অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন

সুমাইয়া পারভীন  avatar   
সুমাইয়া পারভীন
অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) কর্তৃক প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, দেশের কৃষিজমিতে রাসায়নিক সারের যথেচ্ছ ব্যবহার মাটির উর্ব...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) কর্তৃক প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে, দেশের কৃষিজমিতে রাসায়নিক সারের যথেচ্ছ ব্যবহার মাটির উর্বরতা হ্রাসের পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির গুণগত মানকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করছে। এই প্রতিবেদনের ফলাফলগুলো অর্গানিক ফার্মিংয়ের প্রয়োজনীয়তাকে নতুন করে সামনে এনেছে, যেখানে পুষ্টিমান ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি একটি জাতীয় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে, জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতির গুরুত্ব নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে, যেখানে টেকসই খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে।

অর্গানিক ফার্মিং কেবল রাসায়নিক সার ও কীটনাশক পরিহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি একটি সামগ্রিক বাস্তুতান্ত্রিক পদ্ধতি যা মাটির স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় পরিবেশের সংরক্ষণ নিশ্চিত করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, যেখানে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেশি এবং কৃষিজমির পরিমাণ সীমিত, সেখানে অর্গানিক পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে জমির উৎপাদনশীলতা দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে রাসায়নিক সারের ব্যবহার প্রায় ৩০% বৃদ্ধি পেলেও, অনেক ক্ষেত্রে ফসলের ফলন আনুপাতিক হারে বাড়েনি, যা মাটির জৈব উপাদান হ্রাসের প্রত্যক্ষ ফল। এই প্রবণতা কেবল কৃষকদের উৎপাদন খরচই বাড়াচ্ছে না, বরং উৎপাদিত খাদ্যের পুষ্টিগুণ নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। Department of Agricultural Extension (DAE) এর মাঠ পর্যায়ের কর্মীরাও স্বীকার করছেন যে, কৃষকদের মধ্যে অর্গানিক পদ্ধতির সুফল সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো এবং এর ব্যবহারিক দিকগুলো সহজলভ্য করা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, প্রান্তিক কৃষকদের কাছে জৈব সারের প্রাপ্যতা এবং এর প্রয়োগ কৌশল সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান পৌঁছানো অপরিহার্য।

পুষ্টির দৃষ্টিকোণ থেকে, অর্গানিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত খাদ্যের গুণগত মান নিয়ে বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন গবেষণা চলছে। যদিও অনেক গবেষণা সরাসরি রাসায়নিকভাবে উৎপাদিত ফসলের তুলনায় অর্গানিক ফসলের পুষ্টি উপাদানে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য খুঁজে পায়নি, তবে অর্গানিক ফসল কীটনাশক অবশেষমুক্ত হওয়ায় জনস্বাস্থ্যের জন্য এটি অধিক নিরাপদ বলে বিবেচিত। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর বিজ্ঞানীরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ধানের অর্গানিক জাত নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন, যেখানে রাসায়নিক সার ও কীটনাশকবিহীন চাষাবাদে ধানের ফলন ও পুষ্টিগুণ কীভাবে বজায় রাখা যায় তা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। তাদের প্রাথমিক ফলাফল আশাব্যঞ্জক হলেও, বাণিজ্যিক স্কেলে এর বাস্তবায়নে আরও দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা ও নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন। উপরন্তু, অর্গানিক ফার্মিংয়ের মাধ্যমে মাটির মাইক্রোবায়াল কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়, যা গাছের পুষ্টি গ্রহণে সহায়তা করে এবং উদ্ভিদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এটি কেবল মাটির স্বাস্থ্যই উন্নত করে না, বরং কার্বন সিকোয়েস্ট্রেশনেও ভূমিকা রাখে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। কৃষকদের মধ্যে অর্গানিক পণ্যের বাজারজাতকরণ এবং ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা গেলে এই পদ্ধতির প্রতি তাদের আগ্রহ আরও বাড়বে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সূচক ২০১৩-১৪ অর্থবছর ২০১৮-১৯ অর্থবছর ২০২২-২৩ অর্থবছর (প্রাথমিক)
রাসায়নিক সারের ব্যবহার (লক্ষ মেট্রিক টন) ৩৮.৫ ৪৭.২ ৪৯.৮
জৈব সারের উৎপাদন ও ব্যবহার (লক্ষ মেট্রিক টন) ২.১ ৩.৫ ৪.৭
অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষকৃত জমির পরিমাণ (লক্ষ হেক্টর) ০.০৫ ০.০৯ ০.১৩
কৃষকদের অর্গানিক চাষে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত (%) ২.৮ ৪.১ ৫.৫

উৎস: কৃষি মন্ত্রণালয়, DAE, BARC এর বিভিন্ন প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • কৃষি মন্ত্রণালয়কে 'জাতীয় অর্গানিক কৃষি নীতি ২০২১' এর কার্যকর বাস্তবায়নে একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে BARC এবং BARI এর যৌথ তত্ত্বাবধানে অর্গানিক কৃষি গবেষণায় বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি ও গবেষণা ল্যাবরেটরির আধুনিকায়ন নিশ্চিত করা হবে, এবং DAE এর মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের জন্য বিনামূল্যে অর্গানিক বীজ ও জৈব সারের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
  • পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে 'পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫' এর আওতায় রাসায়নিক কীটনাশক ও সারের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের জন্য একটি স্বাধীন কমিটি গঠন করতে হবে এবং রাসায়নিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কঠোর নীতিমালা প্রয়োগ করতে হবে, পাশাপাশি অর্গানিক কৃষকদের জন্য বিশেষ পরিবেশ-বান্ধব প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করতে হবে যা পরিবেশ দূষণ হ্রাসে অবদান রাখবে।
  • BRRI সহ অন্যান্য কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোকে (যেমন BARI) স্থানীয় আবহাওয়া ও মাটির উপযোগী উচ্চ ফলনশীল অর্গানিক জাতের ফসল উদ্ভাবনে গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করতে হবে এবং এর পাশাপাশি উৎপাদিত অর্গানিক পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে একটি জাতীয় সার্টিফিকেশন বডি (যেমন BSTI-এর অধীনে) প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা দেশীয় অর্গানিক পণ্যের বিশ্বস্ততা ও বাজারমূল্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সুমাইয়া পারভীন

সুমাইয়া পারভীন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator