সম্প্রতি বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) এবং সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন অ্যাসোসিয়েশন (BSDA) এর যৌথ উদ্যোগে ঢাকার শেখ হাসিনা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কে প্রথম সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ল্যাব উদ্বোধন এই খাতের সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। যদিও এই উদ্যোগকে 'ফ্যাবলেস স্বপ্নে বাংলাদেশ: সিলিকন ডিজাইনের পথে কাঁটা' শিরোনামের কলামের সূচনা হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু এর বাস্তবায়ন এবং টেকসই উন্নয়নের পথে রয়েছে বহুবিধ চ্যালেঞ্জ। বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজারে বাংলাদেশের অংশীদারিত্ব এখনো নগণ্য, যেখানে ২০২৩ সালের ডেটা অনুযায়ী বৈশ্বিক চিপ শিল্পের আয় প্রায় ৫২৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে, সেখানে বাংলাদেশের অবদান কেবলমাত্র ডিজাইন সার্ভিসেস এবং প্যাকেজিংয়ের ক্ষুদ্র অংশেই সীমাবদ্ধ। এই ল্যাব স্থাপন নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ, যা স্থানীয় প্রকৌশলীদের জন্য অত্যাধুনিক ডিজাইন টুলস এবং পরিবেশে কাজ করার সুযোগ তৈরি করবে। তবে, এই ল্যাব থেকে বেরিয়ে আসা ডিজাইনগুলিকে বাণিজ্যিক উৎপাদনে নিয়ে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় ইকোসিস্টেম এখনো অনুপস্থিত। ফ্যাবলেস মডেল, যেখানে একটি সংস্থা চিপ ডিজাইন করে কিন্তু উৎপাদন অন্য একটি বিশেষায়িত ফ্যাব্রিকেশন প্ল্যান্ট (ফ্যাব) দ্বারা সম্পন্ন হয়, বাংলাদেশের জন্য এটি একটি আকর্ষণীয় পথ। কিন্তু এই মডেলের সফলতার জন্য প্রয়োজন কেবল ডিজাইন দক্ষতা নয়, বরং বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের সাথে গভীর সংযোগ, মেধা সম্পদের সুরক্ষা এবং বিশাল বিনিয়োগের সক্ষমতা।
বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন শিল্পে মানবসম্পদ একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে প্রতি বছর কম্পিউটার সায়েন্স ও ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে হাজার হাজার গ্র্যাজুয়েট বের হচ্ছে, কিন্তু তাদের মধ্যে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, ভেরিফিকেশন, ফ্যাব্রিকেশন এবং টেস্টিংয়ের মতো বিশেষায়িত ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মীর সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের আইটি সেক্টরে প্রায় ২০০,০০০ এর বেশি সফটওয়্যার প্রকৌশলী কাজ করছেন, কিন্তু সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইনে সরাসরি জড়িত কর্মীর সংখ্যা ৫০০ এর বেশি হবে না। এটি বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে খুবই নগণ্য। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন কোম্পানিগুলো যেমন NVIDIA, Qualcomm, Broadcom তাদের গবেষণা ও উন্নয়নে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে এবং হাজার হাজার বিশেষায়িত প্রকৌশলী নিয়োগ করে। বাংলাদেশে এমন বিনিয়োগের অভাব এবং উচ্চমানের গবেষণা সুবিধা না থাকায় মেধাবী শিক্ষার্থীরা প্রায়শই বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। উপরন্তু, সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইনের জন্য প্রয়োজনীয় EDA (Electronic Design Automation) টুলস যেমন Cadence, Synopsys, Mentor Graphics এর লাইসেন্স অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা ছোট ও মাঝারি আকারের স্টার্টআপগুলোর জন্য একটি বড় বাধা। ICT Division এর মাধ্যমে এই টুলসগুলির সহজলভ্যতা এবং ব্যবহারের জন্য প্রশিক্ষণ প্রদানের উদ্যোগ সীমিত পর্যায়ে রয়েছে, যা দ্রুত সম্প্রসারণ প্রয়োজন।
নীতিগত সমর্থন এবং বিনিয়োগের অভাবও এই খাতের অগ্রগতির পথে বড় কাঁটা। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) টেলিকম ইকোসিস্টেমে স্থানীয়ভাবে ডিজাইন করা চিপ ব্যবহারের জন্য কোন নির্দিষ্ট নীতিমালা বা প্রণোদনা এখনো তৈরি করেনি। এটি একটি বড় সুযোগ হাতছাড়া করার নামান্তর, কারণ টেলিকম শিল্প বাংলাদেশের বৃহত্তম ইলেকট্রনিক্স বাজারগুলোর মধ্যে অন্যতম। সরকারের 'ডিজিটাল বাংলাদেশ' এবং 'স্মার্ট বাংলাদেশ' ভিশনের অংশ হিসেবে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পকে অগ্রাধিকার খাত হিসেবে ঘোষণা করা হলেও, বাস্তবায়নযোগ্য সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ এবং দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ন পরিকল্পনা এখনো স্পষ্ট নয়। a2i (অ্যাক্সেস টু ইনফরমেশন) প্রোগ্রাম বিভিন্ন উদ্ভাবনী উদ্যোগকে সমর্থন করলেও, সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন এবং ফ্যাব্রিকেশন সংক্রান্ত উচ্চ-প্রযুক্তিগত গবেষণা ও উন্নয়নে তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা কম। বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য প্রয়োজন একটি স্থিতিশীল এবং সহায়ক ব্যবসায়িক পরিবেশ, যেখানে মেধা সম্পত্তি অধিকার (IPR) সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয় এবং কর সুবিধা সহ বিভিন্ন প্রণোদনা প্রদান করা হয়। বর্তমানে, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম এবং মালয়েশিয়ার মতো দেশগুলো সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় প্যাকেজ অফার করছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি প্রতিযোগিতামূলক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।
| খাত | বৈশ্বিক বাজার মূল্য (২০২৩, বিলিয়ন USD) | বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশ (বর্তমানে, বিলিয়ন USD) | প্রবৃদ্ধি হার (২০২৩-২০৩০, CAGR %) |
|---|---|---|---|
| সেমিকন্ডাক্টর চিপ | ৫২৭ | ০.০৫ (ডিজাইন সার্ভিসেস) | ৮.৫ |
| ইলেকট্রনিক ডিজাইন অটোমেশন (EDA) টুলস | ১২.৮ | ০.০০১ (লাইসেন্সড ব্যবহার) | ১২.০ |
| ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং সার্ভিসেস (EMS) | ৫৯৪ | ১.৫ (স্থানীয় সংযোজন) | ৬.৯ |
উৎস: Statista, Grand View Research, Bangladesh Bureau of Statistics (BBS) এবং BHTPA এর প্রাথমিক অনুমান।
সুপারিশ
- ICT Division কে অবিলম্বে একটি জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর কৌশল (National Semiconductor Strategy) প্রণয়ন করতে হবে, যা মেধা সম্পদ সুরক্ষা আইন (Intellectual Property Rights Act) এর অধীনে দেশীয় উদ্ভাবকদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা এবং পেটেন্ট ফাইল করার প্রক্রিয়া সহজ করবে। এই কৌশলে কমপক্ষে পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়কে অত্যাধুনিক EDA টুলস এবং ফ্যাব্রিকেশন সিমুলেশন সফটওয়্যার প্রদানের জন্য নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ করতে হবে।
- BASIS এবং BHTPA এর যৌথ উদ্যোগে একটি 'সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন স্কিল ডেভেলপমেন্ট ফান্ড' গঠন করতে হবে, যা প্রতি বছর কমপক্ষে ৫০০ জন প্রকৌশলীকে অ্যাডভান্সড চিপ ডিজাইন, ভেরিফিকেশন এবং টেস্টিংয়ে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ প্রদান করবে। এই ফান্ড BTRC এর মাধ্যমে টেলিকম সরঞ্জাম উৎপাদনে স্থানীয়ভাবে ডিজাইন করা চিপ ব্যবহারের জন্য অন্তত ১৫% ট্যাক্স ক্রেডিট বা ভর্তুকি প্রদানের একটি নীতি প্রণয়ন করবে।
- a2i এবং BHTPA এর সহযোগিতায় একটি 'সেমিকন্ডাক্টর ইনোভেশন ল্যাবস নেটওয়ার্ক' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যেখানে স্থানীয় স্টার্টআপ এবং গবেষকদের জন্য প্রোটোটাইপিং সুবিধা (যেমন মাল্টি-প্রোজেক্ট ওয়েফার সার্ভিস - MPW) এবং ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অ্যাক্সেস সহজ করা হবে। এই নেটওয়ার্কের অধীনে, বিদেশী সেমিকন্ডাক্টর ফ্যাব্রিকেশন কোম্পানিগুলোকে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য বিশেষ কর অবকাশ (যেমন প্রথম ১০ বছরের জন্য ১০০% কর মওকুফ) এবং দ্রুত লাইসেন্সিং প্রক্রিয়ার জন্য একটি 'ওয়ান-স্টপ সার্ভিস' নিশ্চিত করতে হবে।