অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি

অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

শাহেদ করিম  avatar   
শাহেদ করিম
অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
অপ্রকাশিত সত্য: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, ২০২২ সালের মার্চ মাসে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের আবহে অনুষ্ঠিত পঞ্চম BIMSTEC শীর্ষ সম্মেলনে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের যে প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছিল, ...

সম্প্রতি, ২০২২ সালের মার্চ মাসে শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকটের আবহে অনুষ্ঠিত পঞ্চম BIMSTEC শীর্ষ সম্মেলনে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারের যে প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছিল, তা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি অনিবার্য বাস্তবতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। যদিও সম্মেলনটি ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত হয় এবং এর ঘোষণাপত্রে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA) দ্রুত বাস্তবায়নের উপর জোর দেওয়া হয়, কিন্তু ভারত-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, পাকিস্তানের সার্ক-কেন্দ্রিকতা এবং অন্যান্য আঞ্চলিক শক্তির অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক চাপ এই অঙ্গীকারের বাস্তবায়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে। বিশেষত, ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং 'বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ' (BRI) এর মাধ্যমে পাকিস্তানের মতো দেশগুলোর সাথে গভীর অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক স্থাপন, এই অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ক্ষমতার ভারসাম্যে এক নতুন মেরুকরণ সৃষ্টি করেছে। এই মেরুকরণ কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন বা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন নয়, বরং এটি সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সার্বভৌমত্ব, কৌশলগত স্বাধীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা পরিকাঠামোকেও প্রভাবিত করছে।

দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতির বর্তমান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঐতিহ্যবাহী আঞ্চলিক জোট সার্ক (SAARC) কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ২০১৬ সালে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিতব্য ১৯তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন ভারতের বয়কটের কারণে স্থগিত হওয়ার পর থেকে এই জোটের কার্যকারিতা তলানিতে ঠেকেছে। এর মূল কারণ হলো ভারত-পাকিস্তান দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের চরম অবনতি, যা আঞ্চলিক ঐকমত্য গঠনে বারবার বাধা সৃষ্টি করছে। সার্কের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং এর সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের সুযোগ, এটিকে কার্যকর আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে ব্যর্থ করে তুলেছে। এর বিপরীতে, ভারত BIMSTEC-কে তার 'লুক ইস্ট' এবং 'অ্যাক্ট ইস্ট' নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হিসেবে দেখছে, যেখানে বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড এবং মিয়ানমার অন্তর্ভুক্ত। এই পরিবর্তন ভূ-রাজনৈতিক কৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি পাকিস্তানের অনুপস্থিতিতে ভারতের আঞ্চলিক নেতৃত্বকে আরও সুসংহত করার সুযোগ করে দিচ্ছে। তবে, BIMSTEC-এর নিজস্ব চ্যালেঞ্জ রয়েছে, যেমন সদস্য দেশগুলোর মধ্যে অসম অর্থনৈতিক ক্ষমতা, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত ভিন্ন ভিন্ন উদ্বেগ। উদাহরণস্বরূপ, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংকট এবং থাইল্যান্ডের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক অগ্রাধিকার BIMSTEC-এর সামগ্রিক এজেন্ডাকে প্রভাবিত করতে পারে, যা মুক্ত বাণিজ্য ও সংযোগ স্থাপনের প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিচ্ছে।

ভূ-রাজনৈতিক শক্তির ভারসাম্যে চীনের উত্থান দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশকে নতুন করে কৌশলগত হিসাব-নিকাশে বাধ্য করছে। চীনের 'ঋণ কূটনীতি' (Debt Diplomacy) এবং BRI-এর অধীনে বিশাল অবকাঠামো প্রকল্প, যেমন শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর বা পাকিস্তানের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (CPEC), এই অঞ্চলের দেশগুলোকে চীনের অর্থনৈতিক কক্ষপথে নিয়ে আসছে। এর ফলে, ঐতিহ্যবাহী আঞ্চলিক ক্ষমতা, যেমন ভারতের প্রভাব, চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যদিও এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক উদ্যোগ গ্রহণ করছে, কিন্তু চীনের অর্থনৈতিক শক্তি এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া অনেক সময়ই ভারতের আঞ্চলিক উদ্যোগকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। UN Peacekeeping মিশনে দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর অংশগ্রহণও ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য বহন করে। বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান এবং ভারত জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বৃহত্তম অবদানকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই অংশগ্রহণ কেবল আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় অবদান রাখে না, বরং এই দেশগুলোকে বৈশ্বিক মঞ্চে একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান প্রদান করে এবং তাদের সামরিক সক্ষমতা ও প্রশিক্ষণকে উন্নত করে। তবে, এই সামরিক সক্ষমতাকে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় কার্যকরভাবে ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আঞ্চলিক আস্থাহীনতা একটি বড় বাধা। বিভিন্ন দেশের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদ, অবৈধ অভিবাসন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের মতো অভিন্ন চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও, আঞ্চলিক সহযোগিতার অভাব ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

