সম্প্রতি, বাংলাদেশ বন বিভাগ (BFD) কর্তৃক প্রকাশিত এক প্রাথমিক সমীক্ষার ফলাফল অনুযায়ী, সুন্দরবনের ভারতীয় ও বাংলাদেশ অংশে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের বিচরণের ঘনত্বে গত পাঁচ বছরে প্রায় ৬.২% হ্রাস লক্ষ্য করা গেছে, যা লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং মিঠাপানির উৎস সঙ্কুচিত হওয়ার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কযুক্ত বলে গবেষকরা ধারণা করছেন। এই পরিসংখ্যান কেবল বাঘের সংখ্যা হ্রাসের ইঙ্গিত দেয় না, বরং এটি সুন্দরবনের সামগ্রিক মিঠাপানির বাস্তুতন্ত্রের উপর লবণাক্ততার ভয়াবহ প্রভাবের এক নীরব পদধ্বনি, যা ঐতিহ্যগতভাবে মিঠাপানির উপর নির্ভরশীল অসংখ্য জীববৈচিত্র্যকে এক অজানা সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, বিশেষ করে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, মিঠাপানির পর্যাপ্ততার উপর গভীরভাবে নির্ভরশীল। বাঘের পানীয় জলের মূল উৎস হলো সুন্দরবনের ভেতরের মিষ্টি জলের পুকুর, খাল এবং নদীগুলিতে প্রবাহিত স্বল্প লবণাক্ত জল। কিন্তু গত দুই দশকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, উজানের নদীতে বাঁধ নির্মাণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে লবণাক্ত জলের অনুপ্রবেশ আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-এর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের সীমান্তবর্তী কৃষিজমিতে লবণাক্ততার মাত্রা বিগত ১০ বছরে গড়ে ০.৫ dS/m (ডেসি সিমেন্স প্রতি মিটার) বৃদ্ধি পেয়েছে, যা শুধু কৃষিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং বৃষ্টির জল এবং নদী থেকে আসা মিঠাজলের স্তরকেও দূষিত করছে। এই পরিস্থিতি বাঘের জন্য প্রয়োজনীয় বিশুদ্ধ পানীয় জলের উৎসকে মারাত্মকভাবে সংকুচিত করেছে, যার ফলে তাদের বিচরণ ক্ষেত্র পরিবর্তন হচ্ছে এবং প্রজনন প্রক্রিয়াতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
লবণাক্ততার এই আগ্রাসন শুধু বাঘ নয়, সুন্দরবনের মিঠাপানির অসংখ্য জীবের জীবনচক্রেও বিপর্যয় সৃষ্টি করছে। মিঠাপানির কুমির, শুশুক, কচ্ছপ এবং বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও উভচরেরা তাদের প্রজনন এবং জীবনধারণের জন্য মিঠাজলের উপর নির্ভরশীল। পরিবেশ মন্ত্রণালয়-এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের অভ্যন্তরে মিঠাপানির মাছের প্রজাতিতে প্রায় ১৫% হ্রাস ঘটেছে গত এক দশকে, যার প্রধান কারণ লবণাক্ত জলের অনুপ্রবেশ। বিশেষ করে, মিঠাপানির কুমিরের ডিম পাড়ার স্থানগুলো লবণাক্ত হয়ে যাওয়ায় তাদের প্রজননে বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হচ্ছে। এছাড়া, বাংলাদেশ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) তাদের স্থানীয় পর্যবেক্ষণ রিপোর্টে উল্লেখ করেছে যে, উপকূলীয় অঞ্চলের পুকুর ও জলাশয়গুলোতে মিঠাপানির মাছ চাষ ব্যাহত হচ্ছে লবণাক্ততার কারণে, যা সুন্দরবনের ভেতরের জলাশয়গুলোতেও একই ধরনের প্রভাব ফেলছে। এই পরিবর্তন খাদ্যশৃঙ্খলের নিম্নস্তর থেকে শুরু করে উপরের স্তর পর্যন্ত এক সামগ্রিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছে যে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে সুন্দরবনের অনন্য জীববৈচিত্র্যের একটি বড় অংশ চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
| পরিবেশগত সূচক | ২০০৩ সালের গড় | ২০১৩ সালের গড় | ২০২৩ সালের গড় | পরিবর্তনের হার (২০০৩-২০২৩) |
|---|---|---|---|---|
| সুন্দরবনের অভ্যন্তরীণ জলের লবণাক্ততা (ppt) | ৩.৫ | ৫.২ | ৭.৮ | +১২৩% |
| মিঠাপানির মাছের প্রজাতি সংখ্যা (সুন্দরবন) | ৮২ | ৭১ | ৬১ | -২৫.৬% |
| রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার সংখ্যা (বাংলাদেশ অংশ) | ৪৪০ | ১০৬ | ১১৪ | -৭৪% (২০১৩-তে চরম হ্রাস, পরে সামান্য বৃদ্ধি) |
| মিঠাপানির কুমিরের প্রজনন হার (%) | ৬০ | ৪৫ | ৩০ | -৫০% |
উৎস: বাংলাদেশ বন বিভাগ, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, DAE ও BARI-এর সমন্বিত গবেষণা প্রতিবেদন
সুপারিশ
- পরিবেশ মন্ত্রণালয়-এর তত্ত্বাবধানে একটি 'সুন্দরবন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট' গঠন করে লবণাক্ততা সহনশীল মিঠাপানির উৎস তৈরি ও সংরক্ষণে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তহবিল বরাদ্দ এবং সমন্বিত প্রকল্প বাস্তবায়ন করা।
- DAE এবং BARI-এর সম্মিলিত উদ্যোগে সুন্দরবনের আশেপাশের মিঠাপানির জলাধার এবং কৃষিজমিতে লবণাক্ততা প্রতিরোধী স্থানীয় উদ্ভিদের জাত উদ্ভাবন ও বিস্তারে গবেষণা জোরদার করা এবং স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে এর ব্যবহার উৎসাহিত করা।
- BRRI এবং BARC-এর সহযোগিতায় সুন্দরবনের উজানে নদীগুলোতে মিঠাজলের প্রবাহ নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক পানি ব্যবস্থাপনা চুক্তি পর্যালোচনা ও আধুনিকায়ন করা, এবং নদী খনন ও পলি অপসারণের মাধ্যমে মিঠাজল প্রবাহের প্রাকৃতিক চ্যানেলগুলো পুনরুদ্ধার করা।