২০২৩ সালের জাতীয় স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে প্রাপ্তবয়স্ক জনসংখ্যার প্রায় ৪২% স্থূলতা বা অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভুগছেন, যা গত দশকের তুলনায় প্রায় ১৫% বৃদ্ধি পেয়েছে। এই উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান কেবল একটি স্বাস্থ্যগত সংকটই নয়, এটি আধুনিক জীবনযাত্রার ধরন, খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক কার্যকলাপের অভাবের একটি সুস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে তরুণদের মধ্যে ফাস্ট ফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের প্রতি আসক্তি দ্রুত বাড়ছে, যা তাদের ভবিষ্যৎ স্বাস্থ্য ঝুঁকিকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে, ফিটনেস ও আধুনিক জীবনধারার মধ্যে সম্পর্ক এবং এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত জরুরি।
আধুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং নগরায়নের বিস্তার জীবনযাত্রায় যেমন সুবিধা এনেছে, তেমনি এর কিছু অপ্রত্যাশিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে। একসময় শারীরিক পরিশ্রম ছিল দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, কিন্তু এখন যান্ত্রিকীকরণ এবং সেডেন্টারি কাজের প্রকৃতি মানুষের হাঁটাচলা এবং কায়িক শ্রমের প্রয়োজনীয়তা কমিয়ে দিয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের এক সমীক্ষা অনুসারে, বাংলাদেশের কর্মজীবী মানুষের মধ্যে গড়ে দৈনিক স্ক্রিন টাইম (মোবাইল, কম্পিউটার, টেলিভিশন) ৬-৮ ঘণ্টায় পৌঁছেছে, যা তাদের শারীরিক কার্যকলাপের সময়কে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করেছে। এর ফলস্বরূপ, ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এবং কিছু ক্যান্সারের মতো অসংক্রামক রোগের (NCDs) প্রকোপ বাড়ছে। বিশ্ব ব্যাংক (World Bank) এর এক বিশ্লেষণ বলছে, অসংক্রামক রোগের কারণে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় প্রতি বছর প্রায় ৭-৯% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে একটি বড় বাধা। এই ব্যয় বৃদ্ধির একটি বড় অংশ আসে দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসা এবং কর্মক্ষমতা হারানোর ফলস্বরূপ। বিশেষ করে, শহরের তরুণ প্রজন্ম, যারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বেশি সময় ব্যয় করে এবং বাইরের খেলাধুলায় কম অংশ নেয়, তাদের মধ্যে ভিটামিন ডি এর অভাব এবং মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতিও পরিলক্ষিত হচ্ছে।
শুধু শারীরিক স্বাস্থ্যই নয়, আধুনিক জীবনধারা মানসিক স্বাস্থ্যের উপরও ব্যাপক প্রভাব ফেলছে। দ্রুতগতির জীবন, কর্মক্ষেত্রের চাপ, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্রভাব এবং একাকীত্ব বোধ তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার হার বাড়িয়ে দিচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) কর্তৃক প্রকাশিত 'স্বাস্থ্য ও উন্নয়ন: দক্ষিণ এশিয়ার প্রেক্ষাপট' শীর্ষক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের শহুরে তরুণ জনগোষ্ঠীর প্রায় ২০-২৫% কোনো না কোনো ধরনের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছে। এই সমস্যাগুলো প্রায়শই শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের সাথে সম্পর্কযুক্ত। উদাহরণস্বরূপ, মানসিক চাপে থাকা ব্যক্তিরা প্রায়শই 'কমফোর্ট ফুড' হিসেবে উচ্চ ক্যালরিযুক্ত অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ করে, যা ওজন বৃদ্ধি এবং অন্যান্য শারীরিক অসুস্থতার কারণ হয়। অপরদিকে, শারীরিক কার্যকলাপ মানসিক চাপ কমাতে এবং মেজাজ উন্নত করতে সাহায্য করে, যা আধুনিক জীবনে প্রায়শই উপেক্ষিত। সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত একটি পাইলট প্রোগ্রামে দেখা গেছে, যে স্কুলগুলোতে নিয়মিত শারীরিক শিক্ষার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে, সেখানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার এবং একাডেমিক পারফরম্যান্স উভয়ই উন্নত হয়েছে, যা প্রমাণ করে ফিটনেস কেবল শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও অপরিহার্য। এই প্রোগ্রামটি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার সম্ভাব্যতা নিয়ে আলোচনা চলছে, যা একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হতে পারে।
| সূচক | ২০১৩ সাল | ২০২৩ সাল | পরিবর্তনের হার (%) | উৎস |
|---|---|---|---|---|
| শহরাঞ্চলে স্থূল/অতিরিক্ত ওজন প্রাপ্তবয়স্ক (%) | ২৭% | ৪২% | +১৫% | জাতীয় স্বাস্থ্য জরিপ |
| কর্মজীবী মানুষের গড় দৈনিক স্ক্রিন টাইম (ঘণ্টা) | ৪.৫ | ৭.২ | +৬০% | ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম, স্থানীয় সমীক্ষা |
| অসংক্রামক রোগে স্বাস্থ্য ব্যয় বৃদ্ধি (বার্ষিক গড় %) | ৪.৫% | ৮.১% | +৮০% | World Bank বিশ্লেষণ |
| শহুরে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা (%) | ১২% | ২৩% | +৯২% | ADB প্রতিবেদন |
| প্রতিদিন ফল ও শাকসবজি গ্রহণকারী (%) | ৫২% | ৩৪% | -৩৪% | বাংলাদেশ সরকার, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় |
উৎস: জাতীয় স্বাস্থ্য জরিপ, ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম, World Bank, ADB, বাংলাদেশ সরকার-এর বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সমীক্ষা থেকে সংগৃহীত।
সুপারিশ
- বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয় যৌথভাবে 'জাতীয় ফিটনেস ও সুস্থ জীবনধারা নীতি ২০২৩' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করবে, যেখানে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দৈনিক কমপক্ষে ৩০ মিনিট শারীরিক কার্যকলাপ বাধ্যতামূলক করা হবে এবং ফাস্ট ফুড ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের বিজ্ঞাপন নিয়ন্ত্রণে 'খাদ্য নিরাপত্তা আইন ২০১৩' এর অধীনে কঠোর বিধিমালা জারি করা হবে।
- World Bank ও ADB এর আর্থিক সহায়তায় 'শহুরে স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প' চালু করা হবে, যার মাধ্যমে প্রতিটি সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভায় নির্দিষ্ট সংখ্যক উন্মুক্ত ব্যায়ামাগার, হাঁটার পথ এবং সাইক্লিং লেন তৈরি করা হবে এবং এসব স্থানের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ দিতে হবে।
- সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, যেমন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, 'ডিজিটাল স্বাস্থ্য সচেতনতা প্রচারাভিযান' শুরু করবে, যেখানে টেলিভিশন, রেডিও এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিয়মিতভাবে ফিটনেস, পুষ্টি এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ক তথ্যবহুল অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে এবং 'ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন ২০১৮' এর আওতায় ভুল স্বাস্থ্য তথ্য প্রচারের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।