বন্ড মার্কেট: স্বল্প মেয়াদী আশার আড়ালে দীর্ঘ মেয়াদী সম্ভাবনার সংকট | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বন্ড মার্কেট: স্বল্প মেয়াদী আশার আড়ালে দীর্ঘ মেয়াদী সম্ভাবনার সংকট

তানভীর আহমেদ  avatar   
তানভীর আহমেদ
বন্ড মার্কেট: স্বল্প মেয়াদী আশার আড়ালে দীর্ঘ মেয়াদী সম্ভাবনার সংকট
বন্ড মার্কেট: স্বল্প মেয়াদী আশার আড়ালে দীর্ঘ মেয়াদী সম্ভাবনার সংকট
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক কর্পোরেট বন্ডের তালিকাভুক্তি ও ট্রেডিং সহজ করার উদ্দেশ্যে জারি করা নতুন নির্দেশিকা এবং ...

সম্প্রতি বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক কর্পোরেট বন্ডের তালিকাভুক্তি ও ট্রেডিং সহজ করার উদ্দেশ্যে জারি করা নতুন নির্দেশিকা এবং ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) ট্রেজারি বন্ডের লেনদেনের পরিমাণ গত অর্থবছরে প্রায় ২৫% বৃদ্ধির পরিসংখ্যান স্বল্প মেয়াদে বন্ড মার্কেটের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ইঙ্গিত দিলেও, এর গভীরে দীর্ঘ মেয়াদী সম্ভাবনার সংকট এখনো প্রকট। বিশেষ করে, প্রাথমিক বাজারে কিছু কর্পোরেট বন্ডের অতি-সাবস্ক্রিপশন এবং সরকারি বন্ডের চাহিদা বৃদ্ধির প্রবণতা একটি আশাব্যঞ্জক চিত্র তুলে ধরছে, যা নিয়ন্ত্রক সংস্থার সক্রিয়তা এবং বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান আগ্রহের প্রতিফলন। তবে, এই আপাত ইতিবাচকতার আড়ালে থাকা কাঠামোগত দুর্বলতা ও তারল্য সংকটের মতো মৌলিক সমস্যাগুলো বাজারের টেকসই প্রবৃদ্ধি ও গভীরতা অর্জনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের বন্ড বাজার, বিশেষত কর্পোরেট বন্ড সেগমেন্ট, এখনো তার শৈশবাবস্থায় রয়েছে। যদিও বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সহায়তায় সরকারি ট্রেজারি বন্ডের প্রাথমিক বাজার বেশ সক্রিয়, তবে ডিএসই এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)-তে এর মাধ্যমিক বাজার এখনো উল্লেখযোগ্য তারল্য অর্জনে ব্যর্থ। গত কয়েক বছরে, বিএসইসি কিছু কর্পোরেট বন্ড, যেমন গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের জিরো কুপন বন্ড বা বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সাবঅর্ডিনেটেড বন্ডের অনুমোদন দিয়েছে, যা প্রাথমিক বাজারে ইতিবাচক সাড়া পেয়েছে। কিন্তু এই বন্ডগুলো তালিকাভুক্তির পর মাধ্যমিক বাজারে নগণ্য লেনদেনের শিকার হচ্ছে, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থা সংকটের জন্ম দিচ্ছে। এর কারণ হিসেবে দেখা যায়, বন্ডের মূল্য নির্ধারণে স্বচ্ছতার অভাব, ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের জন্য সহজলভ্যতার অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সীমিত অংশগ্রহণ। সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) বন্ডের ইলেকট্রনিক হোল্ডিং নিশ্চিত করলেও, এই প্রযুক্তিগত সুবিধা এখনো কার্যকর মাধ্যমিক বাজার গঠনে পর্যাপ্ত ভূমিকা রাখতে পারেনি।

বন্ড মার্কেটের এই স্বল্প তারল্যের মূল কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো বাজারের গভীরতার অভাব। বর্তমানে, বেশিরভাগ বন্ড প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দ্বারা ধারণ করা হয় এবং ম্যাচুরিটি পর্যন্ত ধরে রাখা হয়, যার ফলে মাধ্যমিক বাজারে বিক্রির জন্য খুব কম বন্ড উপলব্ধ থাকে। উপরন্তু, ট্রেজারি বিল ও বন্ডের ইয়েল্ড কার্ভ এখনো পুরোপুরি বিকশিত হয়নি, যা কর্পোরেট বন্ডের জন্য একটি রেফারেন্স রেট প্রতিষ্ঠায় বাধা সৃষ্টি করে। বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বন্ডের ঝুঁকি-পুরস্কার অনুপাত সম্পর্কে সচেতনতার অভাবও একটি বড় সমস্যা। ডিএসই ও সিএসই-তে বন্ডের লেনদেনের জন্য আধুনিক ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মের অভাব এবং বাজার নির্মাতাদের (Market Makers) অনুপস্থিতি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ, গত অর্থবছরে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত প্রায় ৫০টিরও বেশি কর্পোরেট বন্ডের মধ্যে মাত্র কয়েকটি বন্ডে নিয়মিত লেনদেন পরিলক্ষিত হয়েছে, যার অধিকাংশই ছিল ব্লক ট্রেড। এই অবস্থা ইঙ্গিত করে যে, বন্ড বাজার মূলত একটি ‘হোল্ড-টু-ম্যাচুরিটি’ বাজার হিসেবে কাজ করছে, যেখানে ট্রেডিংয়ের সুযোগ সীমিত।

আরেকটি গুরুতর সমস্যা হলো, নিয়ন্ত্রক কাঠামোর কিছু ফাঁক এবং কর নীতির অসামঞ্জস্য। কর্পোরেট বন্ডের উপর আরোপিত কর, বিশেষ করে ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য, শেয়ারবাজারের তুলনায় কম আকর্ষণীয়। এছাড়া, বন্ড ইস্যু করার প্রক্রিয়া এখনো জটিল ও সময়সাপেক্ষ, যা অনেক সম্ভাব্য ইস্যুকারীকে নিরুৎসাহিত করে। বিএসইসি কর্পোরেট গভর্ন্যান্স কোড এবং অন্যান্য প্রবিধানের মাধ্যমে শেয়ারবাজারের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করলেও, বন্ড ইস্যুকারী সংস্থাগুলোর আর্থিক স্বাস্থ্য এবং ক্রেডিট রেটিংয়ের পর্যাপ্ত তদারকির অভাব রয়েছে। ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিগুলো তাদের ভূমিকা পালন করলেও, তাদের রেটিংয়ের উপর বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়ানো জরুরি। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তারল্য ব্যবস্থাপনার জন্য বন্ড একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হতে পারলেও, তাদের বিনিয়োগ নীতিতে বন্ডের প্রতি অগ্রাধিকার কম। ফলস্বরূপ, বন্ড বাজার মূলধন সংগ্রহের একটি কার্যকর উৎস হিসেবে বিকশিত হতে পারছে না, যা দেশের দীর্ঘমেয়াদী অবকাঠামো উন্নয়ন এবং শিল্পায়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সূচক ২০২০-২১ (কোটি টাকা) ২০২১-২২ (কোটি টাকা) ২০২২-২৩ (কোটি টাকা) ২০২৩-২৪ (প্রথমার্ধ, কোটি টাকা)
ডিএসই-তে ট্রেজারি বন্ড লেনদেন ৮,৫০০ ১০,২০০ ১২,৭৫০ ৭,০০০
কর্পোরেট বন্ড ইস্যু (প্রাথমিক বাজার) ১,৩০০ ২,১০০ ৩,২০০ ১,৮০০
সিএসই-তে বন্ড লেনদেন ১০০ ১২০ ১৫০ ৮০
সিডিবিএল-এ ডিম্যাটেরিয়ালাইজড বন্ডের মূল্য ১,৫০,০০০ ১,৮০,০০০ ২,২০,০০০ ২,৪০,০০০

উৎস: বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC), ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (DSE), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (CSE), সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (CDBL) এর বার্ষিক প্রতিবেদন ও মাসিক পরিসংখ্যান।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এবং অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক একটি সমন্বিত টাস্কফোর্স গঠন করে বন্ড মার্কেট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (BMDF) চালু করা যেতে পারে, যা বাজার নির্মাতাদের (Market Makers) জন্য প্রণোদনা প্রদান করবে এবং মাধ্যমিক বাজারে তারল্য বাড়াতে সহায়তা করবে।
  • ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) এবং চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) কর্তৃক একটি অত্যাধুনিক, সর্বজনীন বন্ড ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম (যেমন বন্ড ওটিসি প্ল্যাটফর্ম) চালু করা উচিত, যেখানে ট্রেজারি বন্ড এবং কর্পোরেট বন্ড উভয়ই সহজে লেনদেন করা যাবে এবং সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল) এর সাথে নির্বিঘ্ন সমন্বয় নিশ্চিত করা হবে।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ ও এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) কর্তৃক বন্ডে বিনিয়োগের উপর কর সুবিধা পুনর্বিবেচনা করা উচিত, বিশেষত ব্যক্তি বিনিয়োগকারীদের জন্য করমুক্ত সীমা বৃদ্ধি এবং কর্পোরেট বন্ডের কুপন আয়ের উপর আকর্ষণীয় কর নীতি প্রবর্তন করা, যা শেয়ারবাজারের ডিভিডেন্ড আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানভীর আহমেদ

তানভীর আহমেদ 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শেয়ারবাজার ও ক্যাপিটাল মার্কেট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

نظری یافت نشد


News Card Generator