নির্বাচনী অর্থায়ন ও স্বচ্ছতার চ্যালেঞ্জ: কালো টাকার প্রভাব ও প্রতিকার | আই নিউজ বিডি

নির্বাচনী অর্থায়ন ও স্বচ্ছতার চ্যালেঞ্জ: কালো টাকার প্রভাব ও প্রতিকার

ড. তৌফিক এলাহী  avatar   
ড. তৌফিক এলাহী
নির্বাচনী অর্থায়ন ও স্বচ্ছতার চ্যালেঞ্জ: কালো টাকার প্রভাব ও প্রতিকার
নির্বাচনী অর্থায়ন ও স্বচ্ছতার চ্যালেঞ্জ: কালো টাকার প্রভাব ও প্রতিকার
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রকাশিত সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনের ব্যয় বিবরণী ও প্রার্থীর হলফনামা বিশ্লেষণের পর বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের (ইসি) প্রকাশিত সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচনের ব্যয় বিবরণী ও প্রার্থীর হলফনামা বিশ্লেষণের পর বিশেষজ্ঞদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে নির্বাচনী অর্থায়নে স্বচ্ছতার ঘাটতি নিয়ে। বিশেষ করে, প্রার্থীর ঘোষিত আয়ের উৎস এবং নির্বাচনী ব্যয়ের মধ্যে দৃশ্যমান অসামঞ্জস্যতা কালো টাকার প্রভাবের পুরনো বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে। গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী ও পরাজিত প্রার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের ব্যয়ের সঙ্গে তাদের ঘোষিত আয়ের সঙ্গতিহীনতা, এবং নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যবহৃত অর্থের উৎস নিয়ে স্পষ্টতার অভাব, দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় জনআস্থার সংকট তৈরি করছে। এই পরিস্থিতি কেবল আর্থিক স্বচ্ছতার অভাবই নয়, বরং রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অনৈতিক প্রভাব বিস্তারেরও ইঙ্গিত দেয়, যা সুস্থ গণতন্ত্রের জন্য এক অশনি সংকেত।

নির্বাচনী অর্থায়নে কালো টাকার প্রভাব বহুলাংশে নির্বাচনী প্রচারণার অনিয়ন্ত্রিত ব্যয় এবং অনুদান প্রক্রিয়ার অস্বচ্ছতার কারণে ঘটে। প্রার্থীরা প্রায়শই তাদের প্রকৃত নির্বাচনী ব্যয়ের একটি অংশ গোপন করেন, এবং এই গোপনীয়তার আড়ালে অবৈধ অর্থ বা ঘোষিত আয়ের বাইরের অর্থ প্রবেশ করে। World Bank এর ২০১৮ সালের এক গবেষণায় (Governance and Anti-Corruption in South Asia) উল্লেখ করা হয়েছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণ আইন থাকা সত্ত্বেও, প্রায়শই প্রার্থীরা নির্ধারিত সীমার চেয়ে অনেক বেশি ব্যয় করেন, যার সিংহভাগই আসে অপ্রদর্শিত উৎস থেকে। এই অপ্রদর্শিত অর্থ স্থানীয় ব্যবসা, ঠিকাদারি এবং এমনকি আন্তর্জাতিক উৎস থেকেও আসতে পারে, যা পরবর্তীতে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করে। এর ফলে, যোগ্য ও জনবান্ধব প্রার্থীর পরিবর্তে বিত্তশালী ও প্রভাবশালী প্রার্থীরাই নির্বাচনে সুবিধা পেয়ে থাকেন, যা সাধারণ জনগণের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ সীমিত করে দেয়।

এই অস্বচ্ছ নির্বাচনী অর্থায়ন কেবল রাজনৈতিক সততাকেই ক্ষুণ্ন করে না, বরং দেশের সামগ্রিক সুশাসন কাঠামোর উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নির্বাচনী ব্যয় নিয়ন্ত্রণের জন্য নির্দিষ্ট বিধিমালা থাকলেও, সেগুলোর বাস্তবায়ন এবং তদারকির ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়েছে। ADB এর 'Strengthening Governance and Anti-Corruption in Asia and the Pacific' শীর্ষক প্রতিবেদনে (২০২১) দেখা গেছে, নির্বাচনী অনুদান ও ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশে ব্যর্থতা, এবং তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পরিচালিত প্রচারণার অর্থায়নের উৎস চিহ্নিত করতে না পারা, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় কালো টাকার অবাধ বিচরণকে সহজ করে তোলে। বিশেষ করে, রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ অর্থায়ন এবং বড় আকারের কর্পোরেট অনুদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এই অনুদানগুলো প্রায়শই 'কোভিড-১৯ তহবিল' বা 'জনকল্যাণ ট্রাস্ট'-এর মতো ছদ্মবেশে আসে, যা পরবর্তীতে রাজনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে সরকারি নীতিতে প্রভাব ফেলে। এর ফলস্বরূপ, সরকারি প্রকল্প বরাদ্দ, লাইসেন্স প্রদান এবং অন্যান্য নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অর্থের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও দুর্নীতির জন্ম দেয়।

কালো টাকার এই প্রভাব একটি অসম নির্বাচনী ক্ষেত্র তৈরি করে, যেখানে সাধারণ সৎ ও স্বল্পবিত্ত প্রার্থীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। এটি গণতন্ত্রের মৌলিক নীতি 'এক ব্যক্তি এক ভোট' এর কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে দেয়, কারণ অর্থের জোরে ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়। এই পরিস্থিতি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর জনগণের আস্থাকে দুর্বল করে দেয় এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা হ্রাস করে। ফলস্বরূপ, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা জনগণের পরিবর্তে তাদের অর্থায়নকারীদের প্রতি দায়বদ্ধ থাকেন, যা সুশাসনের মূল স্তম্ভগুলোকে দুর্বল করে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত বিভিন্ন নীতিমালা এবং আইনের প্রয়োগে শিথিলতা এই সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলেছে, যেখানে অর্থ পাচার এবং অবৈধ লেনদেন নিয়ন্ত্রণের জন্য কঠোর আইন থাকলেও, সেগুলোর নির্বাচনী অর্থায়নের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ প্রয়োগ দেখা যায় না।

নির্বাচনী অর্থায়নে স্বচ্ছতার চ্যালেঞ্জ ২০১৪ (শতাংশ) ২০১৮ (শতাংশ) ২০২৩ (শতাংশ)
ঘোষিত আয়ের সাথে ব্যয়ের অসামঞ্জস্যতা ৬২% ৭৫% ৮২%
নির্বাচনী অনুদানের উৎস অস্পষ্টতা ৪৮% ৫৫% ৬১%
প্রচারণায় তৃতীয় পক্ষের অবৈধ অর্থায়ন ৩৭% ৪৩% ৫০%
নীতি-নির্ধারণে অর্থের প্রভাবের অভিযোগ ২৯% ৩৬% ৪২%

উৎস: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (আনুমানিক উপাত্ত), World Bank ও ADB এর বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত উপাত্তের ভিত্তিতে প্রণীত।

সুপারিশ

  • নির্বাচনী ব্যয় সংক্রান্ত বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) এর বিধিমালাকে আরও কঠোর করে, প্রতিটি প্রার্থীর নির্বাচনী ব্যয়ের প্রতিটি ক্ষুদ্র উৎস এবং ব্যয়ের বিস্তারিত বিবরণী অনলাইনে জনসমক্ষে প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা হোক। এই তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য ইসি-কে একটি স্বাধীন অডিট মেকানিজম প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হবে।
  • রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য প্রাপ্ত সকল অনুদানের উৎস, পরিমাণ এবং দাতার পরিচয় প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে, বিশেষত বড় আকারের অনুদানের ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে, নির্বাচন কমিশনকে 'রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইন' সংশোধন করে অনুদান গ্রহণে সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ এবং বেনামী অনুদান সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা প্রদান করতে হবে।
  • কালো টাকা এবং অবৈধ অর্থ নির্বাচনী অর্থায়নে প্রবেশ রোধে Anti-Money Laundering Act, 2012 (AML Act) এর অধীনে কঠোর নজরদারি ও প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে একত্রিত হয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে, যা সন্দেহজনক নির্বাচনী লেনদেন এবং অর্থ পাচারের ঘটনাগুলো দ্রুত তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. তৌফিক এলাহী

ড. তৌফিক এলাহী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

لم يتم العثور على تعليقات


News Card Generator