পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব: সম্ভাবনা গ্রাস করছে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব: সম্ভাবনা গ্রাস করছে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা

তৌসিফ রহমান  avatar   
তৌসিফ রহমান
পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব: সম্ভাবনা গ্রাস করছে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা
পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব: সম্ভাবনা গ্রাস করছে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাত অপার সম্ভাবনার আধার হলেও সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং উদাসীনতার কারণে এই সম্ভাবনা গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছে...

বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাত অপার সম্ভাবনার আধার হলেও সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং উদাসীনতার কারণে এই সম্ভাবনা গুরুতর সংকটের মুখে পড়েছে। দেশের ঐতিহাসিক নিদর্শন চুরি ও পাচার, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি, এবং পর্যটন করপোরেশনের ধারাবাহিক লোকসান ও পর্যটক হয়রানির মতো ঘটনাগুলো এই খাতের ভঙ্গুর চিত্র তুলে ধরছে। 'আই নিউজ বিডি'-র অনুসন্ধানে উঠে এসেছে যে, এই গুরুত্বপূর্ণ খাত দুটি কেবল অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন নয়, বরং দেশের অমূল্য ইতিহাস ও ঐতিহ্যও হারাতে বসেছে।

দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ চুরি ও পাচার এখন একটি বড় ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে, বিগত সরকারের পতনের পর, ২০২৪ সালের আগস্ট মাস থেকে সীমান্ত অরক্ষিত থাকার সুযোগে মূল্যবান প্রত্নসম্পদ, যেমন পাথরের মূর্তি, ব্যাপক হারে পাচার হয়েছে বলে জানা যায়। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) পাচারের সময় বেশ কিছু মূল্যবান কালো পাথরের মূর্তি উদ্ধার করেছে, যার মধ্যে ২০২২ সালে ৩১টি মূর্তি উদ্ধার করা হয় এবং ২০২৩-২০২৬ সালেও বিভিন্ন সময়ে মূর্তি উদ্ধারের ঘটনা ঘটেছে, যেমন ২০২৬ সালের আগস্টে দিনাজপুরে ৩২ লাখ ১৫ হাজার টাকা মূল্যের একটি বিষ্ণুমূর্তি উদ্ধার করা হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ববিদরা আশঙ্কা করছেন যে, যা উদ্ধার হয়েছে, পাচার হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি। এই পাচার চক্রগুলো সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করে, যেখানে দেশের বিভিন্ন প্রত্নস্থল বা মন্দির থেকে মূর্তি চুরি করে সীমান্ত এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং সুবিধাজনক সময়ে পাচার করা হয়। দুঃখজনকভাবে, প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণে বাংলাদেশের প্রচলিত আইন (১৯০৪ সালের আইনের আলোকে ১৯৬৮ সালে প্রণীত, ১৯৭৬ সালে সংশোধিত) অত্যন্ত অকার্যকর ও অযৌক্তিক, যেখানে পাচারের শাস্তি মাত্র ৩০ দিনের কারাদণ্ড বা ৫০০ টাকা জরিমানা। এছাড়া, প্যারিসের গিমে জাদুঘরে বাংলাদেশের প্রত্নসম্পদ প্রদর্শনীর চুক্তি নিয়েও অস্বচ্ছতার অভিযোগ উঠেছে, যেখানে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে প্রত্নসম্পদ চুরি হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে, যা দেশের প্রত্নসম্পদ ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাকেই প্রকট করে তোলে।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। অধিদপ্তর মূলত খননকাজেই সীমাবদ্ধ এবং গবেষণা, সংরক্ষণ ও প্রদর্শনে পিছিয়ে রয়েছে। অধিদপ্তরের আওতাধীন ৫১৭টি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি এবং ২২টি জাদুঘরের ব্যবস্থাপনার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে যে, অধিদপ্তরের আঞ্চলিক পর্যায়ে কতিপয় কর্মকর্তা ক্ষমতার অপব্যবহার করে দুর্নীতির বিশাল নেটওয়ার্ক তৈরি করেছেন। যেমন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একজন আঞ্চলিক পরিচালক দীর্ঘ ১০ বছর ধরে একই অফিসে কর্মরত থেকে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগের সম্মুখীন হয়েছেন। এই কর্মকর্তা অদক্ষ শ্রমিকদের কাজে লাগিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে বগুড়ার ভাসুবিহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলোর সংস্কার ও সংরক্ষণ কাজ ব্যাহত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, পুরান ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান অযত্ন, অবহেলা, অবৈধ ভাঙন ও জবরদখলের শিকার হচ্ছে। হাইকোর্টের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ঐতিহ্য সংরক্ষণের তালিকাভুক্ত স্থাপনাগুলো সুরক্ষিত নয়, যা দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আরবান স্টাডি গ্রুপের মতে, পুরান ঢাকায় অন্তত ২,২০০টি স্থাপনা ঐতিহ্য হিসেবে সংরক্ষণযোগ্য হলেও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর মাত্র ৩৫টি এবং রাজউক ৭৪টি স্থাপনাকে তালিকাভুক্ত করেছে।

