জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত আঘাত: নীরব মহামারী ও আমাদের প্রস্তুতি | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত আঘাত: নীরব মহামারী ও আমাদের প্রস্তুতি

ডা. আসিফ মাহমুদ  avatar   
ডা. আসিফ মাহমুদ
জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত আঘাত: নীরব মহামারী ও আমাদের প্রস্তুতি
জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত আঘাত: নীরব মহামারী ও আমাদের প্রস্তুতি
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে দেশে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর এবং ডায়রিয়ার মতো জলবায়ু সংবেদ...

সম্প্রতি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে দেশে ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া, কালাজ্বর এবং ডায়রিয়ার মতো জলবায়ু সংবেদনশীল রোগের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সরাসরি তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের মতো জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সাথে সম্পর্কিত। বিশেষ করে, ২০২৪ সালের প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বিগত বছরগুলোর একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩০% বেশি ছিল, যা জনস্বাস্থ্য খাতে একটি নীরব মহামারীর অশনি সংকেত দিচ্ছে। এই বৃদ্ধি কেবল শহর অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং উপকূলীয় ও হাওর অঞ্চলের মতো ভৌগোলিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতেও পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে, যা আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।

এই নীরব মহামারী কেবল সংক্রামক ব্যাধিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও জলবায়ু পরিবর্তনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে। ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ICCCAD) এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যেমন ঘূর্ণিঝড় ও বন্যা, মানুষের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারের (PTSD) মতো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বাড়িয়ে তুলছে। বিশেষ করে, জলবায়ু উদ্বাস্তুরা, যারা তাদের বাসস্থান ও জীবিকা হারিয়েছে, তাদের মধ্যে মানসিক রোগের হার সাধারণ জনগণের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। MOHFW এর অধীনে NIMH এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সীমিত সক্ষমতা নিয়ে কাজ করছে, কিন্তু ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় জনবল ও সংস্থান উভয়ই অপ্রতুল। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় একটি সমন্বিত ও বহু-খাতভিত্তিক কৌশল অপরিহার্য, যা কেবল শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যকেও অন্তর্ভুক্ত করবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত আঘাত মোকাবিলায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। সংক্রামক রোগের চিকিৎসায় প্রয়োজনীয় ঔষধের সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং নতুন রোগের প্রাদুর্ভাবের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষেধক ও চিকিৎসা সামগ্রীর দ্রুত অনুমোদন ও বিতরণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উদাহরণস্বরূপ, ডেঙ্গুর চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্যালাইন ও অন্যান্য সহায়ক ঔষধের চাহিদা আকস্মিকভাবে বৃদ্ধি পেলে সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া, IEDCR (Institute of Epidemiology, Disease Control and Research) এর তথ্য অনুযায়ী, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে কিছু প্রচলিত রোগের চিকিৎসায় জটিলতা বাড়ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট নতুন ভেক্টর-বাহিত রোগের চিকিৎসাকে আরও কঠিন করে তুলছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে নতুন ভৌগোলিক অঞ্চলে রোগের বিস্তার ঘটছে, যার জন্য নতুন ঔষধ ও চিকিৎসা পদ্ধতির গবেষণা ও উন্নয়ন প্রয়োজন, যা DGDA-কে একটি সক্রিয় ভূমিকা পালনের জন্য চাপ সৃষ্টি করছে।

রোগের নাম ২০২০ (আক্রান্তের সংখ্যা) ২০২১ (আক্রান্তের সংখ্যা) ২০২২ (আক্রান্তের সংখ্যা) ২০২৩ (আক্রান্তের সংখ্যা) ২০২৪ (জানুয়ারি-জুন, আক্রান্তের সংখ্যা)
ডেঙ্গু ১,৪০৫ ২৮,৩৪৩ ৬২,৩৮২ ৩,২১,১৭৯ ১,০৫,০০০
ডায়রিয়া ১,২০,০০০ ১,৪৫,০০০ ১,৭০,০০০ ২,১০,০০০ ১,২০,০০০
ম্যালেরিয়া ৯,৭৫৬ ৮,৪২০ ৭,৯৮০ ৭,১০০ ৩,৫০০
কালাজ্বর ৬০০ ৫৫০ ৫২০ ৪৫০ ২২০

উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা (CDC) এর বার্ষিক প্রতিবেদন ও মাসিক বুলেটিন।

সুপারিশ

  • রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা (CDC), DGHS এর অধীনে একটি 'জলবায়ু স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ ও প্রতিক্রিয়া ইউনিট' প্রতিষ্ঠা করা হোক, যা জলবায়ু সংবেদনশীল রোগের প্রাদুর্ভাবের পূর্বাভাস, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং জরুরি প্রতিক্রিয়ার জন্য একটি ডিজিটাল ডেটাবেস এবং অ্যালার্ট সিস্টেম (যেমন, EWARS-এর মতো) তৈরি ও পরিচালনা করবে। এটি জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (National Disaster Management Plan) এর সাথে সমন্বিতভাবে কাজ করবে।
  • জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH), MOHFW এর অধীনে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা মোকাবেলায় একটি বিশেষায়িত 'জলবায়ু মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কর্মসূচি' চালু করা হোক। এই কর্মসূচির আওতায় উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ এলাকায় মোবাইল মানসিক স্বাস্থ্য দল পাঠানো এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ফার্স্ট এইড প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হবে, যা জাতীয় স্বাস্থ্য নীতি (National Health Policy) এর আলোকে পরিচালিত হবে।
  • ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এবং IEDCR এর যৌথ উদ্যোগে একটি 'জলবায়ু সংবেদনশীল ঔষধ ও প্রতিষেধক গবেষণা ও উন্নয়ন তহবিল' গঠন করা হোক। এই তহবিল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নতুন করে আবির্ভূত বা পরিবর্তিত রোগের জন্য প্রয়োজনীয় ঔষধ, টিকা এবং ডায়াগনস্টিক কিট গবেষণায় সহায়তা করবে এবং স্থানীয় ঔষধ উৎপাদনকারীদের জন্য দ্রুত অনুমোদন প্রক্রিয়া (Fast Track Approval Process) চালু করবে, যা ঔষধ নীতি (Drug Policy) এর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. আসিফ মাহমুদ

ডা. আসিফ মাহমুদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জনস্বাস্থ্য ও মহামারী প্রতিরোধ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator