বাংলাদেশে খাদ্য ভেজাল একটি ভয়াবহ জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে, যা দেশের প্রায় প্রতিটি নাগরিকের জীবনকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে শিশুখাদ্য পর্যন্ত সব কিছুতেই বিষাক্ত রাসায়নিক, ভারী ধাতু এবং ক্ষতিকর জীবাণুর উপস্থিতি জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)-এর মতো নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো থাকলেও, তাদের কার্যক্রমের কার্যকারিতা এবং অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একদিকে যেমন ভেজালবিরোধী অভিযান চলছে, অন্যদিকে এই খাতের দুর্নীতি ও অনিয়ম সমাজের গভীরে বাসা বেঁধেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
দেশের বাজারে পানি, শাকসবজি, তেল, দুধ, মসলা, মিষ্টি এবং এমনকি শিশুখাদ্যসহ প্রায় সব ধরনের খাদ্যপণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক ও জীবাণুর অস্তিত্ব পাওয়া যাচ্ছে। জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি ইনস্টিটিউটের (আইপিএইচ) ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় দৈনন্দিন খাদ্যদ্রব্যে মারাত্মক রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি ধরা পড়েছে। সম্প্রতি, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, পানীয় জল থেকে শুরু করে শাকসবজি, তেল, দুধ, মসলা, মিষ্টি ও শিশুখাদ্য—নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা খাদ্যপণ্যে মিলেছে ক্ষতিকর রাসায়নিক, ভারী ধাতু ও জীবাণুর অস্তিত্ব। ঢাকার বিভিন্ন বাজার থেকে সংগৃহীত সবজির নমুনায় ১.১৬-২.৩৭ পিপিএম মাত্রার সিসা এবং ০.৩৩ পিপিএম ক্যাডমিয়াম পাওয়া গেছে। এমনকি মাছ, মুরগি, দুধ, লবণ এবং বোতলজাত পানিতেও মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক। এসব ভেজাল খাদ্যের কারণে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভারের রোগ, হৃদরোগ, থাইরয়েডের জটিলতা এবং শিশুদের বিকাশজনিত সমস্যাসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৬০ কোটি মানুষ দূষিত খাবার খেয়ে অসুস্থ হয়, যার মধ্যে প্রায় ৪ লাখ ৪২ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। বাংলাদেশে প্রতিনিয়ত ভেজাল খাবার খেয়ে ৪৫ লাখ মানুষ স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছেন।
খাদ্যপণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও ভেজাল রোধে বিএসটিআই একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংস্থাটি নিয়মিত বাজার থেকে পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করে এবং মানহীন পণ্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সর্বশেষ, মার্চ ২০২৬-এ বিএসটিআই ৪৯টি পণ্যে ভেজাল বা নিম্নমান খুঁজে পেয়েছে, যার মধ্যে মুড়ি, চানাচুর, সেমাই, লবণ, সরিষার তেল, হলুদের গুঁড়া, সস, কেক এবং চিপস উল্লেখযোগ্য। জুলাই ২০২৬-এ অতিরিক্ত প্রিজারভেটিভ, ক্ষতিকর অণুজীব বা নিম্নমানের পুষ্টি উপাদানের কারণে ৪টি প্রতিষ্ঠানের ৮ ধরনের পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে বিএসটিআই। সংস্থাটি বাধ্যতামূলক মান সনদের আওতাভুক্ত পণ্যের সংখ্যাও বাড়িয়েছে, যা বর্তমানে ২৭৬টি। তবে, পণ্যের সংখ্যা বাড়লেও বিএসটিআই-এর মান নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা সেভাবে বাড়েনি। এর চেয়েও গুরুতর বিষয় হলো, বিএসটিআই-এর অভ্যন্তরীণ প্রশাসনিক অনিয়ম, দুর্নীতি এবং ব্যক্তি সখ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে পদোন্নতি ও বদলির অভিযোগ উঠেছে। চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগীয় অফিসের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবসায়ী হয়রানি ও অনৈতিক অর্থ আদায়ের অভিযোগও পাওয়া গেছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বিএসটিআই-এর ৩০০ কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন এবং ইঙ্গিত দিয়েছেন যে মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তাও এই অনিয়মের সাথে জড়িত থাকতে পারেন। এসব অভিযোগ বিএসটিআই-এর প্রতি জনআস্থা কমিয়ে দিচ্ছে এবং এর সিল টাকার বিনিময়ে পাওয়া যায় এমন ধারণাও প্রচলিত আছে।
বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এর মতো আইন বিদ্যমান রয়েছে। তবে, এসব আইনের বাস্তবায়ন প্রায়শই দুর্বল। ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান সাময়িকভাবে অনিয়ম কমাতে পারলেও, লঘু সাজার কারণে ভেজালকারীদের দৌরাত্ম্য কিছুতেই থামছে না এবং অভিযান শেষ হওয়ার পর পুরোনো অনিয়ম আবার ফিরে আসে। সম্প্রতি, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ক্ষুদ্র ও মাঝারি খাদ্য ব্যবসায়ীদের জন্য নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করে একটি নতুন প্রবিধানমালা (নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬) জারি করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো রাস্তার পাশের দোকান থেকে শুরু করে রেস্তোরাঁ, খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান—সবাইকে আইনি কাঠামোর আওতায় আনা। তবে, ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন যে এই নতুন নিয়ম হয়রানি ও দুর্নীতির সুযোগ বাড়াতে পারে, বিশেষ করে অনলাইন প্রক্রিয়াতেও পাসপোর্ট বা বিআরটিএ-এর মতো সেবাগুলোতে হয়রানির অভিজ্ঞতা থাকায়। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে শুধু আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়, বরং এর কঠোর ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন অপরিহার্য।
খাদ্য ভেজালের এই ব্যাপকতা কেবল জনস্বাস্থ্যকেই নয়, দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ভোক্তারা প্রতিনিয়ত প্রতারিত হচ্ছেন এবং নিরাপদ খাদ্যের অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিভিন্ন সময়ে বিএসটিআই, বিএফএসএ এবং জাতীয় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরীক্ষায় ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি ধরা পড়লেও, উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে কার্যকর নজরদারির অভাব রয়েছে। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বিচ্ছিন্ন অভিযান যথেষ্ট নয়; বরং একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী কৌশল প্রয়োজন, যেখানে আইনের কঠোর প্রয়োগ, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি নির্মূলকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
সুপারিশ: খাদ্য ভেজাল ও বিএসটিআই-এর কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে: ১. বিএসটিআই-এর অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ ও দ্রুত তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ২. বিএসটিআই-এর ল্যাবরেটরি সক্ষমতা ও জনবল বৃদ্ধি করতে হবে, যাতে বাধ্যতামূলক পণ্যের সংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সাথে মান নিয়ন্ত্রণ প্রক্রিয়াও শক্তিশালী হয়। ৩. নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং ভেজালকারীদের জন্য লঘু সাজার পরিবর্তে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান কার্যকর করতে হবে, প্রয়োজনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান বিবেচনা করা যেতে পারে। ৪. বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) কর্তৃক নতুন প্রবর্তিত নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত করতে হবে এবং ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজবোধ্য প্রশিক্ষণ ও সহায়তা প্রদান করতে হবে। ৫. উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের প্রতিটি ধাপে কার্যকর নজরদারি এবং নিয়মিত, অনিয়মিত উভয় ধরনের অভিযান পরিচালনা করতে হবে, যা কোনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবমুক্ত হবে। ৬. জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে, যাতে ভোক্তারা ভেজাল খাদ্য চিনতে এবং এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারেন। ৭. খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করতে হবে এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে সাময়িক অভিযানের পরিবর্তে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান আসে।