অন্যদিকে, দেশের পর্যটন খাতও নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার জালে আবদ্ধ। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন (বিপিসি) আকর্ষণীয় স্থানে হোটেল-মোটেল থাকা সত্ত্বেও ধারাবাহিক লোকসান গুনছে। ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত গড়ে ১০ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে, যার মূল কারণ হিসেবে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, আমলানির্ভরতা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাদারত্বের ঘাটতিকে দায়ী করা হচ্ছে। ৩৫টি বাণিজ্যিক কেন্দ্রের মধ্যে ৩৩টিই আয়ের লক্ষ্য পূরণ করতে পারেনি। পর্যটকদের জন্য আধুনিকতার অভাব এবং সেবার মান নিয়ে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া, দেশের জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে, যেমন কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সেন্টমার্টিন, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও সিলেটে, স্থানীয় সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং পর্যটকদের হয়রানির অভিযোগ নিয়মিত ঘটনা। সিলেটের রাতারগুল ও ভোলাগঞ্জের সাদা পাথরের মতো স্থানগুলোতে নৌকা ও সিএনজি চালকদের সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য পর্যটকদের জিম্মি করে রেখেছে। পর্যটন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরাপত্তা ও সুরক্ষার অভাবে দেশি পর্যটকদের মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে এবং জাফলংয়ের মতো স্থানে পর্যটকদের হামলার শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এসব সমস্যা সত্ত্বেও, পর্যটন শিল্পকে লাভজনক করতে সরকারি অর্থায়নের পরিবর্তে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর লক্ষ্য রাখে।

এই দুই খাতের সংকটের মূলে রয়েছে সমন্বিত নীতি ও কার্যকর বাস্তবায়নের অভাব। পর্যটন খাতের উন্নয়নে একটি সুস্পষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব রয়েছে এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতা, নিরাপত্তার অভাব এবং পর্যাপ্ত তথ্যের অভাবও বড় চ্যালেঞ্জ। পর্যটন মন্ত্রণালয়, করপোরেশন ও বোর্ডগুলো আমলাদের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে, যেখানে পর্যটন খাতের বিশেষজ্ঞদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। একক পর্যটন আইন, ন্যাশনাল ট্যুরিজম ডেটাবেইস, ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট বা গবেষণা সেলের মতো মৌলিক বিষয়গুলো আজও তৈরি হয়নি। পর্যটনের উন্নয়নে ১৯টি মন্ত্রণালয়ের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করছে। একইভাবে, প্রত্নতত্ত্ব সংরক্ষণেও সমন্বিত নীতি, আর্থিক প্রণোদনা, পুনর্বাসন এবং কঠোর নজরদারির অভাব রয়েছে। দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আধুনিক জীবনযাত্রার প্রভাব ও নগরায়ণের অস্থিরতায় সংকটের মধ্যে পড়ছে, যা আমাদের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়।

সুপারিশ: বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাতের এই করুণ দশা থেকে উত্তরণের জন্য অবিলম্বে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। প্রথমত, প্রত্নসম্পদ পাচার রোধে বিদ্যমান আইনকে যুগোপযোগী করে কঠোর শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে এবং সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা দূর করতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে এবং গবেষণায় গুরুত্ব দিতে হবে। তৃতীয়ত, পর্যটন করপোরেশনের লোকসান কমাতে এর ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজাতে হবে, পেশাদারিত্ব বাড়াতে হবে এবং পর্যটকদের হয়রানি বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করতে হবে। চতুর্থত, পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাতের উন্নয়নে একটি সমন্বিত, দীর্ঘমেয়াদি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে একাধিক মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতা দূর করা হবে। পরিশেষে, দেশের ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো সংরক্ষণে আর্থিক প্রণোদনা, পুনর্বাসন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে একটি টেকসই সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে আমাদের অমূল্য ঐতিহ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষিত থাকে।


🔎 অনুসন্ধানে: তৌসিফ রহমান

তৌসিফ রহমান, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব সম্পদ।

کوئی تبصرہ نہیں ملا


News Card Generator