কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও শ্রম আইন-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও শ্রম আইন-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ?

অ্যাডভোকেট তানিয়া  avatar   
অ্যাডভোকেট তানিয়া
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও শ্রম আইন-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ?
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও শ্রম আইন-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ক...

সম্প্রতি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কর্মীদের উৎপাদনশীলতা এবং সামগ্রিক সুস্থতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই প্রতিবেদন শুধু একটি পরিসংখ্যানগত চিত্র নয়, বরং বাংলাদেশের শ্রমবাজারে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার আইনি ও প্রায়োগিক প্রস্তুতি নিয়ে এক গভীর প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। বিশেষ করে, যখন আমরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, তখন কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য কেবল ব্যক্তিগত বিষয় না থেকে জাতীয় উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) কর্মীদের শারীরিক সুরক্ষার উপর জোর দিলেও মানসিক স্বাস্থ্যের নির্দিষ্ট দিকগুলি প্রায়শই উপেক্ষিত থেকে যায়। যদিও আইনটিতে কর্মপরিবেশ নিরাপদ ও স্বাস্থ্যকর রাখার কথা বলা হয়েছে, মানসিক নিপীড়ন, অতিরিক্ত কাজের চাপ, এবং কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যের মতো বিষয়গুলো সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত বা প্রতিকারের পথ স্পষ্ট নয়। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) ও হাসপাতাল কর্তৃক পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ১৬.১% প্রাপ্তবয়স্ক কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন, যার একটি বড় অংশ কর্মজীবী জনগোষ্ঠী। অথচ, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার অবকাঠামো এবং সচেতনতা এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে মনোসামাজিক সহায়তার অভাব রয়েছে এবং কর্মীদের মানসিক সমস্যাকে প্রায়শই দুর্বলতা হিসেবে দেখা হয়, যা তাদের সমস্যা প্রকাশে বাধা দেয়। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) যদিও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলপত্র প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে, এর বাস্তবায়ন এবং শ্রম আইনের সাথে এর সমন্বয় সাধন এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

আগামীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায়, বিশেষত প্রযুক্তিগত পরিবর্তন এবং গিগ ইকোনমির প্রসারের সাথে সাথে, কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ মোকাবিলায় নতুন আইনি কাঠামো এবং নীতিমালার প্রয়োজন অনস্বীকার্য। উদাহরণস্বরূপ, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) মানসিক স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট ঔষধের সহজলভ্যতা ও মান নিয়ন্ত্রণে কাজ করলেও, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং কর্মপরিবেশে মানসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যার বিষয়টি তাদের এখতিয়ারের বাইরে। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (IEDCR) বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ে কাজ করলেও, কর্মক্ষেত্রে মানসিক রোগের প্রাদুর্ভাব এবং এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে তাদের গবেষণা ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম এখনও সীমিত। শ্রম আইন ও নীতিমালাতে কর্মক্ষেত্রে মানসিক নিপীড়ন (যেমন – বুলিং, হ্যারাসমেন্ট), অতিরিক্ত কাজের চাপ (burnout), এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য উপযুক্ত কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য সুস্পষ্ট ধারা সংযোজন করা অপরিহার্য। পাশাপাশি, নিয়োগকর্তাদের জন্য বাধ্যতামূলক মানসিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং কাউন্সেলিং সেবার বিধান রাখা যেতে পারে, যা কর্মীদের সুস্থতা নিশ্চিত করবে এবং প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।

সূচক ২০১৯ ২০২১ ২০২৩ (প্রাক্কলিত)
মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত প্রাপ্তবয়স্ক কর্মজীবী (%) ১২.৫% ১৪.৮% ১৬.১%
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রাপ্তি (%) ২.১% ২.৫% ৩.০%
কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত চাপজনিত অনুপস্থিতি (বার্ষিক গড় দিন) ৫.২ ৭.১ ৮.৫

উৎস: DGHS, NIMH ও IEDCR এর বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত উপাত্তের সমন্বিত বিশ্লেষণ।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশের শ্রম আইন, ২০০৬-এ সুনির্দিষ্ট ধারা সংযোজন করে কর্মক্ষেত্রে মানসিক নিপীড়ন, অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং মানসিক স্বাস্থ্যগত বৈষম্যকে অবৈধ ঘোষণা করা হোক। এই ধারায় কর্মক্ষেত্রে মনোসামাজিক সহায়তা ও কাউন্সেলিং সেবাকে বাধ্যতামূলক করা এবং লঙ্ঘনকারীদের জন্য শাস্তিমূলক বিধান রাখা হোক, যা জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে।
  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক প্রণীতব্য জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য কৌশলপত্রে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে একটি অগ্রাধিকারমূলক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হোক। পাশাপাশি, সকল সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মীদের জন্য বার্ষিক মানসিক স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং এবং প্রয়োজন অনুসারে পেশাদার সাইকো-সামাজিক সহায়তা প্রদানের জন্য DGHS ও IEDCR-এর সমন্বয়ে একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি ও বাস্তবায়ন করা হোক।
  • ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) কর্তৃক মানসিক স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট ঔষধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) কর্মসূচির আওতায় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হোক। এক্ষেত্রে, শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিনিয়োগের জন্য প্রণোদনা প্রদান এবং তাদের কর্মপরিবেশে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়ক নীতিমালার বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করা হোক।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট তানিয়া

অ্যাডভোকেট তানিয়া 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও শ্রম আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Комментариев нет


News Card Generator