ডিজিটাল স্বপ্নভঙ্গ: স্মার্ট বাংলাদেশ প্রকল্পে দুর্নীতি ও ডেটা সুরক্ষার সংকট | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ডিজিটাল স্বপ্নভঙ্গ: স্মার্ট বাংলাদেশ প্রকল্পে দুর্নীতি ও ডেটা সুরক্ষার সংকট

সাদমান সাকিব  avatar   
সাদমান সাকিব
ডিজিটাল স্বপ্নভঙ্গ: স্মার্ট বাংলাদেশ প্রকল্পে দুর্নীতি ও ডেটা সুরক্ষার সংকট
ডিজিটাল স্বপ্নভঙ্গ: স্মার্ট বাংলাদেশ প্রকল্পে দুর্নীতি ও ডেটা সুরক্ষার সংকট
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রগতির স্বপ্ন 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বিনির্মাণের পথে হাঁটছে, কিন্তু এই যাত্রাপথে ডেটা সুরক্ষা ও সুশাসনের চ্যালেঞ্জগুলো প্রকটভাবে সামনে আসছে।...

বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রগতির স্বপ্ন 'স্মার্ট বাংলাদেশ' বিনির্মাণের পথে হাঁটছে, কিন্তু এই যাত্রাপথে ডেটা সুরক্ষা ও সুশাসনের চ্যালেঞ্জগুলো প্রকটভাবে সামনে আসছে। একদিকে যেমন নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের ব্যাপক ফাঁস জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে স্মার্ট সিটি প্রকল্পগুলোতে দুর্নীতির অভিযোগ ডিজিটাল স্বপ্নকে ম্লান করে দিচ্ছে। 'আই নিউজ বিডি'-র অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই খাতের সাম্প্রতিক অনিয়ম ও কাঠামোগত দুর্বলতার এক ভয়াবহ চিত্র।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের ডেটা সুরক্ষার দুর্বলতা একাধিকবার উন্মোচিত হয়েছে। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে একটি সরকারি ওয়েবসাইট থেকে লাখ লাখ বাংলাদেশি নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য, যার মধ্যে নাম, ফোন নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা এবং জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) নম্বরও ছিল, ফাঁস হওয়ার ঘটনা আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা গবেষকদের নজরে আসে। বিটক্র্যাক সাইবার সিকিউরিটির গবেষক ভিক্টর মারকোপাওলোস এই তথ্য ফাঁসের দাবি করেন, যা পরবর্তীতে টেকক্রাঞ্চ দ্বারা যাচাই করা হয়। বাংলাদেশ সরকারের কম্পিউটার ইন্সিডেন্ট রেসপন্স টিম (বিজিডি ই-গভ সার্ট) বিষয়টি নিয়ে কাজ করার কথা জানালেও, এই ঘটনা নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে। এর রেশ কাটতে না কাটতেই, ২০২৪ সালের মে মাসে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য এবং মোবাইল ফোনের কল ডেটা রেকর্ড (সিডিআর) চুরি ও অনলাইনে বিক্রির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের আইডি ব্যবহার করে এই তথ্য পাচার করা হয়েছে বলে গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়। একই বছরের অক্টোবরে, এনআইডি তথ্য ফাঁসের ঘটনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ইউসিবি ব্যাংকের উপায়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের আইবাস-সহ পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে শোকজ করা হয়। নির্বাচন কমিশন তাদের এনআইডি সার্ভার সুরক্ষিত দাবি করলেও, চুক্তিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে তথ্য ফাঁস হওয়ার সম্ভাবনার কথা স্বীকার করে। এই ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা এখনও অনেকটাই দুর্বল এবং সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলো যথাযথ সাইবার নিরাপত্তা প্রোটোকল মেনে চলতে ব্যর্থ হচ্ছে, যার ফলস্বরূপ ডেটা ফাঁস, হ্যাকিং এবং আর্থিক জালিয়াতির ঘটনা ঘটছে।

ডেটা সুরক্ষা এবং সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকার একাধিক আইন প্রণয়ন করেছে, যা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন (ডিএসএ) ২০১৮ থেকে শুরু করে সাইবার নিরাপত্তা আইন (সিএসএ) ২০২৩ এবং সর্বশেষ সাইবার সুরক্ষা আইন (সিপিএ) ২০২৬ পর্যন্ত বিস্তৃত। তবে এই আইনগুলো বারবার সমালোচিত হয়েছে এর অপব্যবহার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের কারণে। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক নিজেও ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের কিছু অপব্যবহারের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। যদিও সাইবার নিরাপত্তা আইন ২০২৩-এ কিছু শাস্তির পরিমাণ কমানো এবং কিছু ধারা জামিনযোগ্য করা হয়েছিল, তবুও এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ২০২৬ সালের সাইবার সুরক্ষা আইনে গুজব, অপতথ্য, মানহানি ও হেয়প্রতিপন্ন করার মতো বিষয়গুলোকে অপরাধের সংজ্ঞায় এনে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে, যা অনলাইন স্বাধীনতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা। এর পাশাপাশি, ২০২৫ সালের ৬ নভেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ, যা পরবর্তীতে ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন (পিডিএসএ) হিসেবে পরিচিতি লাভ করে, ব্যক্তিগত ডেটার গোপনীয়তা ও সুরক্ষাকে একটি অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এই আইনে জাতীয় ডেটা গভর্নেন্স অথরিটি (এনডিজিএ) প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে এবং অনুমোদন ছাড়া ডেটা সংগ্রহ বা ব্যবহারের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। তবে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও টিআইবি-র মতো মানবাধিকার সংস্থাগুলো পূর্ববর্তী খসড়া আইনগুলো নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিল যে, এই আইনগুলো নাগরিকদের গোপনীয়তার অধিকারকে খর্ব করতে পারে এবং কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহিতা থেকে দায়মুক্তি দিতে পারে।

স্মার্ট সিটি এবং স্মার্ট বাংলাদেশ প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়নেও বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা মো. নাহিদ ইসলাম ২০২৪ সালের আগস্টে জানান যে, ডিজিটাল ও স্মার্ট বাংলাদেশ নিয়ে বিভিন্ন দুর্নীতি ও অনিয়মের তদন্ত চলছে এবং এসব প্রকল্পে বিনিয়োগ করা অর্থের সুফল জনগণ পুরোপুরি পায়নি। আইসিটি খাতকে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে 'স্মার্ট বাংলাদেশ' নির্মাণে প্রায় ২৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হলেও ভয়াবহ লুটপাটের চিত্র উঠে এসেছে একটি অভ্যন্তরীণ তদন্তে। অভিযোগ রয়েছে যে, প্রকল্পের নামে বিপুল অর্থ লোপাট করা হয়েছে এবং প্রকল্পগুলো প্রায়শই ঘনিষ্ঠজনদের কাজ দিতে বা প্রশ্নহীনভাবে অনুমোদন করাতে ব্যবহৃত হয়েছে, এমনকি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নাম ব্যবহার করে ১১টি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল। এই প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব, অপর্যাপ্ত অবকাঠামো এবং দুর্বল ইন্টারনেট সংযোগ স্মার্ট সিটি বাস্তবায়নের পথে বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) সহযোগিতায় নগর সুশাসন উন্নত করা এবং নাগরিকদের স্মার্ট পরিষেবা প্রদানের জন্য একটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। তবে, এই প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষজন কতটা উপকৃত হবে, সে বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে, কারণ 'স্মার্ট সিটি' এবং 'স্মার্ট বাংলাদেশ' ধারণাগুলো দরিদ্রদের জন্য নাও হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন।

স্মার্ট বাংলাদেশের পথে এগিয়ে যেতে হলে ডিজিটাল বিভাজন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইন্টারনেট অ্যাক্সেস সম্প্রসারণে অগ্রগতি হলেও, গ্রামীণ এলাকায় এখনও সীমিত সংযোগ এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব বিদ্যমান। এটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন যে, স্মার্ট সিটি উদ্যোগগুলো কেবল প্রযুক্তিনির্ভর বিলাসিতা না হয়ে সমাজের সকল স্তরের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক হয়। ডেটা সেন্টারগুলোর দ্রুত প্রসার, যেমন গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটিতে, স্মার্ট বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য হলেও, এদের বিপুল বিদ্যুৎ ও জলের চাহিদা এবং কার্বন ফুটপ্রিন্ট পরিবেশের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে, যা টেকসই উন্নয়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয়। নাগরিকদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং সাইবার আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা আইন এবং সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা স্থাপন করা অপরিহার্য। ডেটা ব্যবহারের স্বচ্ছতা এবং কঠোর প্রবিধান জনগণের আস্থা বজায় রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সুপারিশ: বাংলাদেশের স্মার্ট সিটি ও ডেটা প্রাইভেসি খাতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য অবিলম্বে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা কমিশন গঠন করা উচিত, যা ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন ২০২৫-কে কার্যকরভাবে প্রয়োগ করবে এবং সকল ডেটা ফাঁস ও অপব্যবহারের ঘটনায় দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করবে। একই সাথে, স্মার্ট সিটি প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা, অনুমোদন এবং বাস্তবায়নে ওপেন বিডিং, তৃতীয় পক্ষের নিরীক্ষা এবং নাগরিক সমাজের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে দুর্নীতির সুযোগ বন্ধ হয় এবং প্রকল্পের সুফল সমাজের সকল স্তরের মানুষের কাছে পৌঁছায়। এছাড়া, ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধি এবং সাইবার নিরাপত্তা সচেতনতা বাড়ানোর জন্য দেশব্যাপী ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা উচিত, বিশেষ করে গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য।


🔎 অনুসন্ধানে: সাদমান সাকিব

সাদমান সাকিব, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: স্মার্ট সিটি ও ডেটা প্রাইভেসি।

Geen reacties gevonden


News Card Generator