প্রতিষ্ঠান/ক্ষেত্র ২০১৫ সালের বাজেট/অর্থায়ন (বিলিয়ন USD) ২০২২ সালের বাজেট/অর্থায়ন (বিলিয়ন USD) পরিবর্তন (%) উল্লেখযোগ্য সিদ্ধান্ত/ঘটনা
BIMSTEC (পরিকাঠামো প্রকল্প) ০.৮ ১.৫ +৮৭.৫% ২০২২ সালের পঞ্চম শীর্ষ সম্মেলনে পরিবহন ও সংযোগ মহাপরিকল্পনার অনুমোদন
সার্ক (আঞ্চলিক প্রকল্প) ০.১ ০.০২ -৮০% ২০১৬ সাল থেকে শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়নি, কার্যকর কার্যক্রম স্থবির
UN Peacekeeping (শীর্ষ ৫ অবদানকারী দেশ) ৬.৭ ৬.৫ -৩% দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর ধারাবাহিক অংশগ্রহণ, তবে বাজেট হ্রাস
চীনের BRI বিনিয়োগ (দক্ষিণ এশিয়ায়) ৫০ ১২০ +১৪০% বিভিন্ন দেশের সাথে দ্বিপাক্ষিক চুক্তি, কৌশলগত অবকাঠামো নির্মাণ

উৎস: UN Peacekeeping Reports, BIMSTEC Secretariat, SAARC Secretariat, Ministry of Foreign Affairs (India, Bangladesh, Pakistan), China's National Development and Reform Commission.

সুপারিশ

  • সার্কের স্থবিরতা কাটিয়ে উঠতে, সদস্য দেশগুলোকে সার্ক সনদ (SAARC Charter) সংশোধন করে 'কোর গ্রুপ' (Core Group) গঠনের সুযোগ তৈরি করা উচিত, যেখানে ভারত ও পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক বিরোধ আঞ্চলিক সহযোগিতাকে আটকে না রাখতে পারে। এক্ষেত্রে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি ত্রিপাক্ষিক বা চতুর্দেশীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিতে হবে, যা আঞ্চলিক বাণিজ্য, যোগাযোগ ও পরিবেশ সুরক্ষার মতো অভিন্ন স্বার্থের বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেবে, এমনকি যদি কিছু সদস্য দেশ রাজনৈতিক কারণে সরাসরি অংশ নিতে না পারে।
  • BIMSTEC-এর পূর্ণাঙ্গ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে, সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে BIMSTEC মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (BIMSTEC FTA) দ্রুত বাস্তবায়নে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে এবং প্রতি বছর অন্তত একবার বাণিজ্য মন্ত্রীদের সম্মেলন আয়োজন করতে হবে। এই রোডম্যাপে ২০২৫ সালের মধ্যে শুল্ক বাধা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো এবং ২০৩০ সালের মধ্যে অশুল্ক বাধা অপসারণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা যেতে পারে, যা আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংহতিকে ত্বরান্বিত করবে।
  • দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবেলায়, আঞ্চলিক দেশগুলোকে UN Peacekeeping মিশনে তাদের অভিজ্ঞতা ও সক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা ফোরাম গঠন করতে হবে। এই ফোরাম, যা 'দক্ষিণ এশীয় নিরাপত্তা সংলাপ' (South Asian Security Dialogue) নামে পরিচিত হতে পারে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অভিন্ন নীতি ও কৌশল প্রণয়নে কাজ করবে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হবে, যেখানে নিয়মিতভাবে আঞ্চলিক সামরিক ও নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শাহেদ করিম

শাহেদ করিম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: দক্ষিণ এশীয় ভূ-রাজনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nema komentara


News Card Generator