গ্লোবাল স্কলারশিপ: মেধার দৌড়ে প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

গ্লোবাল স্কলারশিপ: মেধার দৌড়ে প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা

সাবরিনা চৌধুরী  avatar   
সাবরিনা চৌধুরী
গ্লোবাল স্কলারশিপ: মেধার দৌড়ে প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা
গ্লোবাল স্কলারশিপ: মেধার দৌড়ে প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমানো বাংলাদেশ...

সম্প্রতি, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমানো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে মাত্র ৬.৫% এসেছে দেশের প্রত্যন্ত বা প্রান্তিক অঞ্চল থেকে। একই সময়ে, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বিভিন্ন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের ক্ষেত্রে প্রায় ৭২% আসন দখল করে নিয়েছে, যেখানে বাকি ২৮% আসন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বন্টিত হয়েছে। এই পরিসংখ্যান বিশ্বজুড়ে মেধার অন্বেষণে প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতাগুলোকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে, যা কেবলমাত্র আর্থিক অসঙ্গতি নয়, বরং তথ্য, সুযোগ ও সহায়তার এক জটিল জালকে নির্দেশ করে।

এই বৈষম্যের মূল কারণ অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা প্রায়শই আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের সুযোগ সম্পর্কে সঠিক ও সময়োপযোগী তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়। শহরাঞ্চলে যেখানে বিভিন্ন শিক্ষা পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগগুলো সক্রিয়ভাবে স্কলারশিপের তথ্য সরবরাহ করে, সেখানে গ্রামীণ বা মফস্বল এলাকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এমন প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার অভাব প্রকট। ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (এনএসডিএ) যদিও দেশের সামগ্রিক দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে, কিন্তু তাদের কার্যক্রমের ফোকাস মূলত কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার উপর কেন্দ্রীভূত হওয়ায় আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার স্কলারশিপ প্রাপ্তির জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ দক্ষতা, যেমন একাডেমিক রাইটিং, গবেষণা প্রস্তাবনা তৈরি বা ইন্টারভিউ কৌশল প্রশিক্ষণে প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের সহায়তা করার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা সীমিত। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর তাদের আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতে কারিগরি দক্ষতার উপর জোর দিলেও, বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার প্রোটোকল ও প্রয়োজনীয়তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিশেষায়িত গাইডেন্স প্রদানে তারা এখনো অনেকটাই পিছিয়ে। এর ফলে, বহু সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী কেবল তথ্যের অভাবে স্কলারশিপের আবেদন প্রক্রিয়া শুরুই করতে পারে না।

এছাড়াও, আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের আবেদন প্রক্রিয়ায় প্রায়শই কিছু অপরিহার্য ব্যয় জড়িত থাকে, যা প্রান্তিক শিক্ষার্থীদের জন্য এক বিশাল বোঝা। ইংরেজি ভাষা দক্ষতা পরীক্ষার (যেমন IELTS বা TOEFL) ফি, আবেদন ফি, এবং ভিসা প্রক্রিয়াকরণের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করা তাদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ ব্যুরো অফ এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস (ব্যানবেইস)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের গ্রামীণ এলাকার স্কুলগুলোতে ইংরেজি ভাষার মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব সুস্পষ্ট। এর ফলস্বরূপ, এসব অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা প্রথম থেকেই আন্তর্জাতিক মানের ভাষা দক্ষতার দিক থেকে পিছিয়ে থাকে। এমনকি, যদি কোনো শিক্ষার্থী নিজের চেষ্টায় ভাষা দক্ষতা অর্জন করতে পারেও, আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে তারা প্রয়োজনীয় পরীক্ষার ফি পরিশোধ করতে পারে না। অনেক আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের জন্য প্রয়োজন হয় শক্তিশালী রেফারেন্স লেটার বা সুপারিশপত্র, যা পেতে শহুরে শিক্ষার্থীদের জন্য সহজ হলেও, প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য তা এক ধরনের অদৃশ্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। তাদের শিক্ষক বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর আন্তর্জাতিক মানের উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে সীমিত জ্ঞান থাকায়, তারা প্রায়শই উপযুক্ত সুপারিশপত্র প্রদানে ব্যর্থ হন।

বছর মোট আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ প্রাপ্ত শিক্ষার্থী শহরাঞ্চল থেকে প্রাপ্ত শতাংশ প্রান্তিক অঞ্চল থেকে প্রাপ্ত শতাংশ শিক্ষার্থী প্রতি গড় আবেদন ব্যয় (USD)
২০১৮-১৯ ১২,৪৫০ ৯২.৩% ৭.৭% ৪৫০
২০১৯-২০ ১৩,২০০ ৯১.৮% ৮.২% ৪৮০
২০২০-২১ ১১,৯৮০ ৯৩.১% ৬.৯% ৫২০
২০২১-২২ ১৪,১০০ ৯৩.৫% ৬.৫% ৫৫০
২০২২-২৩ ১৫,৩০০ ৯৩.২% ৬.৮% ৫৮০

উৎস: শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি এবং BANBEIS-এর সমন্বিত প্রতিবেদন

সুপারিশ

  • শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে একটি 'জাতীয় স্কলারশিপ সহায়তা কেন্দ্র' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যার শাখাগুলো জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সম্প্রসারিত হবে। এই কেন্দ্রগুলো BANBEIS-এর ডেটা ব্যবহার করে প্রান্তিক অঞ্চলের মেধাবী শিক্ষার্থীদের চিহ্নিত করবে এবং UGC-এর সাথে সমন্বয় করে আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের তথ্য, আবেদন প্রক্রিয়া, ভাষা দক্ষতা পরীক্ষার প্রস্তুতি এবং আর্থিক সহায়তার জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠন ও পরিচালনা করবে।
  • ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA)-কে তাদের বিদ্যমান কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় 'একাডেমিক স্কিলস ডেভেলপমেন্ট' মডিউল চালু করতে হবে। এই মডিউলগুলোতে গবেষণা প্রস্তাবনা লেখা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং আন্তর্জাতিক ইন্টারভিউ দক্ষতার উপর জোর দিতে হবে, যা কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-এর আওতাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোতেও বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
  • ইউজিসি-এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নির্দেশ দিতে হবে যেন তারা প্রতি বছর আন্তর্জাতিক স্কলারশিপ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট শতাংশ (যেমন, ন্যূনতম ১৫%) কোটা সংরক্ষণ করে এবং তাদের জন্য বিশেষ মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম চালু করে। পাশাপাশি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষর করার সময় প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের জন্য আসন সংরক্ষণ এবং আবেদন ফি মওকুফের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাবরিনা চৌধুরী

সাবরিনা চৌধুরী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator