সম্প্রতি, বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে চীনের মেমরি চিপ নির্মাতা ইয়াংজি মেমরি টেকনোলজিস কোম্পানি (YMTC)-এর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের তীব্রতা বৃদ্ধি এবং এরপর নেদারল্যান্ডস ও জাপানের মতো দেশগুলোর সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদন সরঞ্জাম রপ্তানিতে একই ধরনের বিধিনিষেধ আরোপের সিদ্ধান্ত নতুন এক ভূ-রাজনৈতিক মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই বৈশ্বিক চিপ-যুদ্ধ কেবল পরাশক্তিগুলোর বাণিজ্যিক দ্বন্দ্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না, বরং এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য নতুন সুযোগের পাশাপাশি গভীর শঙ্কারও জন্ম দিচ্ছে, বিশেষত বাংলাদেশের মতো উদীয়মান অর্থনীতির জন্য, যেখানে ডিজিটাল রূপান্তর ও স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় রয়েছে।
বর্তমানে বৈশ্বিক ইলেকট্রনিক্স পণ্যের বাজার প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি, যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ সেমিকন্ডাক্টর নির্ভর। এই সেমিকন্ডাক্টরের উৎপাদন ও সাপ্লাই চেইনের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের নতুন হাতিয়ার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তাইওয়ানের TSMC (Taiwan Semiconductor Manufacturing Company) এবং দক্ষিণ কোরিয়ার Samsung-এর মতো জায়ান্টরা বিশ্বব্যাপী উচ্চ-প্রান্তের চিপ উৎপাদনে একচেটিয়া আধিপত্য বজায় রাখলেও, নিম্ন ও মধ্য-প্রান্তের চিপ ডিজাইন এবং অ্যাসেম্বলি, টেস্টিং ও প্যাকেজিং (ATP) খাতে নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। বাংলাদেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) ‘স্মার্ট বাংলাদেশ ২০৪১’ রূপকল্প বাস্তবায়নে স্থানীয় ইলেকট্রনিক্স উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে, যেখানে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন এবং প্যাকেজিং একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ প্রসঙ্গে, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) দেশের বিভিন্ন হাই-টেক পার্কে, যেমন কালিয়াকৈর বঙ্গবন্ধু হাই-টেক সিটি, বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার জন্য প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে, যা সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি ইউনিট স্থাপনে সহায়ক হতে পারে।
তবে এই সুযোগের পাশাপাশি রয়েছে বড় ধরনের শঙ্কা। সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, যেমন সিলিকন ওয়েফার, বিরল ধাতু এবং অত্যন্ত জটিল যন্ত্রপাতি আমদানি নির্ভর হওয়ায়, বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে যেকোনো ব্যাঘাত বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স ম্যানুফ্যাকচারিং খাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (BTRC) কর্তৃক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোবাইল ফোন সংযোজন শিল্প দ্রুত প্রসার লাভ করলেও, এর মূল উপাদান - সেমিকন্ডাক্টর চিপ - সম্পূর্ণ আমদানি নির্ভর। উদাহরণস্বরূপ, ২০২১ সালে বাংলাদেশে স্থানীয়ভাবে সংযোজিত মোবাইল ফোনের সংখ্যা ছিল প্রায় ৪ কোটি, যার প্রায় সবকটিতে ব্যবহৃত চিপ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছে। এ খাতে দেশীয় মেধা ও গবেষণা বিনিয়োগের অভাবে চিপ ডিজাইন বা ফ্যাব্রিকেশনে বাংলাদেশের সক্ষমতা এখনো সীমিত। বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) যদিও সফটওয়্যার রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে, চিপ ডিজাইন বা হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে তাদের ফোকাস এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) কর্মসূচির মাধ্যমে ডিজিটাল পরিষেবা সম্প্রসারণে সেমিকন্ডাক্টর চিপের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অপরিহার্য, কিন্তু বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এই সরবরাহকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে, যা ডিজিটাল অবকাঠামো উন্নয়নের গতিকে শ্লথ করে দিতে পারে।
| খাত | ২০২০-২১ অর্থবছর (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) | ২০২১-২২ অর্থবছর (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) | ২২-২৩ অর্থবছর (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) | প্রবৃদ্ধির হার (২২-২৩ বনাম ২০-২১) |
|---|---|---|---|---|
| ইলেকট্রনিক্স পণ্য আমদানি | ৬.২ | ৭.৮ | ৮.৫ | ৩৮.৭% |
| সেমিকন্ডাক্টর চিপ আমদানি (আনুমানিক) | ০.৮ | ১.১ | ১.৩ | ৬২.৫% |
| স্থানীয়ভাবে সংযোজিত মোবাইল ফোন (একক) | ৩.৫ কোটি | ৪.০ কোটি | ৪.৫ কোটি | ২৮.৫% |
| সফটওয়্যার ও আইটি সেবা রপ্তানি | ১.১ | ১.৪ | ১.৮ | ৬৩.৬% |
উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক, বিটিআরসি, ইপিবির ডেটা বিশ্লেষণ (আনুমানিক সেমিকন্ডাক্টর আমদানি ইলেকট্রনিক্স পণ্যের আমদানি তথ্যের ভিত্তিতে অনুমান করা হয়েছে)
সুপারিশ
- বাংলাদেশের আইসিটি বিভাগকে (ICT Division) একটি সুনির্দিষ্ট 'সেমিকন্ডাক্টর স্ট্র্যাটেজি ২০৩০' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে স্থানীয় চিপ ডিজাইন, গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য কমপক্ষে ৫০০ কোটি টাকার একটি বিশেষ তহবিল গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় ও বেসরকারি খাতের মধ্যে অংশীদারিত্বমূলক প্রকল্প (Public-Private Partnership) উৎসাহিত করা হবে।
- বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষকে (BHTPA) বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য, বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসেম্বলি, টেস্টিং ও প্যাকেজিং (ATP) এবং ফ্যাবলেস ডিজাইন কোম্পানিগুলোর জন্য, ১০ বছরের কর অবকাশ, আমদানি শুল্ক মওকুফ এবং সহজ ভূমি বরাদ্দের মতো সুনির্দিষ্ট প্রণোদনা প্যাকেজ 'বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক আইন, ২০১৭' এর অধীনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
- বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (BASIS) এবং অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (a2i) কে যৌথভাবে একটি 'ন্যাশনাল চিপ ডিজাইন ট্যালেন্ট ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম' চালু করতে হবে, যা প্রতি বছর কমপক্ষে ৫০০ জন প্রকৌশলীকে চিপ ডিজাইন, এমবেডেড সিস্টেম এবং ভিএলএসআই (VLSI) প্রযুক্তিতে উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেবে এবং এর জন্য বিটিআরসি (BTRC) এর 'সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল' থেকে অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।