নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য গ্রাম থেকে শহরে: অসম্পূর্ণ কাঠামোর চক্রব্যূহ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য গ্রাম থেকে শহরে: অসম্পূর্ণ কাঠামোর চক্রব্যূহ

রেহানা আক্তার  avatar   
রেহানা আক্তার
নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য গ্রাম থেকে শহরে: অসম্পূর্ণ কাঠামোর চক্রব্যূহ
নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য গ্রাম থেকে শহরে: অসম্পূর্ণ কাঠামোর চক্রব্যূহ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত অর্থবছরে গ্রামীণ নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য প্রশিক্ষণের সুযোগ ও আধুনিক ক্রীড়...

সম্প্রতি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত অর্থবছরে গ্রামীণ নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য প্রশিক্ষণের সুযোগ ও আধুনিক ক্রীড়া অবকাঠামো তৈরিতে বরাদ্দকৃত অর্থের মাত্র ৪২% সদ্ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে। এই অপ্রতুল ব্যবহার কেবল আর্থিক অব্যবস্থাপনার চিত্রই তুলে ধরে না, বরং তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে আসা সম্ভাবনাময় নারী ক্রীড়াবিদদের শহরকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতামূলক মঞ্চে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতাকেই প্রকটভাবে উন্মোচন করে। যদিও বাংলাদেশ সরকার ক্রীড়া ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের মতো জনপ্রিয় আয়োজনগুলো গ্রাম থেকে প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের তুলে আনছে, কিন্তু এই প্রতিভাদের দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণ, পুষ্টি, শিক্ষা এবং নিরাপদ আবাসন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একটি সুসংগঠিত ব্যবস্থার অভাব এখনও প্রকট।

তৃণমূল থেকে উঠে আসা নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য 'অসম্পূর্ণ কাঠামোর চক্রব্যূহ' একটি বাস্তব চ্যালেঞ্জ। গ্রাম থেকে শহরে আসার পর তারা প্রায়শই উন্নত প্রশিক্ষণ সুবিধা, মানসম্মত কোচ এবং প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে অভ্যস্ত হতে পারেন না। বিশ্বব্যাংকের (World Bank) এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বাংলাদেশের গ্রামীণ নারী ক্রীড়াবিদদের মধ্যে প্রায় ৬০% খেলাধুলা ছেড়ে দেয় প্রশিক্ষণ বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সমন্বয়ের অভাবে। বিশেষ করে বয়ঃসন্ধিকালে শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নেওয়ার জন্য যে বিশেষায়িত সহযোগিতা প্রয়োজন, তার অভাব তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে শুরুতেই সীমিত করে দেয়। অনেক সময় পরিবারের দারিদ্র্য, সামাজিক রক্ষণশীলতা এবং নিরাপত্তাহীনতার কারণেও তাদের ক্রীড়া জীবন থমকে যায়। শহরের আধুনিক ক্রীড়া একাডেমিগুলো সাধারণত উচ্চ ব্যয়ের কারণে গ্রামীণ দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের জন্য সহজলভ্য নয়, ফলে একটি বিরাট প্রতিভাবান অংশ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।

এই কাঠামোগত শূন্যতা পূরণে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) বাংলাদেশের ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তার প্রস্তাব দিলেও, এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় ধীরগতি লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য পৃথক আবাসন, স্বাস্থ্যসম্মত ডরমিটরি এবং পুষ্টিসম্মত খাদ্যের অভাব একটি বড় সমস্যা। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (National Sports Council) কর্তৃক পরিচালিত কিছু প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থাকলেও, সেগুলোর ধারণক্ষমতা এবং আধুনিক সুযোগ-সুবিধা গ্রামীণ প্রেক্ষাপট থেকে আসা অসংখ্য মেয়ের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে, শহরের ক্রীড়া ক্লাব বা একাডেমিগুলো নিজেদের প্রশিক্ষণে অগ্রাধিকার দেয়, যা গ্রামীণ প্রতিভাদের জন্য একটি 'সেকেন্ড ক্লাস' নাগরিকত্বের অনুভূতি তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, ২০১৯ সালের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জাতীয় পর্যায়ের টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণকারী নারী ক্রীড়াবিদদের মাত্র ১৫% গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা, বাকিরা শহর বা উপশহর থেকে এসেছেন, যা গ্রামীণ প্রতিভাদের মূলধারায় অন্তর্ভুক্তির চ্যালেঞ্জকে স্পষ্ট করে।

সূচক ২০১৫ সাল ২০২০ সাল ২০২৩ সাল
উপজেলা পর্যায়ে নারী ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সংখ্যা ২৫ ৩১ ৩২
নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য মাসিক বৃত্তি (টাকা) ২,০০০ ৩,০০০ ৩,৫০০
জাতীয় পর্যায়ে নারী ক্রীড়াবিদদের অংশগ্রহণে গ্রামীণ প্রতিনিধিত্ব (%) ১৩% ১৪% ১৫%
ক্রীড়া খাতে মোট সরকারি বরাদ্দে নারী ক্রীড়া সংশ্লিষ্ট অংশের হার (%) ৪.৫% ৫.২% ৫.৫%

উৎস: যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এবং বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ।

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে 'জাতীয় ক্রীড়া নীতিমালা-২০২২' এর অধীনে একটি সুনির্দিষ্ট 'গ্রাম থেকে শহরে নারী ক্রীড়াবিদ স্থানান্তর ও সমন্বয় কর্মসূচী' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে প্রতিটি জেলায় নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য একটি করে আধুনিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং আবাসন সুবিধার সংস্থান থাকবে, যা জেলা ক্রীড়া সংস্থা দ্বারা পরিচালিত হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এর যৌথ অর্থায়নে 'ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প (দ্বিতীয় পর্যায়)' এর আওতায়, উপজেলা পর্যায়ে কমপক্ষে ১০০টি বহুমুখী ক্রীড়া কমপ্লেক্স নির্মাণ করতে হবে, যেখানে নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য পৃথক প্রশিক্ষণ কক্ষ, স্বাস্থ্যসম্মত স্যানিটেশন এবং পুষ্টি সহায়তা নিশ্চিত করার জন্য একটি নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ থাকবে।
  • জাতীয় ক্রীড়া পরিষদকে একটি বিশেষ 'নারী ক্রীড়াবিদ বৃত্তি ও নিরাপত্তা তহবিল' গঠন করতে হবে, যেখানে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় গ্রামীণ নারী ক্রীড়াবিদদের জন্য মাসিক বৃত্তির পরিমাণ ন্যূনতম ৫,০০০ টাকায় উন্নীত করা হবে এবং তাদের শিক্ষাজীবন, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য নিয়মিত কাউন্সেলিং সেবার ব্যবস্থা থাকবে, যা ক্রীড়া পরিদপ্তর দ্বারা পর্যবেক্ষণ করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: রেহানা আক্তার

রেহানা আক্তার 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নারী ক্রীড়াবিদ ও কাঠামোগত সুবিধা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator