অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ডা. তৌহিদ হাসান  avatar   
ডা. তৌহিদ হাসান
অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা: সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রকাশিত 'গ্লোবাল এনসিডি রিপোর্ট ২০২৩' অনুযায়ী, বাংলাদেশে অসংক্রামক ব্যাধি (Non-Communicable Diseases - NCDs) বর্তমানে...

সম্প্রতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রকাশিত 'গ্লোবাল এনসিডি রিপোর্ট ২০২৩' অনুযায়ী, বাংলাদেশে অসংক্রামক ব্যাধি (Non-Communicable Diseases - NCDs) বর্তমানে মোট মৃত্যুর প্রায় ৬৮% এর জন্য দায়ী, যা গত এক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। এই উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান এমন এক সময়ে এসেছে যখন বাংলাদেশ সরকার, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় ডিজিটাল রূপান্তরের ওপর জোর দিচ্ছে। বিশেষত, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা স্তরে টেলিমেডিসিন এবং মোবাইল স্বাস্থ্য অ্যাপ্লিকেশনের মতো ডিজিটাল সরঞ্জামগুলির ব্যবহার NCD ব্যবস্থাপনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। তবে, এই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে প্রযুক্তিগত অবকাঠামো, জনবলের সক্ষমতা এবং নীতিগত কাঠামোর মতো একাধিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অপরিহার্য।

অসংক্রামক ব্যাধি, যেমন হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের উপর এক বিশাল বোঝা সৃষ্টি করছে। এই রোগগুলি প্রায়শই দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণ এবং ব্যবস্থাপনার দাবি রাখে, যা ঐতিহ্যবাহী স্বাস্থ্যসেবা মডেলের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলে বা সীমিত সম্পদযুক্ত এলাকায় সরবরাহ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এখানেই ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। উদাহরণস্বরূপ, মোবাইল ফোন ভিত্তিক মেসেজিং সার্ভিস (SMS) বা অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে রোগীদের জীবনযাপন পরিবর্তন, ঔষধ সেবন এবং ফলো-আপের জন্য নিয়মিত reminders পাঠানো যেতে পারে। এর পাশাপাশি, AI-চালিত ডায়াগনস্টিক টুলস প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণে সহায়তা করতে পারে, বিশেষ করে যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অভাব রয়েছে। বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) উভয়ই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে ডিজিটাল রূপান্তরের জন্য তহবিল এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছে, যা NCD ব্যবস্থাপনার জন্য একটি ইতিবাচক দিক। তাদের সাম্প্রতিক এক যৌথ প্রতিবেদনে, NCD রোগীদের জন্য টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিশেষজ্ঞ পরামর্শ এবং রিমোট মনিটরিংয়ের সুবিধা প্রদানের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা রোগীদের হাসপাতালে সশরীরে উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা হ্রাস করে এবং সময় ও খরচ বাঁচায়।

তবে, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার এই ব্যাপক প্রয়োগের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। প্রথমত, ডিজিটাল ডিভাইসের সহজলভ্যতা এবং ইন্টারনেট সংযোগের অভাব, বিশেষত গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে, একটি বড় বাধা। যদিও বাংলাদেশ সরকার সারা দেশে ইন্টারনেট পরিষেবা সম্প্রসারণে কাজ করছে, ডিজিটাল ডিভাইসের মালিকানা এবং ব্যবহারের ক্ষেত্রে এখনো একটি বড় বৈষম্য রয়েছে। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী এবং রোগীদের মধ্যে ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। চিকিৎসকদের ডিজিটাল সরঞ্জাম ব্যবহারে প্রশিক্ষণ এবং রোগীদেরকে মোবাইল অ্যাপ বা টেলিমেডিসিন প্ল্যাটফর্মের সাথে পরিচিত করানো অত্যন্ত জরুরি। ডেটা সুরক্ষা এবং গোপনীয়তা (data privacy and security) আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। সংবেদনশীল রোগীর ডেটা সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং আদান-প্রদানের জন্য একটি শক্তিশালী এবং সুরক্ষিত ডিজিটাল অবকাঠামো এবং স্পষ্ট নীতিমালার অনুপস্থিতি ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার প্রতি আস্থা কমিয়ে দিতে পারে। এছাড়াও, বিভিন্ন ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্মের মধ্যে আন্তঃকার্যক্ষমতা (interoperability) নিশ্চিত করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যাতে বিভিন্ন উৎস থেকে প্রাপ্ত ডেটা একত্রিত করে রোগীর একটি সামগ্রিক চিত্র পাওয়া যায় এবং সে অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা যায়।

এই চ্যালেঞ্জগুলো সত্ত্বেও, ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা NCD নিয়ন্ত্রণে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে সক্ষম। বিশেষ করে, পরিধানযোগ্য ডিভাইস (wearable devices) এবং স্মার্ট সেন্সরগুলির মাধ্যমে রোগীদের শারীরিক প্যারামিটার (যেমন রক্তচাপ, রক্তে শর্করার মাত্রা) রিয়েল-টাইমে পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব, যা চিকিৎসকদের দ্রুত হস্তক্ষেপ এবং ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়তা করে। এই ডেটা-চালিত পদ্ধতি NCD ব্যবস্থাপনাকে আরও সক্রিয় এবং প্রতিরোধমূলক করে তুলতে পারে। বাংলাদেশ সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, বিশেষত স্বাস্থ্য তথ্য ব্যবস্থাপনা সিস্টেম (HMIS) এবং ই-হেলথ কার্যক্রমের মাধ্যমে, এই দিকে উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে, এই উদ্যোগগুলোকে আরও সুসংহত এবং সম্প্রসারিত করা প্রয়োজন যাতে ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার সুবিধা দেশের প্রতিটি প্রান্তে পৌঁছে যায় এবং NCD-এর ক্রমবর্ধমান বোঝা কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা যায়।

সূচক ২০১৩ (শতাংশ) ২০২৩ (শতাংশ) বৃদ্ধি/হ্রাস
মোট মৃত্যুতে NCD-এর অবদান ৫৯% ৬৮% +৯%
ডায়াবেটিস রোগীর সংখ্যায় আনুমানিক বৃদ্ধি (গত ১০ বছরে) ৬.৯ মিলিয়ন ১২.৫ মিলিয়ন +৮১%
টেলিমেডিসিন পরিষেবা ব্যবহারকারী (আনুমানিক) <১% ৭% +৬%
স্বাস্থ্য খাতে ডিজিটাল বিনিয়োগে World Bank ও ADB-এর অংশীদারিত্ব ২০% ৩৫% +১৫%

উৎস: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) গ্লোবাল এনসিডি রিপোর্ট ২০২৩, বাংলাদেশ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, World Bank ও ADB যৌথ প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC) এর সাথে সমন্বয় করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে উচ্চ-গতির ইন্টারনেট অবকাঠামো সম্প্রসারণ এবং ডিজিটাল ডিভাইসের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার জন্য 'জাতীয় ডিজিটাল স্বাস্থ্য নীতিমালা ২০২৪' এর অধীনে একটি বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে।
  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে চিকিৎসকদের জন্য ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবা প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারে বাধ্যতামূলক এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচির আয়োজন করতে হবে, যা বাংলাদেশ মেডিকেল ও ডেন্টাল কাউন্সিল (BMDC) কর্তৃক স্বীকৃত হবে এবং রোগীদের জন্য মোবাইল স্বাস্থ্য অ্যাপ ব্যবহারের উপর গণসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করতে হবে।
  • তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগকে (ICT Division) জাতীয় ডেটা সুরক্ষা আইনের অধীনে স্বাস্থ্য ডেটা সুরক্ষা এবং গোপনীয়তার জন্য একটি শক্তিশালী কাঠামোর পাশাপাশি, বিভিন্ন ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্ল্যাটফর্মের মধ্যে আন্তঃকার্যক্ষমতা (interoperability) নিশ্চিত করতে একটি কেন্দ্রীয় স্ট্যান্ডার্ডাইজড প্রোটোকল তৈরি করতে হবে, যা সকল সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীর জন্য বাধ্যতামূলক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. তৌহিদ হাসান

ডা. তৌহিদ হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Walang nakitang komento


News Card Generator