সুন্দরবনের শ্বাসরুদ্ধকর বাস্তবতা: ম্যানগ্রোভের তলদেশে লুকিয়ে থাকা এক নীরব শিকার | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

সুন্দরবনের শ্বাসরুদ্ধকর বাস্তবতা: ম্যানগ্রোভের তলদেশে লুকিয়ে থাকা এক নীরব শিকার

জাবীর হোসেন  avatar   
জাবীর হোসেন
সুন্দরবনের শ্বাসরুদ্ধকর বাস্তবতা: ম্যানগ্রোভের তলদেশে লুকিয়ে থাকা এক নীরব শিকার
সুন্দরবনের শ্বাসরুদ্ধকর বাস্তবতা: ম্যানগ্রোভের তলদেশে লুকিয়ে থাকা এক নীরব শিকার
ছবি: সংগৃহীত
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় চলমান চ্যালেঞ্জগুলো সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে, বিশেষ করে বাংলাদেশ বন বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে। এ...

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় চলমান চ্যালেঞ্জগুলো সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে, বিশেষ করে বাংলাদেশ বন বিভাগ কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে। এই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত তিন বছরে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে বাঘ ও হরিণের সংখ্যায় স্থিতিশীলতা এলেও, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রজাতির সংখ্যায় এক উদ্বেগজনক হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে, ম্যানগ্রোভ ইকোসিস্টেমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে পরিচিত বিভিন্ন প্রজাতির পাখি ও সরীসৃপের সংখ্যা, যা সাধারণত পরিবেশের স্বাস্থ্য নির্দেশক হিসেবে বিবেচিত হয়, সেগুলিতে এক নিরন্তর ক্ষয় সুস্পষ্ট। এই পরিস্থিতি কেবল জীববৈচিত্র্যের উপরই নয়, বরং সমগ্র সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য এবং কার্বন সিঙ্ক হিসেবে এর বৈশ্বিক ভূমিকার উপরও গুরুতর প্রভাব ফেলছে।

ম্যানগ্রোভ বনের তলদেশে লুকিয়ে থাকা এই নীরব শিকারের মূল কারণগুলির মধ্যে অন্যতম হলো মানুষের অবিরাম অনুপ্রবেশ এবং অবৈধ প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ। সুন্দরবনের চারপাশে গড়ে ওঠা জনবসতিগুলির ক্রমবর্ধমান চাপ, বিশেষ করে কাঠ সংগ্রহ, মধু আহরণ, মাছ ও কাঁকড়া ধরার নামে বনের গভীরে প্রবেশ, ইকোসিস্টেমের উপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলির তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সুন্দরবনের কোর এলাকায় মানুষের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ সত্ত্বেও, বাফার জোনে এবং সংলগ্ন নদী-খালে অবৈধ কার্যকলাপ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে বনের প্রাকৃতিক খাদ্যশৃঙ্খল ব্যাহত হচ্ছে, যা শিকারী প্রাণী যেমন বাঘের খাদ্যাভাবে বনের বাইরে চলে আসার প্রবণতা বাড়িয়ে তুলছে। একইসাথে, অত্যাধুনিক সরঞ্জাম ব্যবহার করে মাছ ধরার কারণে ছোট মাছ ও জলজ প্রাণীর প্রজনন ক্ষেত্রগুলি ধ্বংস হচ্ছে, যা বৃহৎ প্রাণীদের খাদ্য সরবরাহকে সরাসরি প্রভাবিত করছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং লবণাক্ততার বৃদ্ধি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য আরেকটি বড় হুমকি। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-এর সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং উজানে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে লবণাক্ততা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। এই ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদের প্রজাতিগত বৈচিত্র্যকে প্রভাবিত করছে এবং অনেক সংবেদনশীল প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর টিকে থাকাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। উদাহরণস্বরূপ, সুন্দরী গাছের সংখ্যা কমে যাওয়াসহ বিভিন্ন ধরণের গুল্ম ও লতা প্রজাতির বিলুপ্তি ঘটছে, যা বনের সামগ্রিক কাঠামো ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে মিষ্টি পানির উৎস দূষিত হচ্ছে, যা বন্যপ্রাণীর জন্য পানীয় জলের সংকট তৈরি করছে এবং তাদের আচরণ ও প্রজনন চক্রকে ব্যাহত করছে। এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সুদূরপ্রসারী এবং সুন্দরবনের প্রাকৃতিক সহনশীলতা কমাচ্ছে।

সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC)-এর সমন্বিত উদ্যোগের অভাবও একটি বড় সমস্যা। যদিও DAE ও BARC উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষকদের লবণসহিষ্ণু ফসলের জাত উদ্ভাবনে কাজ করছে, কিন্তু তাদের কার্যক্রম সুন্দরবনের সংলগ্ন এলাকার জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে সরাসরি প্রভাব ফেলছে না। উপকূলীয় অঞ্চলের কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমে এমন একটি সমন্বিত মডেল প্রয়োজন, যা কৃষকদের বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করে বনের উপর নির্ভরশীলতা কমাবে এবং একইসাথে পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতির প্রচলন করবে। বর্তমানে, কৃষকদের মধ্যে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতনতার অভাবও একটি বড় বাধা। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই সংরক্ষণ কার্যক্রম অসম্ভব। বনের উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর জন্য বিকল্প আয়ের উৎস তৈরি করতে না পারলে, এই নীরব শিকারের লাগাম টেনে ধরা কঠিন হবে।

বছর ম্যানগ্রোভ বনের আচ্ছাদিত এলাকা (বর্গ কিমি) বাঘের সংখ্যা (আনুমানিক) হরিণের সংখ্যা (আনুমানিক) নকশার মাধ্যমে বন উজাড় (বর্গ কিমি)
২০১০ ৬,০১৭ ৪৪৪ ১,০০,০০০ ১.৫
২০১৪ ৫,৯৮০ ১০৬ ১,২০,০০০ ২.২
২০১৮ ৫,৯৫০ ১১৪ ১,২৫,০০০ ২.৮
২০২২ ৫,৯২৫ ১১৪ ১,৩০,০০০ ৩.৫

উৎস: বাংলাদেশ বন বিভাগ, পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত 'সুন্দরবন সংরক্ষণ আইন, ২০১৮'-এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং বন বিভাগকে আধুনিক প্রযুক্তি (যেমন: ড্রোন পর্যবেক্ষণ, স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ) ও পর্যাপ্ত জনবল দিয়ে শক্তিশালী করতে হবে যাতে অবৈধ অনুপ্রবেশ ও সম্পদ আহরণ কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা যায়।
  • DAE এবং BARC-কে যৌথভাবে সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় লবণসহিষ্ণু ও পরিবেশবান্ধব বিকল্প শস্য উৎপাদনে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা প্রদান করতে হবে, যাতে বনের উপর নির্ভরশীলতা কমে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর টেকসই জীবিকা নিশ্চিত হয়।
  • BARI এবং BRRI-কে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও লবণাক্ততা সহনশীল ম্যানগ্রোভ প্রজাতি এবং জলজ প্রাণীর জাত উদ্ভাবনে গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে এই গবেষণার ফলাফল মাঠ পর্যায়ে বাস্তবায়নে নীতি সহায়তা প্রদান করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাবীর হোসেন

জাবীর হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator