ঘরোয়া একাডেমিতে প্রতিভা অন্বেষণ: জেলা পর্যায় থেকে তারকা তৈরির অন্তরায় কোথায়? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ঘরোয়া একাডেমিতে প্রতিভা অন্বেষণ: জেলা পর্যায় থেকে তারকা তৈরির অন্তরায় কোথায়?

কামরুল ইসলাম  avatar   
কামরুল ইসলাম
ঘরোয়া একাডেমিতে প্রতিভা অন্বেষণ: জেলা পর্যায় থেকে তারকা তৈরির অন্তরায় কোথায়?
ঘরোয়া একাডেমিতে প্রতিভা অন্বেষণ: জেলা পর্যায় থেকে তারকা তৈরির অন্তরায় কোথায়?
ছবি: সংগৃহীত
২০২৩ সালের জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট ৬৮টি জেলা ক্রীড়া সংস্থার মধ্যে মাত্র ২২টি নিয়মিতভাবে স্থানীয় পর্যায়ের ফুট...

২০২৩ সালের জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের মোট ৬৮টি জেলা ক্রীড়া সংস্থার মধ্যে মাত্র ২২টি নিয়মিতভাবে স্থানীয় পর্যায়ের ফুটবল ও ক্রিকেট একাডেমি পরিচালনা করছে, যা মোট জেলা সংখ্যার ৩৩ শতাংশেরও কম। এই ২২টি একাডেমির মধ্যে, গত পাঁচ বছরে পেশাদার লিগে খেলার সুযোগ পাওয়া খেলোয়াড়ের সংখ্যা ৫০ জনেরও নিচে, এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেয়েছেন মাত্র ৭ জন। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টতই ইঙ্গিত দেয় যে, জেলা পর্যায় থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ তৈরির প্রক্রিয়াটি একটি বিশাল প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন। বিশেষত, যখন প্রতিবেশী দেশগুলো স্থানীয় ক্রীড়া অবকাঠামোকে ব্যবহার করে নিয়মিতভাবে তারকা খেলোয়াড় তৈরি করছে, তখন বাংলাদেশের এই সীমাবদ্ধতা গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

এই অন্তরায়গুলোর মূলে রয়েছে সুসংহত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির অভাব এবং প্রয়োজনীয় ভৌত অবকাঠামোগত দুর্বলতা। জেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোর অধীনে যে একাডেমিগুলো পরিচালিত হচ্ছে, সেগুলোর বেশিরভাগেরই নিজস্ব প্রশিক্ষণ মাঠ, জিমনেশিয়াম বা আবাসিক সুবিধা নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রে, স্থানীয় স্কুল বা কলেজের মাঠ ভাড়া করে অনুশীলন করানো হয়, যা প্রশিক্ষণের ধারাবাহিকতায় ব্যাঘাত ঘটায় এবং মানসম্মত প্রশিক্ষণের পরিধি সংকুচিত করে। উপরন্তু, প্রশিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে। অনেক একাডেমিতেই শখের বশে বা স্বল্প পারিশ্রমিকে স্থানীয় প্রাক্তন খেলোয়াড়রা কোচিং করান, যাদের আধুনিক ক্রীড়া বিজ্ঞান, পুষ্টিবিদ্যা, বা মানসিক প্রশিক্ষণের ওপর কোনো প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান নেই। এর ফলে, তরুণ প্রতিভারা শুরুতেই ভুল কৌশল ও দুর্বল শারীরিক প্রস্তুতি নিয়ে বেড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে তাদের পেশাদার ক্যারিয়ারের জন্য মারাত্মক বাধা হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠান (বিকেএসপি) এর মতো কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো গুণগত মান বজায় রাখলেও, জেলা পর্যায় থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রতিভাবান খেলোয়াড় তুলে আনতে না পারার কারণ হলো স্থানীয় একাডেমির এই কাঠামোগত দুর্বলতা।

তহবিল সংকট এবং কেন্দ্রীয় তদারকির অভাবও এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ক্রীড়া উন্নয়নে বাজেট বরাদ্দ করলেও, জেলা পর্যায়ের একাডেমিতে সেই তহবিলের একটি ক্ষুদ্র অংশই পৌঁছায়। World Bank এবং ADB-এর মতো উন্নয়ন সহযোগীরা প্রায়শই বাংলাদেশের সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে সহায়তা প্রদান করে থাকে, তবে ক্রীড়া খাতে তাদের সরাসরি বিনিয়োগের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। যেটুকু বিনিয়োগ হয়, তার বেশিরভাগই জাতীয় পর্যায়ের বৃহৎ প্রকল্পগুলোতে কেন্দ্রীভূত থাকে, জেলা পর্যায়ের তৃণমূল একাডেমির জন্য সুনির্দিষ্ট আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি বিরল। ফলস্বরূপ, একাডেমির পরিচালন ব্যয়, সরঞ্জাম ক্রয়, প্রশিক্ষকদের বেতন এবং খেলোয়াড়দের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো অপূর্ণ থেকে যায়। এ ছাড়া, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের পক্ষ থেকে জেলা পর্যায়ের একাডেমিগুলোর কার্যকারিতা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং প্রশিক্ষণের মান পরিবীক্ষণে সুনির্দিষ্ট কোনো শক্তিশালী কাঠামো নেই। এই তদারকির অভাবে অনেক ক্ষেত্রে তহবিলের অপচয় হয় এবং একাডেমির কার্যক্রমের মূল লক্ষ্য ব্যাহত হয়, যা শেষ পর্যন্ত সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়দের বিকাশে অন্তরায় সৃষ্টি করে।

সূচক ২০১৮ ২০১৯ ২০২০ ২০২১ ২০২২
জেলা পর্যায়ের একাডেমির সংখ্যা ২০ ২২ ২০ ২১ ২২
জাতীয় লিগে সুযোগপ্রাপ্ত খেলোয়াড় ৮ ১১ ৬ ১৩ ১২
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব (পুরুষ) ১ ২ ০ ২ ১
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব (নারী) ০ ০ ০ ১ ০
জেলা পর্যায়ে ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে সরকারি বরাদ্দ (কোটি টাকা) ১০.৫০ ১১.২০ ৯.৮০ ১২.৫০ ১৩.০০

উৎস: যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, বাংলাদেশ ক্রীড়া ফেডারেশন (২০২৩)

সুপারিশ

  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে 'জেলা ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন ও একাডেমি সহায়তা নীতিমালা' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে প্রতিটি জেলার জন্য সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ, আধুনিক প্রশিক্ষণ সুবিধা নির্মাণ এবং প্রশিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নের জন্য নিয়মিত কর্মশালার আয়োজন বাধ্যতামূলক করা হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার, World Bank এবং ADB-এর যৌথ উদ্যোগে একটি 'ক্রীড়া উন্নয়ন তহবিল' গঠন করতে হবে, যা কেবলমাত্র জেলা পর্যায়ের একাডেমিগুলোর আধুনিকীকরণ, বিজ্ঞানভিত্তিক প্রশিক্ষণ উপকরণ সরবরাহ এবং খেলোয়াড়দের পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ব্যবহৃত হবে, এবং এর তদারকি করবে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ।
  • জাতীয় ক্রীড়া পরিষদকে প্রতি বছর প্রতিটি জেলা একাডেমির জন্য কর্মক্ষমতাভিত্তিক মূল্যায়ন (Performance-Based Assessment) চালু করতে হবে, যেখানে একাডেমির কার্যক্রম, খেলোয়াড়দের অগ্রগতি এবং আর্থিক স্বচ্ছতার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী বছরের জন্য অনুদান ও সহায়তা নির্ধারিত হবে, এবং অনিয়ম প্রমাণিত হলে 'জাতীয় ক্রীড়া আইন ২০১৮' অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ঘরোয়া স্পোর্টস অবকাঠামো ও একাডেমি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator