ্গিত দেয়। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনার সঙ্গেও এর পরোক্ষ সম্পর্ক তৈরি হয়, কারণ আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোই দেশের ভূ-উপরিস্থ পানির প্রধান উৎস।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জনজীবন নদীমাতৃক হওয়ায় পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। তবে, এই খাতে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বহুমুখী চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান। একদিকে যেমন বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নদী ভাঙন রোধ এবং সেচ ব্যবস্থার আধুনিকায়নে ব্যাপক অবকাঠামোগত বিনিয়োগ প্রয়োজন, তেমনি অন্যদিকে উজানের দেশগুলোর সঙ্গে অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন নিয়ে সৃষ্ট জটিলতাগুলো দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কা বাঁধের প্রভাবে গঙ্গা নদীর পানি প্রবাহ হ্রাস এবং টিপাইমুখ বাঁধের সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ বাংলাদেশের কৃষি ও পরিবেশের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করে। এই প্রেক্ষাপটে, ব্র্যাক গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) কর্তৃক উদ্ভাবিত খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাত এবং স্বল্প পানি ব্যবহারকারী ফসলের প্রচলন পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা শুধু ফসল উৎপাদনই নয়, বরং পানির কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায়ও সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।

পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ঝুঁকির মাত্রা ব্যাপক। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আকস্মিক বন্যা, দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি দেশের পানীয় জল, কৃষি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর পানি দূষণ একটি উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা মাছের উৎপাদন এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। শিল্পবর্জ্য ও অপরিশোধিত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে এই দূষণ বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা পানীয় জলের উৎসগুলোকে আরও সীমিত করে তুলছে। এছাড়া, আন্তঃসীমান্ত নদীগুলোর উজানে বাঁধ নির্মাণ এবং পানি প্রত্যাহার বাংলাদেশের জন্য একটি দীর্ঘস্থায়ী ভূ-রাজনৈতিক ও পরিবেশগত ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই ঝুঁকিগুলো মোকাবিলায় শুধুমাত্র অবকাঠামোগত বিনিয়োগই যথেষ্ট নয়, বরং প্রয়োজন সমন্বিত নীতি ও কৌশলগত পদক্ষেপ।

বাংলাদেশের পানি সম্পদ ও কৃষি খাতের নির্বাচিত সূচকসমূহ
সূচক ২০১৫ ২০২০ সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্য (২০২৩)
ভূগর্ভস্থ পানি দ্বারা সেচকৃত এলাকা (মিলিয়ন হেক্টর) ৩.৫ ৩.৮ ৪.১
ভূ-উপরিস্থ পানি দ্বারা সেচকৃত এলাকা (মিলিয়ন হেক্টর) ১.২ ১.১ ১.০
কৃষি উৎপাদনে পানির দক্ষতা (কেজি ফসল/ঘনমিটার পানি) ০.৮ ০.৯ ১.০
নদী দূষণ মাত্রা (বিওডি, মিলিগ্রাম/লিটার - গড়) ৫.২ ৬.৫ ৭.১
পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া (মিটার/বছর - গড়) ০.৪ ০.৫ ০.৬
DAE-এর আওতায় সেচ আধুনিকীকরণ প্রকল্পের সংখ্যা ১৫ ২০ ২৫

উৎস: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE), পরিবেশ মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC)

সুপারিশ

  • পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি সমন্বিত আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা কাঠামো তৈরি করতে হবে, যেখানে উজানের দেশগুলোর সঙ্গে নিয়মিত তথ্য আদান-প্রদান এবং যৌথ নদী কমিশনের মাধ্যমে পানি বণ্টন চুক্তিগুলো কঠোরভাবে বাস্তবায়নের জন্য আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতির সর্বোচ্চ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
  • পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে শিল্পবর্জ্য ও পৌর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে নদী দূষণ নিয়ন্ত্রণে জিরো-টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে এবং এর জন্য 'পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫' এর কার্যকর বাস্তবায়ন ও নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
  • DAE, BRRI এবং BARI-কে সমন্বিতভাবে পানি সাশ্রয়ী কৃষি প্রযুক্তির গবেষণা ও সম্প্রসারণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, বিশেষ করে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহারের জন্য নতুন সেচ পদ্ধতি এবং খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল জাত উদ্ভাবনে 'জাতীয় কৃষি নীতি, ২০১৮' এর অধীনে বিশেষ তহবিল বরাদ্দ এবং কৃষকদের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সায়েম মালিক

সায়েম মালিক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

کوئی تبصرہ نہیں ملا


News Card Generator