চিকিৎসা খাতে মেধা পাচার: সংকট থেকে উত্তরণে নীতিগত ব্যর্থতা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

চিকিৎসা খাতে মেধা পাচার: সংকট থেকে উত্তরণে নীতিগত ব্যর্থতা

ড. জহিরুল ইসলাম  avatar   
ড. জহিরুল ইসলাম
চিকিৎসা খাতে মেধা পাচার: সংকট থেকে উত্তরণে নীতিগত ব্যর্থতা
চিকিৎসা খাতে মেধা পাচার: সংকট থেকে উত্তরণে নীতিগত ব্যর্থতা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC)-এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি নিবন্ধিত চিকিৎসক দেশ ছেড়েছেন, ...

সম্প্রতি বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC)-এর প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে প্রায় ৫ হাজারেরও বেশি নিবন্ধিত চিকিৎসক দেশ ছেড়েছেন, যাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক উচ্চশিক্ষিত ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যামাত্র নয়, বরং দেশের চিকিৎসা খাতের ভবিষ্যৎ এবং জনস্বাস্থ্যের উপর এর সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাবের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। বিশেষ করে, উন্নত প্রশিক্ষণ, গবেষণা ও কর্মপরিবেশের অভাবে তরুণ চিকিৎসকদের মধ্যে বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রবণতা প্রকট আকার ধারণ করেছে, যা আমাদের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মেরুদণ্ড ভেঙে দিচ্ছে এবং জনসেবাকে গুরুতর সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

বাংলাদেশের চিকিৎসা শিক্ষা ও কর্মসংস্থান ব্যবস্থায় বিদ্যমান কাঠামোগত দুর্বলতা এবং নীতিগত ব্যর্থতা এই মেধা পাচারের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত। একদিকে যেমন উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ সীমিত, তেমনি অন্যদিকে চিকিৎসকদের কর্মপরিবেশে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা, আধুনিক প্রযুক্তি এবং উপযুক্ত বেতন কাঠামোর অভাব সুস্পষ্ট। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC)-এর সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে দেশের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা খাতে বরাদ্দ অপ্রতুলতার চিত্র উঠে এসেছে। ফলস্বরূপ, মেধাবী চিকিৎসকরা উন্নত দেশের গবেষণাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দিকে ঝুঁকছেন, যেখানে তাদের মেধার সঠিক মূল্যায়ন ও বিকাশের সুযোগ রয়েছে। এটি কেবল চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়, বরং জাতীয় পর্যায়ে একটি সুসংহত গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) কাঠামোর অনুপস্থিতির ফল। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও দেখা যায়, সরকারি খাতে নতুন পদ সৃষ্টি হলেও আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ পদ এবং তাদের জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব বিদ্যমান। বেসরকারি খাতেও প্রতিযোগিতামূলক বেতন কাঠামো এবং পেশাগত উন্নতির সুযোগের অভাব অনেক চিকিৎসককে হতাশ করছে, যা তাদের বিদেশে চাকরির সুযোগ খুঁজতে উৎসাহিত করছে।

এই সংকট নিরসনে সরকারের বিভিন্ন নীতি ও কর্মসূচির সমন্বয়হীনতা এবং দুর্বল বাস্তবায়ন একটি বড় বাধা। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA)-এর মাধ্যমে দেশের মানবসম্পদকে দক্ষ করে তোলার প্রচেষ্টা থাকলেও, চিকিৎসা খাতের নির্দিষ্ট চাহিদা পূরণে এর ভূমিকা এখনো সীমিত। চিকিৎসকদের জন্য বিশেষায়িত দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচির অভাব এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের স্বল্পতা মেধা পাচারকে ত্বরান্বিত করছে। একই সাথে, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এবং SEIP (Skills for Employment Investment Program)-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় গুরুত্ব দিলেও, উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবীদের জন্য, বিশেষ করে চিকিৎসকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি এবং বিদেশে কর্মসংস্থান উপযোগী করে তোলার ক্ষেত্রে তাদের কোনো সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা নেই। BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো)-এর তথ্য অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা শেষে কর্মসংস্থান এবং বিদেশে পাড়ি জমানোর প্রবণতা নিয়ে পর্যাপ্ত গভীর বিশ্লেষণ ও ডেটা সংগ্রহে এখনো ঘাটতি রয়েছে, যা নীতি নির্ধারকদের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকায়, একটি সমন্বিত কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না, যা মেধা পাচার রোধে অপরিহার্য।

বছর মোট নিবন্ধিত চিকিৎসক বিদেশগামী চিকিৎসকের সংখ্যা (আনুমানিক) শতকরা হার (বিদেশগামী)
২০১৮ ৯৭,০১২ ৮৫০ ০.৮৮%
২০১৯ ১,০১,০৪৩ ১,০০০ ০.৯৯%
২০২০ ১,০৫,৩১২ ১,২০০ ১.১৪%
২০২১ ১,০৯,৫৩০ ১,৪০০ ১.২৮%
২০২২ ১,১৩,৮০০ ১,৬০০ ১.৪১%

উৎস: বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) ও বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং UGC-কে যৌথভাবে একটি উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা বিষয়ক জাতীয় কৌশলপত্র প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোতে গবেষণা খাতে বাজেট বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ল্যাব ও ফেলোশিপ প্রোগ্রাম চালু করার সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা থাকবে।
  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA)-কে ‘চিকিৎসক দক্ষতা উন্নয়ন প্রোগ্রাম’ (Physician Skill Development Program) নামে একটি বিশেষায়িত কর্মসূচি চালু করতে হবে, যার আওতায় উচ্চতর ক্লিনিক্যাল দক্ষতা, আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি এবং বিদেশে কর্মসংস্থানের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষা ও সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে, প্রয়োজনে SEIP-এর মাধ্যমে বিশেষ তহবিল বরাদ্দ করতে হবে।
  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে 'চিকিৎসক কর্মসংস্থান ও ধরে রাখা বিষয়ক নীতি' (Physician Retention Policy) নামে একটি নতুন নীতি প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে চিকিৎসকদের জন্য আকর্ষণীয় বেতন কাঠামো, পদোন্নতির সুস্পষ্ট পথ, উন্নত কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণ এবং বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মরত চিকিৎসকদের জন্য অতিরিক্ত প্রণোদনার বিধান থাকবে, যা BANBEIS-এর ডেটা বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. জহিরুল ইসলাম

ড. জহিরুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্রেন ড্রেন ও মেধা পাচার। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator