স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় ভয়াবহ… | আই নিউজ বিডি

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় ভয়াবহ অনিয়ম

রেহনুমা তাবাসসুম  avatar   
রেহনুমা তাবাসসুম
স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় ভয়াবহ অনিয়ম
স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় ভয়াবহ অনিয়ম
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘকাল ধরে দুর্নীতির এক গভীর চক্রে আবর্তিত। চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতির অভিযোগ এখন...

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত দীর্ঘকাল ধরে দুর্নীতির এক গভীর চক্রে আবর্তিত। চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় ব্যাপক অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং দুর্নীতির অভিযোগ এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন নিজেও স্বীকার করেছেন যে, বিগত অপশাসনের কারণে দেশের স্বাস্থ্য খাত দুর্নীতিতে নিমজ্জিত এবং ১৭ বছরের দুর্নীতি ও অবহেলার কারণে এই খাতে কোনো কাজ হয়নি। তিনি এই দুর্নীতি শতভাগ নির্মূল করার অঙ্গীকার করেছেন। এই দুর্নীতি শুধু আর্থিক ক্ষতিই করছে না, বরং দেশের সাধারণ মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার অধিকারকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।

বিশেষ করে চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটায় দুর্নীতির চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কোভিড-১৯ অতিমারীর সময়ে এই খাতের দুর্বলতা ও দুর্নীতির ব্যাপকতা প্রকটভাবে সামনে আসে। মাস্ক, পিপিই, স্যানিটাইজার, আইসিইউ সরঞ্জাম, ভেন্টিলেটর, পিসিআর মেশিন ও টেস্ট কিট সংগ্রহে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীর সরকারি হাসপাতালগুলো অস্বাভাবিক দামে চিকিৎসা সরঞ্জাম কিনেছে। যেমন, কুয়েত-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল প্রতিটি ৬ লাখ ২৫ হাজার টাকা দামে দুটি ইসিজি মেশিন কিনেছিল, অথচ সে সময় এর বাজার দর ছিল ১ লাখ ৯৯ হাজার টাকা। একইভাবে, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকায় একটি হাই-ফ্লো অক্সিজেন থেরাপি ডিভাইস কিনেছিল, যার বাজার মূল্য ছিল ৪ লাখ ৯০ হাজার টাকা। এই ধরনের অনিয়মের কারণে ২০১৯-২০ অর্থবছরে শুধু মহামারীর প্রাথমিক পর্যায়েই প্রায় ২৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা সরকারি অর্থের লোকসান হয়েছে। জাতীয় নাক কান গলা ইনস্টিটিউটে ২৬ ধরনের অনিয়মের মাধ্যমে ২৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে, যার মধ্যে ১২ কোটি ২৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা শুধু চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনাকাটায় অনিয়মের ফল। অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজন না থাকলেও যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে, নিম্নমানের পণ্য সরবরাহ করা হয়েছে, এবং যন্ত্রপাতি স্থাপন না করে গুদামে ফেলে রাখা হয়েছে। এমনকি, সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে ৯০ লাখ ৩০ হাজার টাকা বেশি দামে সরঞ্জাম কেনার ঘটনাও ঘটেছে।

ওষুধ কেনাকাটা এবং সরবরাহেও দুর্নীতির কালো থাবা বিস্তৃত। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালে ২৪ কোটি টাকার ওষুধ কেনায় ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে, যেখানে ১০১ টাকার ওষুধ ১২৯৯ টাকায় বিক্রির ঘটনাও ঘটেছে। বান্দরবান জেলা স্বাস্থ্য বিভাগেও ৪ কোটি টাকার ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী ক্রয়ে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে তদন্ত চলছে। এছাড়া, সরকারি হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য আসা ওষুধ অসাধু চক্রের মাধ্যমে বাজারে বিক্রি হয়ে যাওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও রয়েছে। ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরে নতুন ওষুধের লাইসেন্স প্রদান থেকে শুরু করে ড্রাগ লাইসেন্স নবায়ন পর্যন্ত বিভিন্ন খাতে মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। এই অনিয়মগুলো পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) ২০০৮ এর বিভিন্ন বিধি লঙ্ঘন করে সংঘটিত হচ্ছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১১টি খাতে দুর্নীতি ও অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে এবং এসব প্রতিরোধে ২৫ দফা সুপারিশ মন্ত্রণালয়ে জমা দিয়েছে। দুদকের প্রতিবেদনে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বিভিন্ন ক্রয়, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, পদায়ন, চিকিৎসা দেওয়া, চিকিৎসায় ব্যবহৃত ইকুইপমেন্ট ব্যবহার, ওষুধ সরবরাহসহ বিভিন্ন দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে। কোভিড-১৯ মহামারীর সময়কালে দুর্নীতির অভিযোগের ভিত্তিতে দুদক তদন্ত শুরু করে এবং মাস্ক, পিপিই, স্যানিটাইজার, আইসিইউ সরঞ্জাম, ভেন্টিলেটর, পিসিআর মেশিন ও টেস্ট কিট সংগ্রহে গৃহীত প্রকল্পগুলোর ব্যাপারে বিশদ তথ্য চেয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয়। এমনকি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও এর আওতাধীন প্রতিষ্ঠানের ৪৫ কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগের তদন্ত চলছে। দুর্নীতির অভিযোগে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ২,৮৩৯টি পদে নিয়োগ বাতিল করেছে।

এই ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের ফলে দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান তলানিতে ঠেকেছে। সাধারণ রোগীরা বিনামূল্যে প্রাপ্য ওষুধ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, নিম্নমানের চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহার হচ্ছে, এবং কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকছে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিতে গিয়ে প্রায় ৪৮.৭ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতির শিকার হয়, যা এই খাতের সংকটকে স্পষ্ট করে তোলে। ফলস্বরূপ, প্রতি বছর প্রায় ৮ লাখ রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। এই পরিস্থিতি দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে বড় বাধা সৃষ্টি করছে এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব মহামারীর রূপ নিচ্ছে।

সুপারিশ: বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি ও অনিয়ম দমনের জন্য অবিলম্বে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য। প্রথমত, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (পিপিআর) এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং ই-জিপি (e-GP) পদ্ধতিকে আরও শক্তিশালী ও স্বচ্ছ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ক্রয় কমিটিতে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ এবং স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে পণ্যের মান ও ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হয়। তৃতীয়ত, যন্ত্রপাতি ক্রয়ের পূর্বে সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা যাচাই, দক্ষ জনবল নিশ্চিতকরণ এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের পরিকল্পনা প্রণয়ন বাধ্যতামূলক করতে হবে। চতুর্থত, স্বাস্থ্য খাতের সকল পর্যায়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে এবং দুর্নীতিবাজদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, সরকারি হাসপাতালগুলোতে ওষুধের স্টক এবং ডায়াগনস্টিক পরীক্ষার মূল্য তালিকা জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থানে প্রদর্শন করতে হবে। সবশেষে, স্বাস্থ্য খাতের বাজেট বরাদ্দ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় বৃদ্ধি করে একটি কার্যকর অর্থায়ন মডেল তৈরি করতে হবে, যা দুর্নীতির সুযোগ কমিয়ে আনবে এবং জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করবে।


🔎 অনুসন্ধানে: রেহনুমা তাবাসসুম

রেহনুমা তাবাসসুম, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: স্বাস্থ্য খাত, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটা।

کوئی تبصرہ نہیں ملا


News Card Generator