জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: ব্যক্তিগতকৃত ক্যান্সার চিকিৎসায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: ব্যক্তিগতকৃত ক্যান্সার চিকিৎসায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ

ড. আদনান সামি  avatar   
ড. আদনান সামি
জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: ব্যক্তিগতকৃত ক্যান্সার চিকিৎসায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: ব্যক্তিগতকৃত ক্যান্সার চিকিৎসায় বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) দেশের চারটি প্রধান ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্রে জিনোম সিকোয়েন্সিং ল্যাবরেটরি স্থাপনের প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করেছে...

সম্প্রতি, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) দেশের চারটি প্রধান ক্যান্সার চিকিৎসা কেন্দ্রে জিনোম সিকোয়েন্সিং ল্যাবরেটরি স্থাপনের প্রাথমিক সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করেছে, যা ব্যক্তিগতকৃত ক্যান্সার চিকিৎসার দিগন্ত উন্মোচনে এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এই উদ্যোগটি প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশ বৈশ্বিক স্বাস্থ্য প্রযুক্তির সর্বশেষ ধারা, বিশেষ করে জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তির মাধ্যমে ক্যান্সার চিকিৎসায় এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে প্রস্তুত। ২০৩০ সালের মধ্যে অসংক্রামক রোগ, বিশেষ করে ক্যান্সারের কারণে অকালমৃত্যু এক-তৃতীয়াংশ কমানোর বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এই ধরনের প্রযুক্তিগত বিনিয়োগ অপরিহার্য। যদিও দেশের স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ এখনও আন্তর্জাতিক মানের নিচে, তবুও সরকার ও বেসরকারি খাতের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এই প্রযুক্তিকে মূলধারায় নিয়ে আসার একটি সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, ব্যক্তিগতকৃত ক্যান্সার চিকিৎসা, যা রোগীর জিনগত বৈশিষ্ট্য অনুসারে থেরাপি ডিজাইন করে, তা প্রচলিত কেমোথেরাপি বা রেডিয়েশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হ্রাস করে চিকিৎসার কার্যকারিতা বাড়াতে পারে। জিনোমিক্স প্রযুক্তি, যার মাধ্যমে রোগীর টিউমারের জিনগত মিউটেশন সনাক্ত করা হয়, তা নির্দিষ্ট 'টার্গেটেড থেরাপি' বা ইমিউনোথেরাপি প্রয়োগে সহায়তা করে। উদাহরণস্বরূপ, যদি একজন রোগীর ফুসফুসের ক্যান্সারে EGFR মিউটেশন থাকে, তবে তাকে EGFR ইনহিবিটর ড্রাগ দেওয়া হয়, যা এই মিউটেশনের অভাবে কার্যকর নয়। বর্তমানে, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ক্যান্সার রিসার্চ অ্যান্ড হসপিটাল (NICRH) এবং কিছু বেসরকারি হাসপাতালে সীমিত পরিসরে কিছু জিনগত পরীক্ষা (যেমন BRCA1/2, HER2) করা হলেও, ব্যাপক জিনোম সিকোয়েন্সিং এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এই প্রযুক্তিকে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে প্রয়োজন অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি, দক্ষ জনবল এবং সঠিক নীতি কাঠামো। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এই বিষয়ে একটি জাতীয় কৌশলপত্র প্রণয়নের কাজ শুরু করেছে, যার লক্ষ্য হলো জিনোমিক্সকে দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গড়ে তোলা।

এই অগ্রগতির পথে অসংখ্য চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। প্রথমত, জিনোম সিকোয়েন্সিং ও টার্গেটেড থেরাপির ব্যয় অত্যন্ত বেশি, যা বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে। সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে এই ব্যয়ভার বহন করা একটি বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ। দ্বিতীয়ত, দক্ষ জনবলের অভাব। বায়োইনফরম্যাটিক্স, মেডিক্যাল জেনেটিক্স এবং জিনোমিক্স-ভিত্তিক ক্যান্সার চিকিৎসায় পারদর্শী চিকিৎসক, বিজ্ঞানী ও টেকনিশিয়ান তৈরি করতে বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিশেষায়িত কোর্স চালু করা জরুরি। ইনস্টিটিউট অফ এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) কিছু প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালনা করলেও, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। তৃতীয়ত, ডেটা সুরক্ষা ও নৈতিকতার প্রশ্ন। রোগীর জিনগত তথ্য অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং এর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে একটি শক্তিশালী আইনি ও প্রযুক্তিগত কাঠামো প্রয়োজন। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো মানসিক স্বাস্থ্যের ডেটা সুরক্ষায় যে পদ্ধতি অনুসরণ করে, জিনোমিক ডেটার ক্ষেত্রেও অনুরূপ বা আরও কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। এছাড়া, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) কর্তৃক ব্যক্তিগতকৃত ওষুধের অনুমোদন ও মান নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়াকেও আধুনিকীকরণ করতে হবে, যাতে নতুন প্রযুক্তিনির্ভর থেরাপি দ্রুত ও নিরাপদে রোগীদের কাছে পৌঁছাতে পারে।

বাংলাদেশে ক্যান্সারের প্রকোপ ও জিনোমিক্স-ভিত্তিক পরীক্ষা
সূচক ২০২০ সালের পরিসংখ্যান (আনুমানিক) মন্তব্য
ক্যান্সারে আক্রান্ত নতুন রোগী ১,৫০,৭৭৭ জন গ্লোবোক্যান ২০২০ এর তথ্য অনুযায়ী
ক্যান্সারে মৃত্যু ১,০৮,৯৯১ জন গ্লোবোক্যান ২০২০ এর তথ্য অনুযায়ী
জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ (২০২৩-২৪) ৫.০৪% মোট বাজেটের শতাংশ, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশের (১৫%) চেয়ে অনেক কম।
BRCA1/2 জিন পরীক্ষা (ব্যক্তিগত খাতে) ৳২৫,০০০ - ৳৪৫,০০০ সাধারণত স্তন ও ওভারিয়ান ক্যান্সারের জন্য ব্যবহৃত হয়।
EGFR মিউটেশন পরীক্ষা (ব্যক্তিগত খাতে) ৳১২,০০০ - ৳২০,০০০ ফুসফুসের ক্যান্সারের জন্য ব্যবহৃত হয়।
সর্বাঙ্গীন জিনোম সিকোয়েন্সিং (Whole Genome Sequencing) ৳১,৫০,০০০ - ৳৪,০০,০০০ এখনও সীমিত ল্যাবে উপলব্ধ ও ব্যয়বহুল।

উৎস: গ্লোবোক্যান ২০২০, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৩, বেসরকারি ডায়াগনস্টিক ল্যাবরেটরির তথ্য।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এর অধীনে একটি 'জাতীয় জিনোমিক্স ও বায়োমেডিসিন কাউন্সিল' গঠন করা হোক, যা জিনোমিক্স গবেষণা, ডেটা সুরক্ষা এবং ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসার নীতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেবে। এই কাউন্সিল জিনোমিক ডেটা সুরক্ষার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট 'ডেটা প্রাইভেসি অ্যাক্ট' প্রণয়নে ভূমিকা রাখবে।
  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) দেশের প্রধান মেডিকেল কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বায়োইনফরম্যাটিক্স, ক্লিনিক্যাল জেনেটিক্স এবং মলিকুলার প্যাথলজি বিষয়ে বিশেষায়িত পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট কোর্স ও ফেলোশিপ প্রোগ্রাম চালু করার জন্য একটি কর্মপরিকল্পনা তৈরি করুক, যা ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ (NIMH) এর মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাথে সমন্বয় করে দক্ষ জনবল তৈরি করবে।
  • ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) ব্যক্তিগতকৃত ক্যান্সার চিকিৎসার জন্য ব্যবহৃত টার্গেটেড থেরাপি ও ডায়াগনস্টিক কিটসের দ্রুত অনুমোদন ও মান নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি বিশেষায়িত ফাস্ট-ট্র্যাক রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করুক এবং একইসাথে, স্থানীয়ভাবে এই ধরনের প্রযুক্তি ও ঔষধ উৎপাদনে উৎসাহিত করার জন্য নীতি সহায়তা প্রদান করুক।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. আদনান সামি

ড. আদনান সামি 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

没有找到评论


News Card Generator