পশ্চিমা বাজারে পোশাক রপ্তানি: শুল্কমুক্ত সুবিধার ভবিষ্যৎ ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

পশ্চিমা বাজারে পোশাক রপ্তানি: শুল্কমুক্ত সুবিধার ভবিষ্যৎ ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ

মেহেদী হাসান  avatar   
মেহেদী হাসান
পশ্চিমা বাজারে পোশাক রপ্তানি: শুল্কমুক্ত সুবিধার ভবিষ্যৎ ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
পশ্চিমা বাজারে পোশাক রপ্তানি: শুল্কমুক্ত সুবিধার ভবিষ্যৎ ও বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে,...

সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং যুক্তরাজ্যের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধার ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে, বিশেষ করে ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রেক্ষাপটে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির প্রায় ৫১ শতাংশই ছিল ইইউ এবং যুক্তরাজ্যকেন্দ্রিক, যার একটি সিংহভাগ এই শুল্কমুক্ত সুবিধা বা 'এভরিথিং বাট আর্মস' (EBA) স্কিমের অধীনে সম্পন্ন হয়েছে। শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর সম্ভাব্য প্রভাব এবং তা মোকাবিলায় বাংলাদেশের প্রস্তুতির বিষয়টি এখন জাতীয় অর্থনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে।

এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশ প্রায় ৮-৯ শতাংশ শুল্কের সম্মুখীন হতে পারে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতাকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করবে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD)-এর গবেষণা অনুযায়ী, শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ে অন্তত ৬-৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্ষতি হতে পারে, যদি না বিকল্প কোনো বাণিজ্য সুবিধা বা জিএসপি+ স্কিমের আওতায় আসা যায়। জিএসপি+ সুবিধা পাওয়ার জন্য বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক শ্রমমান, পরিবেশগত সুরক্ষা এবং সুশাসনের বিষয়ে ২৭টি আন্তর্জাতিক কনভেনশন সম্পূর্ণরূপে মেনে চলতে হবে, যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, শ্রম অধিকার ও পরিবেশগত মানদণ্ড পূরণে বাংলাদেশের অগ্রগতি পশ্চিমা ক্রেতাদের কাছে এখনো প্রশ্নবিদ্ধ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় NBR-এর শুল্ক নীতি এবং BSEC-এর পুঁজি বাজার সংস্কারের মাধ্যমে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার প্রচেষ্টা জরুরি হয়ে পড়েছে, যাতে রপ্তানিমুখী শিল্প বহুমুখীকরণ এবং উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

পশ্চিমা বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার হারানোর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত বহুমুখীকরণ অপরিহার্য। বর্তমানে পোশাক শিল্পে একক পণ্য নির্ভরতা এবং বাজারের কেন্দ্রীকরণ একটি প্রধান দুর্বলতা। উচ্চমূল্যের ও বৈচিত্র্যপূর্ণ পোশাক পণ্য উৎপাদন, যেমন টেকনিক্যাল টেক্সটাইল, ফাইবারগ্লাস, কার্বন ফাইবার বা সিন্থেটিক ফেব্রিক-ভিত্তিক পোশাক, এবং নতুন বাজার যেমন জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যে প্রবেশাধিকার বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। একইসাথে, উৎপাদন প্রক্রিয়ায় আধুনিক প্রযুক্তি ও স্বয়ংক্রিয়তা প্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন খরচ কমানো এবং পণ্যের মান উন্নত করা অত্যাবশ্যক। ২০৩০ সালের মধ্যে পোশাক রপ্তানি ১০০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই পরিবর্তনগুলো সময়োপযোগী ও কার্যকর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

অর্থবছর মোট পোশাক রপ্তানি (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ইইউ ও যুক্তরাজ্যে রপ্তানি (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) ইইউ ও যুক্তরাজ্যে রপ্তানির শতকরা হার (মোটের%)
২০২০-২১ ৩১.৪৬ ১৬.৭৭ ৫৩.৩২%
২০২১-২২ ৪২.৬১ ২১.৯৮ ৫১.৫৮%
২০২২-২৩ ৪৬.৯৯ ২৪.১৩ ৫১.৩৮%
২০২৩-২৪ (জুলাই-ফেব্রুয়ারি) ৩২.৯২ ১৭.০৭ ৫১.৮৫%

উৎস: রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB) ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠন করে জিএসপি+ সুবিধা প্রাপ্তির জন্য প্রয়োজনীয় ২৭টি আন্তর্জাতিক কনভেনশন (যেমন শ্রম আইন ও পরিবেশ সুরক্ষা) সম্পূর্ণরূপে পরিপালনের একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে এবং নিয়মিতভাবে এর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
  • NBR-কে রপ্তানিমুখী শিল্পের জন্য শুল্ক ও ভ্যাট নীতিতে দীর্ঘমেয়াদী ও স্থিতিশীল প্রণোদনা প্যাকেজ প্রবর্তন করতে হবে, বিশেষ করে নন-কটন এবং উচ্চমূল্যের পোশাক পণ্য উৎপাদনে বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানি সুবিধা সম্প্রসারিত করতে হবে।
  • BSEC-কে পুঁজি বাজারকে আরও স্থিতিশীল ও স্বচ্ছ করতে হবে এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে, যাতে পোশাক শিল্পের বহুমুখীকরণে প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদী মূলধন সংগ্রহ সম্ভব হয়।

✍️ নিবন্ধ লেখক: মেহেদী হাসান

মেহেদী হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও এক্সপোর্ট-ইম্পোর্ট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator