২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসের তথ্য অনুযায়ী, বিগত পাঁচ বছরে দেশের সঙ্গীতশিল্পে রয়্যালটি আদায়ের পরিমাণ প্রায় ১২০% বৃদ্ধি পেলেও, তা বৈশ্বিক গড় রয়্যালটি আদায়ের মাত্র ১৫%। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি ইঙ্গিত দেয় যে, বাংলাদেশের সঙ্গীতশিল্পে রয়্যালটি অধিকারের সুপ্ত সম্ভাবনা এখনো অনেকটাই অনাবিষ্কৃত। অথচ, প্রতিবেশী দেশ ভারতে গত দশকে স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম ও ডিজিটাল ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেল থেকে রয়্যালটি আদায় প্রায় ৪৫০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা তাদের সঙ্গীতশিল্পের প্রবৃদ্ধিতে এক বিশাল অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। এই তুলনামূলক চিত্রটি আমাদের স্থানীয় সঙ্গীতবাজারের দুর্বল রয়্যালটি কাঠামো এবং এর ফলস্বরূপ সৃষ্ট আর্থিক বৈষম্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে, যেখানে শিল্পী ও স্রষ্টারা প্রায়শই তাদের মেধার ন্যায্য প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
বাংলাদেশের সঙ্গীতশিল্পে রয়্যালটি অধিকারের মূল চ্যালেঞ্জগুলি বহুমাত্রিক, যার মধ্যে রয়েছে কার্যকর আইন প্রয়োগের অভাব, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলির দায়বদ্ধতা নিশ্চিতকরণে দুর্বলতা এবং শিল্পীদের মধ্যে কপিরাইট সংক্রান্ত সচেতনতার অভাব। মাঠ পর্যায়ের গবেষণায় দেখা গেছে, বহু ছোট এবং মাঝারি আকারের প্রযোজনা সংস্থা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলির সাথে তাদের চুক্তিতে রয়্যালটি বিতরণের বিষয়ে স্পষ্ট শর্তাবলী অন্তর্ভুক্ত করতে ব্যর্থ হয়, যার ফলে শিল্পীরা প্রায়শই তাদের কাজের প্রকৃত ব্যবহার এবং আয় সম্পর্কে অন্ধকারে থাকেন। উদাহরণস্বরূপ, একটি জনপ্রিয় স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে একটি গান লক্ষাধিক বার শোনা হলেও, শিল্পীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে যে অর্থ জমা হয়, তা অধিকাংশ সময়েই প্রত্যাশার তুলনায় অপ্রতুল। এর অন্যতম কারণ হলো, বহু ক্ষেত্রে রয়্যালটি সংগ্রহকারী এজেন্সি বা স্বয়ং প্ল্যাটফর্মগুলি একটি অস্বচ্ছ রয়্যালটি বন্টন মডেল অনুসরণ করে, যেখানে প্রযোজনা ব্যয়, প্রচারণার খরচ এবং প্রশাসনিক ফি-এর নামে একটি বড় অংশ কেটে নেওয়া হয়। উপরন্তু, কপিরাইট আইন ২০০৫ (সংশোধিত ২০১০) এবং এর অধীন প্রণীত বিধিমালা থাকা সত্ত্বেও, এই আইনগুলির প্রয়োগে দীর্ঘসূত্রিতা এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার জটিলতা শিল্পীদের আইনি প্রতিকার চাইতে নিরুৎসাহিত করে। ফলস্বরূপ, একটি শক্তিশালী আইনি কাঠামো থাকা সত্ত্বেও, এর কার্যকারিতা প্রশ্নবিদ্ধ থেকে যায়, যা পুরো সঙ্গীত ইকোসিস্টেমের আর্থিক সুস্থতার জন্য হুমকিস্বরূপ।
ডিজিটাল রূপান্তর বাংলাদেশের সঙ্গীতশিল্পে নতুন সুযোগের পাশাপাশি নতুন চ্যালেঞ্জও নিয়ে এসেছে। অনলাইন স্ট্রিমিং, সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এবং ব্যবহারকারী-সৃষ্ট কন্টেন্ট (UGC) সাইটগুলির মাধ্যমে সঙ্গীত এখন বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে। কিন্তু এই বিস্তারের সাথে তাল মিলিয়ে রয়্যালটি আদায় প্রক্রিয়া আধুনিকীকরণ হয়নি। World Bank-এর 'ডিজিটাল ইকোনমি ফর ডেভেলপমেন্ট' (DE4D) প্রকল্পের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলিতে ডিজিটাল কন্টেন্ট থেকে রয়্যালটি আদায়ের ক্ষেত্রে ব্লকচেইন প্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-ভিত্তিক ট্র্যাকিং সিস্টেমগুলি একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর সমাধান দিতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশে এই ধরনের প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ এবং অবকাঠামো এখনো অপ্রতুল। অনেক শিল্পী ও গীতিকার অভিযোগ করেন যে, তাদের গান ইউটিউব, ফেসবুক বা অন্যান্য ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্মে অননুমোদিতভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, কিন্তু তাদের পক্ষে স্বতন্ত্রভাবে এই অননুমোদিত ব্যবহার ট্র্যাক করা এবং আইনি পদক্ষেপ নেওয়া প্রায় অসম্ভব। বাংলাদেশ সরকার যদিও তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করছে, তবে কপিরাইট সুরক্ষায় নির্দিষ্টভাবে সঙ্গীতশিল্পের জন্য একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বা এজেন্সি এখনো গড়ে ওঠেনি। এর ফলে, স্ট্রিমিং থেকে প্রাপ্ত রয়্যালটি, সিঙ্ক্রোনাইজেশন রয়্যালটি (ভিডিও বা বিজ্ঞাপনে গান ব্যবহার) এবং পারফর্মিং রয়্যালটি (লাইভ পারফরম্যান্স) – প্রতিটি ক্ষেত্রেই অস্বচ্ছতা ও অনিয়ম একটি সাধারণ চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা শিল্পীদের আর্থিক নিরাপত্তা এবং সৃজনশীলতার পরিবেশকে ব্যাহত করছে।
| বছর | মোট রয়্যালটি আদায় (কোটি টাকা) | ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে আদায় (কোটি টাকা) | মোট সঙ্গীতবাজারের অংশ (%) | রয়্যালটি আদায়ে প্রবৃদ্ধি (%) |
|---|---|---|---|---|
| ২০১৯ | ৫.২ | ১.৫ | ৮.৫ | - |
| ২০২০ | ৬.৮ | ২.৮ | ১০.২ | ৩১.৭ |
| ২০২১ | ৯.৫ | ৪.৫ | ১২.৫ | ৩৯.৭ |
| ২০২২ | ১৪.৮ | ৮.২ | ১৫.৮ | ৫৫.৮ |
| ২০২৩ | ১৮.৫ | ১১.২ | ১৭.১ | ২৫.০ |
উৎস: বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস ও স্থানীয় সঙ্গীত প্রযোজনা সংস্থাগুলির সম্মিলিত বার্ষিক প্রতিবেদন, ২০২৩।
সুপারিশ
- সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে বাংলাদেশ কপিরাইট অফিস এবং বাংলাদেশ কপিরাইট বোর্ডকে শক্তিশালী করার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ করতে হবে, যেখানে কপিরাইট ট্র্যাকিংয়ের জন্য অত্যাধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি (যেমন – ব্লকচেইন-ভিত্তিক রয়্যালটি ব্যবস্থাপনা সিস্টেম) এবং প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগের ব্যবস্থা থাকবে, যা কপিরাইট আইন ২০০৫ (সংশোধিত ২০১০) এর কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করবে।
- তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ এবং বাংলাদেশ সরকার যৌথভাবে একটি 'জাতীয় রয়্যালটি সংগ্রহ ও বিতরণ প্ল্যাটফর্ম' (National Royalty Collection & Distribution Platform) প্রতিষ্ঠা করতে পারে, যা World Bank এবং ADB-এর ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়ন সহায়তার আওতায় নির্মিত হতে পারে, যাতে সমস্ত ডিজিটাল স্ট্রিমিং এবং কন্টেন্ট প্ল্যাটফর্ম থেকে রয়্যালটি আদায় এবং শিল্পীদের কাছে স্বচ্ছভাবে বিতরণের একটি কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
- বাংলাদেশ কপিরাইট অফিসকে (বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে) সঙ্গীতশিল্পীদের জন্য কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সহজ এবং ডিজিটাল করতে হবে এবং নিয়মিতভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলির সাথে ত্রিপাক্ষিক চুক্তি (শিল্পী-প্রযোজক-প্ল্যাটফর্ম) সম্পাদনের জন্য একটি প্রমিত গাইডলাইন প্রকাশ করতে হবে, যা কপিরাইট আইন ২০০৫ এর ধারা ৫১ অনুযায়ী চুক্তির স্বচ্ছতা ও রয়্যালটি বন্টনের ন্যায্য অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করবে।