সম্প্রতি, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন-২০২২ অনুসারে, দেশের পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ বিগত পাঁচ বছরে সামগ্রিকভাবে বৃদ্ধি পেলেও, শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় সংযোগের মাধ্যমে উদ্ভাবনকে বাণিজ্যিকীকরণের হার এখনও আশানুরূপ নয়। যদিও গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যা বেড়েছে, অধিকাংশ উদ্ভাবন পরীক্ষাগারের গণ্ডি পেরিয়ে শিল্পক্ষেত্রে প্রয়োগের স্তরে পৌঁছাতে পারছে না, যা দেশের R&D খাতের সুপ্ত শক্তিকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে ব্যর্থ হচ্ছে। এই অসামঞ্জস্যতা কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকেই বাধাগ্রস্ত করছে না, বরং উচ্চশিক্ষার মূল লক্ষ্য – জ্ঞান সৃষ্টি ও সমাজের কল্যাণে তার প্রয়োগ – পূরণেও চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। শিল্প ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে বিদ্যমান এই ব্যবধান নিরসনে একটি সুসংহত এবং কার্যকর কৌশল প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো, জ্ঞান সৃষ্টি ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে, এই জ্ঞানকে বাস্তবে রূপান্তর করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু কাঠামোগত ও নীতিগত প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SEIP)-এর যৌথ উদ্যোগে দক্ষতা উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও, বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণালব্ধ ফলাফলকে সরাসরি শিল্পে প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় ইন্টারফেস বা প্ল্যাটফর্মের অভাব প্রকট। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের প্রায়শই শিল্প খাতের চাহিদা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকে না, আবার শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সক্ষমতা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। এই তথ্যের আদান-প্রদানের অভাব এবং পারস্পরিক যোগাযোগের দুর্বলতা উদ্ভাবনকে কেবল একাডেমিক প্রকাশনার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে। অনেক সময় গবেষণা প্রকল্পগুলো মূলত অনুদান-নির্ভর হয় এবং বাজারের চাহিদা বা শিল্প সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে তাত্ত্বিক জ্ঞান বৃদ্ধিতেই বেশি মনোযোগ দেয়। এর ফলে, উদ্ভাবনগুলো বাণিজ্যিকভাবে টেকসই হয় না বা শিল্পে প্রয়োগের জন্য পর্যাপ্ত পরিপক্কতা অর্জন করে না। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) দক্ষতা উন্নয়নে একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরির চেষ্টা করলেও, উচ্চশিক্ষার R&D আউটপুটকে শিল্পোৎপাদনের সাথে যুক্ত করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট কৌশলগত রোডম্যাপ এখনও অনুপস্থিত।
গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগের পরিমাণ বাড়লেও, এর গুণগত মান ও শিল্পে প্রয়োগের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS)-এর তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু এই বরাদ্দের একটি বড় অংশ মৌলিক গবেষণায় ব্যয় হয়, যা তাৎক্ষণিক শিল্প প্রয়োগের জন্য উপযুক্ত নয়। উন্নত দেশগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাদের গবেষণার মাধ্যমে পেটেন্ট ও লাইসেন্সিং থেকে উল্লেখযোগ্য আয় করে থাকে, যা তাদের R&D ইকোসিস্টেমকে আরও শক্তিশালী করে। কিন্তু বাংলাদেশে, পেটেন্ট আবেদন এবং সফল বাণিজ্যিকীকরণের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। এর একটি কারণ হলো, গবেষণার শুরুতেই শিল্প অংশীদারদের সাথে সংযোগ স্থাপন না করা। যখন কোনো গবেষণার নকশা তৈরি হয়, তখন যদি শিল্প প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা তাদের বাস্তব সমস্যা ও চাহিদা নিয়ে যুক্ত হন, তবে গবেষণার ফলাফল আরও বেশি প্রাসঙ্গিক ও প্রয়োগযোগ্য হতে পারে। উপরন্তু, গবেষণার বাণিজ্যিকীকরণের জন্য প্রয়োজনীয় আইনি কাঠামো, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির সুরক্ষা এবং প্রযুক্তির স্থানান্তর প্রক্রিয়া এখনো দুর্বল। বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ল্যাব ও অবকাঠামোর আধুনিকীকরণ প্রয়োজন, যাতে শিল্প-স্তরের প্রোটোটাইপ তৈরি করা সম্ভব হয়। গবেষকদের জন্য বাণিজ্যিকীকরণ প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রশিক্ষণের অভাবও একটি বড় বাধা।
| সূচক | ২০১৮-১৯ | ২০১৯-২০ | ২০২০-২১ | ২০২১-২২ | ২০২২-২৩ |
|---|---|---|---|---|---|
| ইউজিসি কর্তৃক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহে গবেষণা অনুদান (কোটি টাকা) | ৬২.৫ | ৬৫.৩ | ৭৫.৮ | ৮২.১ | ৮৮.৯ |
| বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভাবিত পেটেন্ট আবেদন (সংখ্যা) | ৭ | ৯ | ১১ | ১২ | ১৪ |
| শিল্পে স্থানান্তরিত প্রযুক্তি/উদ্ভাবন (সংখ্যা) | ১ | ২ | ২ | ৩ | ৪ |
| বিশ্ববিদ্যালয়-শিল্প যৌথ গবেষণা প্রকল্প (সংখ্যা) | ১৫ | ১৮ | ২২ | ২৬ | ২৯ |
| শিক্ষকদের গবেষণা প্রকাশনা (ওয়েব অফ সায়েন্স/স্কোপাস ইনডেক্সড) | ১২৮০ | ১৫৩০ | ১৭৫০ | ১৯২০ | ২১৫০ |
উৎস: ইউজিসি বার্ষিক প্রতিবেদন, বাংলাদেশ পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তর (DPDT) এবং BANBEIS থেকে সংগৃহীত।
সুপারিশ
- জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-এর সমন্বয়ে একটি 'উদ্ভাবন বাণিজ্যিকীকরণ ও প্রযুক্তি স্থানান্তর নীতি' প্রণয়ন করা, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে শিল্প চাহিদার সাথে সংযুক্ত করবে এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
- স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SEIP)-এর আওতায় উচ্চশিক্ষার গবেষকদের জন্য 'ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইনোভেশন ফেলোশিপ' ও 'টেকনোলজি কমার্শিয়ালাইজেশন ট্রেনিং' প্রোগ্রাম চালু করা, যেখানে শিল্প বিশেষজ্ঞরা মেন্টর হিসেবে কাজ করবেন এবং গবেষণার প্রোটোটাইপিং ও বাজারজাতকরণে সহায়তা করবেন।
- বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (UGC) এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে প্রতিটি পাবলিক ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি 'শিল্প-যোগাযোগ ও উদ্ভাবন সেল' (Industry Liaison & Innovation Cell) প্রতিষ্ঠা করা, যার প্রধান কাজ হবে শিল্প খাতের সমস্যা চিহ্নিত করা, গবেষণার জন্য তহবিল সংগ্রহ করা এবং উদ্ভাবিত প্রযুক্তি লাইসেন্সিং ও স্টার্টআপ গঠনে সহায়তা করা।