ফ্যাশন বর্জ্য থেকে নতুন জীবন: সার্কুলার ইকোনমির পথে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ফ্যাশন বর্জ্য থেকে নতুন জীবন: সার্কুলার ইকোনমির পথে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প

নাবিলা পারভীন  avatar   
নাবিলা পারভীন
ফ্যাশন বর্জ্য থেকে নতুন জীবন: সার্কুলার ইকোনমির পথে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প
ফ্যাশন বর্জ্য থেকে নতুন জীবন: সার্কুলার ইকোনমির পথে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (BGMEA) এবং গ্লোবাল গ্রিন গ্রোথ ইনস্টিটিউট (GGGI)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত 'সার্কুলার ইকোনমি ইন টেক্সট...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (BGMEA) এবং গ্লোবাল গ্রিন গ্রোথ ইনস্টিটিউট (GGGI)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত 'সার্কুলার ইকোনমি ইন টেক্সটাইল সেক্টর: সাস্টেইনেবল ফিউচার ফর বাংলাদেশ' শীর্ষক সেমিনারে পোশাক শিল্পের বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচনের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই সেমিনারে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পে বছরে প্রায় ৫ লাখ টন প্রাক-ভোক্তা বর্জ্য (pre-consumer waste) তৈরি হয়, যার একটি বড় অংশ সঠিকভাবে পুনর্ব্যবহার করা হয় না। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্যকে কাঁচামালে রূপান্তরিত করে পুনরায় উৎপাদন চক্রে ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে বাংলাদেশ শুধু পরিবেশগত চাপই কমাবে না, বরং নতুন অর্থনৈতিক সুযোগও তৈরি করবে, যা দেশের রপ্তানি আয়ের ধারাকে আরও টেকসই করবে।

বাংলাদেশের পোশাক খাত, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮৪% পূরণ করে, দীর্ঘকাল ধরে 'ফাস্ট ফ্যাশন' মডেলের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কাজ করে আসছে। এই মডেলের অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হলো এর রৈখিক উৎপাদন প্রক্রিয়া – যেখানে কাঁচামাল সংগ্রহ, উৎপাদন, ব্যবহার এবং তারপর বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হয়। কিন্তু বৈশ্বিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলো এখন ক্রমবর্ধমানভাবে তাদের সরবরাহ শৃঙ্খলে টেকসইতা এবং সার্কুলার ইকোনমির নীতিগুলো অন্তর্ভুক্ত করতে চাইছে। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে, যেখানে পোশাক কারখানাগুলো তাদের উৎপাদন প্রক্রিয়ার বর্জ্যকে (যেমন কাটিং স্ক্র্যাপ, সুতার বর্জ্য) উচ্চ-মূল্যের পণ্যে রূপান্তর করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ডেনিম এবং নিটওয়্যার খাতে উৎপাদিত বর্জ্য থেকে নতুন সুতা এবং কাপড় তৈরি করা সম্ভব, যা পুনরায় পোশাক উৎপাদনে ব্যবহৃত হতে পারে। এই রূপান্তর কেবল পরিবেশগত পদচিহ্নই কমাবে না, বরং নতুন ধরনের কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনেরও সুযোগ সৃষ্টি করবে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (EPB)-এর তথ্যমতে, গত অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৪৭ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে, যার মধ্যে সার্কুলার অর্থনীতি মডেলের অন্তর্ভুক্ত পণ্যগুলোর হিস্যা এখনো নগণ্য। এই হিস্যা বাড়াতে পারলে তা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি প্রবৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও শক্তিশালী করবে।

সার্কুলার ইকোনমির পথে বাংলাদেশের এই অভিযাত্রায় বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। বিশেষ করে, বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য উন্নত প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর অভাব একটি বড় বাধা। বর্তমানে, বেশিরভাগ বর্জ্য স্থানীয় পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে সংগ্রহ করা হয়, যেখানে আধুনিক পুনর্ব্যবহার পদ্ধতির অভাব স্পষ্ট। এই সমস্যা সমাধানে, বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (BKMEA) এবং পোশাক কারখানার মালিকদের উচিত যৌথভাবে অত্যাধুনিক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র স্থাপনে বিনিয়োগ করা। এছাড়া, পোশাক কারখানায় কর্মপরিবেশের সুরক্ষা এবং কর্মীদের অধিকার নিশ্চিত করাও টেকসই সার্কুলার মডেলের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (DIFE) এর কঠোর নজরদারি এবং নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে এটি নিশ্চিত করা সম্ভব। সার্কুলার অর্থনীতিতে ব্যবহৃত কাঁচামাল এবং উৎপাদিত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করাও জরুরি, যাতে বৈশ্বিক ক্রেতাদের আস্থা অর্জন করা যায়। এটি কেবল পরিবেশগত টেকসইতা নয়, বরং সামাজিক এবং অর্থনৈতিক টেকসইতাও নিশ্চিত করবে, যা বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের জন্য অপরিহার্য। এই পদক্ষেপগুলো দেশের পোশাক শিল্পকে ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনেও সহায়তা করবে এবং বিশ্বব্যাপী 'সবুজ পোশাক' উৎপাদনে বাংলাদেশের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করবে।

বর্জ্যের প্রকার বার্ষিক আনুমানিক পরিমাণ (টন) পুনর্ব্যবহার হার (%) পুনর্ব্যবহারের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা (মিলিয়ন USD)
পোশাক কারখানার প্রাক-ভোক্তা বর্জ্য (কাটিং স্ক্র্যাপ, সুতার বর্জ্য) ৫০০,০০০ ২০-২৫% (বর্তমানে অনানুষ্ঠানিকভাবে) ১,০০০ - ১,৫০০
পোস্ট-ভোক্তা বর্জ্য (ব্যবহৃত পোশাক) ৪০০,০০০ (ধারণা করা হয়) < ৫% অনির্ধারিত, তবে উচ্চ সম্ভাবনা
মোট পোশাক বর্জ্য (আনুমানিক) ৯০০,০০০ - ১,০০০ - ১,৫০০+

উৎস: BGMEA, GIZ, রিকভারি টেক্সটাইলস, এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন (২০২২-২০২৩ সালের তথ্যভিত্তিক)

সুপারিশ

  • পোশাক শিল্পের বর্জ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য একটি সুসংগঠিত জাতীয় কাঠামো প্রতিষ্ঠার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে একটি 'সার্কুলার ইকোনমি পলিসি ফর টেক্সটাইলস' প্রণয়ন করতে হবে। এই নীতিমালায় BGMEA, BKMEA এবং অন্যান্য অংশীজনদের অংশগ্রহণে বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র স্থাপন, আধুনিক পুনর্ব্যবহার প্রযুক্তি আমদানি এবং পুনর্ব্যবহারকৃত উপকরণের জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • পোশাক কারখানায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দক্ষতা বাড়াতে এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণের জন্য DIFE-কে একটি বাধ্যতামূলক 'ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট অডিট' প্রোগ্রাম চালু করতে হবে। এই প্রোগ্রামের আওতায় কারখানাগুলোকে বর্জ্য হ্রাস, পৃথকীকরণ এবং পুনর্ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট নির্দেশিকা অনুসরণ করতে হবে এবং প্রতি বছর এই সংক্রান্ত প্রতিবেদন DIFE-এর কাছে জমা দিতে হবে।
  • পুনর্ব্যবহারকৃত ফাইবার এবং টেক্সটাইল পণ্যের রপ্তানি উৎসাহিত করতে EPB-কে একটি 'গ্রিন এক্সপোর্ট ইনসেনটিভ স্কিম' চালু করতে হবে। এই স্কিমের অধীনে, সার্কুলার প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নগদ সহায়তা বা শুল্ক ছাড়ের ব্যবস্থা থাকবে, যা রপ্তানিকারকদের সার্কুলার অর্থনীতিতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করবে এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়াবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: নাবিলা পারভীন

নাবিলা পারভীন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ফ্যাশন, লাইফস্টাইল ও টেকসই পোশাক। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator