গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২০-২০২৫) অনুযায়ী, দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য ইস্পাত ও সিমেন্টের চাহিদা অভূতপূর্ব হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্প, মাতারবাড়ি গভীর সমুদ্র বন্দর, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং ঢাকা মেট্রো রেলের মতো বৃহৎ নির্মাণ প্রকল্পে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৮০ লক্ষ টন ইস্পাত এবং ৪ কোটি টন সিমেন্ট ব্যবহৃত হচ্ছে। এই বিপুল চাহিদা পূরণে স্থানীয় ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্প এক বিশাল চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন, বিশেষত কাঁচামাল আমদানির উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতার কারণে। সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপ মেটাল, আয়রন আকরিক এবং ক্লিংকারের মূল্যবৃদ্ধি, সেই সাথে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, এই শিল্পের উৎপাদন ব্যয়কে বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে, যা সরাসরি মেগা প্রকল্পগুলোর ব্যয় ও সময়সীমার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বাংলাদেশের ইস্পাত শিল্প মূলত স্ক্র্যাপ মেটালের উপর নির্ভরশীল, যার প্রায় ৯০ শতাংশই আমদানি করতে হয়। World Bank-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন বছরে আন্তর্জাতিক বাজারে স্ক্র্যাপ মেটালের দাম ৩০-৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। একইসাথে, সিমেন্ট শিল্পের প্রধান কাঁচামাল ক্লিংকার, লাইমস্টোন, জিপসাম এবং ফ্লাই অ্যাশের প্রায় ৭০-৮০ শতাংশ বিদেশ থেকে আসে। এই কাঁচামালগুলোর আমদানিতে উচ্চ শুল্ক ও ভ্যাট এবং পরিবহন ব্যয় যোগ হয়ে স্থানীয় উৎপাদন খরচকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা থেকে আসা স্ক্র্যাপ মেটালের জাহাজীকরণ ব্যয় কোভিড-১৯ পরবর্তী সময়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, স্থানীয় শিল্পের উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও কাঁচামাল সংকটের কারণে তারা পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না, যা দেশের মেগা প্রকল্পগুলোর জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ। ADB (Asian Development Bank)-এর সমীক্ষা অনুযায়ী, এই আমদানি নির্ভরতা বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলের যেকোনো অস্থিরতার জন্য বাংলাদেশকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে, যা নির্মাণ শিল্পের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকিস্বরূপ।
অভ্যন্তরীণভাবে কাঁচামাল সংগ্রহের সীমিত সুযোগ এবং তার যথাযথ ব্যবহারের অভাব এই সংকটকে আরও গভীর করেছে। যদিও দেশে পুরনো ভবন ভাঙা এবং অন্যান্য উৎস থেকে স্ক্র্যাপ মেটাল সংগ্রহের একটি ছোট বাজার রয়েছে, এটি ইস্পাত শিল্পের বিশাল চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। সিমেন্ট শিল্পের ক্ষেত্রে, স্থানীয়ভাবে লাইমস্টোন ও জিপসামের কিছু মজুদ থাকলেও, তার উত্তোলন ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং পরিবেশগত ছাড়পত্রের জটিলতা একটি বড় বাধা। বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন সময়ে এই খাতে বিনিয়োগের জন্য প্রণোদনা ঘোষণা করলেও, আমদানিনির্ভরতার চক্র থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় দীর্ঘমেয়াদী কৌশলগত পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়নে ধীরগতি লক্ষ্য করা যায়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত একটি সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, কাঁচামাল সংকটের কারণে অনেক ইস্পাত ও সিমেন্ট উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান তাদের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারছে না, যা সামগ্রিকভাবে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এর ফলে মেগা প্রকল্পগুলোর নির্মাণকাজেও বিলম্ব ঘটছে এবং অতিরিক্ত ব্যয় হচ্ছে, যা দেশের অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
| পণ্যের ধরন | মোট চাহিদা (মেট্রিক টন/বছর) | আমদানি নির্ভরতা (%) | আন্তর্জাতিক বাজার মূল্যবৃদ্ধি (২০২১-২০২৩, %) |
|---|---|---|---|
| ইস্পাত (স্ক্র্যাপ মেটাল) | ৮০ লক্ষ | ৯০% | +৩০-৪০% |
| সিমেন্ট (ক্লিংকার ও অন্যান্য) | ৪ কোটি | ৭০-৮০% | +২৫-৩৫% |
উৎস: World Bank, ADB ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদন (২০২৩)
সুপারিশ
- বাংলাদেশ সরকার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং শিল্প মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনার মাধ্যমে একটি সমন্বিত কাঁচামাল সংগ্রহ নীতি প্রণয়ন করতে পারে, যেখানে স্থানীয়ভাবে ইস্পাত শিল্পের জন্য স্ক্র্যাপ মেটাল পুনর্ব্যবহার এবং সিমেন্ট শিল্পের জন্য স্থানীয় লাইমস্টোন ও জিপসাম উত্তোলনের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি ও আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করা হবে, যার ফলে আমদানি নির্ভরতা কমবে।
- জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) এবং অর্থ মন্ত্রণালয় একটি দীর্ঘমেয়াদী শুল্ক ও কর কাঠামো সংস্কার করতে পারে, যেখানে ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল আমদানির উপর নির্ভরশীলতা কমাতে স্থানীয় উৎস থেকে কাঁচামাল সংগ্রহের জন্য বিশেষ কর অবকাশ ও ভর্তুকি প্রদান করা হবে, যা স্থানীয় শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।
- পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA) যৌথভাবে একটি বিনিয়োগ রোডম্যাপ তৈরি করতে পারে, যা দেশীয় এবং বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ইস্পাত ও সিমেন্ট শিল্পের কাঁচামাল উৎপাদনে (যেমন: সরাসরি হ্রাসকৃত আয়রন বা DRI প্ল্যান্ট স্থাপন, উচ্চমানের ক্লিংকার উৎপাদন) আকৃষ্ট করবে, এবং এর জন্য পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে দ্রুত ও সরলীকৃত পরিবেশগত ছাড়পত্রের ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে।