শিক্ষাব্যবস্থার ফাঁক গলে মেধার প্রস্থান: বিদেশের স্কলারশিপ ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

শিক্ষাব্যবস্থার ফাঁক গলে মেধার প্রস্থান: বিদেশের স্কলারশিপ ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ

ড. জহিরুল ইসলাম  avatar   
ড. জহিরুল ইসলাম
শিক্ষাব্যবস্থার ফাঁক গলে মেধার প্রস্থান: বিদেশের স্কলারশিপ ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ
শিক্ষাব্যবস্থার ফাঁক গলে মেধার প্রস্থান: বিদেশের স্কলারশিপ ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২২) অনুযায়ী, গত এক দশকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমানো বাংলাদেশি শিক্ষার্থ...

সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন (২০২২) অনুযায়ী, গত এক দশকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমানো বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় তিনগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দেশের শিক্ষাব্যবস্থা ও ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ উন্নয়নে এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এই প্রতিবেদন শুধু একটি সংখ্যাগত বৃদ্ধি নয়, এটি বাংলাদেশের মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিদেশের প্রতি ক্রমবর্ধমান আকর্ষণ এবং দেশের অভ্যন্তরে উপযুক্ত সুযোগের অভাবের এক স্পষ্ট প্রতিচ্ছবি। বিশেষ করে, উন্নত দেশগুলোর আকর্ষণীয় স্কলারশিপ প্রোগ্রাম এবং গবেষণার উন্নত পরিবেশ মেধাবীদের জন্য এক শক্তিশালী চুম্বকের মতো কাজ করছে, যা দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এক নীরব সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই প্রবণতা যদি অব্যাহত থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ তার নিজস্ব মেধা ও উদ্ভাবনী শক্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়বে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং টেকসই উন্নয়নের পথে বড় বাধা সৃষ্টি করবে।

এই মেধার প্রস্থান শুধুমাত্র উচ্চশিক্ষার জন্য নয়, বরং উন্নত কর্মসংস্থান ও গবেষণার সুযোগের অভাবেও প্রভাবিত হচ্ছে। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-এর সাম্প্রতিক তথ্য মতে, দেশের শ্রমবাজারে উচ্চশিক্ষিত ও দক্ষ জনবলের চাহিদা থাকা সত্ত্বেও, তাদের জন্য পর্যাপ্ত গবেষণা-ভিত্তিক পদ, উদ্ভাবনী প্ল্যাটফর্ম এবং প্রতিযোগিতামূলক বেতন কাঠামো তৈরি হয়নি। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ ইঙ্গিত দেয় যে, উচ্চশিক্ষিত যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার তুলনামূলকভাবে বেশি, যা তাদের বিদেশে পাড়ি জমানোর অন্যতম প্রধান কারণ। অন্যদিকে, উন্নত দেশগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য এবং অস্ট্রেলিয়া, তাদের ভিসা নীতি এবং স্কলারশিপ প্রোগ্রামকে এমনভাবে সাজিয়েছে যাতে তারা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সেরা মেধা আকর্ষণ করতে পারে। এই দেশগুলোতে পিএইচডি বা পোস্ট-ডক্টরাল গবেষণার জন্য যে পরিমাণ ফান্ডিং এবং সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়, তা বাংলাদেশের গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায় অনুপস্থিত। ফলস্বরূপ, একজন মেধাবী শিক্ষার্থী যখন দেখে যে তার মেধার সর্বোচ্চ ব্যবহার এবং ভবিষ্যতের জন্য একটি স্থিতিশীল প্ল্যাটফর্ম দেশের বাইরে সহজলভ্য, তখন তার পক্ষে বিদেশে পাড়ি জমানো স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। এটি কেবল ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়, বরং দেশের শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা এবং বাজারের চাহিদার মধ্যে বিদ্যমান অসামঞ্জস্যেরও একটি ফল।

মেধা পাচারের এই ধারা বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (ব্যানবেইস) এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের শিক্ষা খাতে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করা হলেও, সেই বিনিয়োগের সুফল সম্পূর্ণভাবে দেশে থাকছে না। স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশে যাওয়া শিক্ষার্থীরা প্রায়শই সেখানেই স্থায়ী হয়, যার ফলে দেশ হারায় তার শ্রেষ্ঠ মানবসম্পদ। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত (STEM) বিষয়ক উচ্চশিক্ষিতরা দেশের জন্য সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তারাই উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত অগ্রগতির চালিকাশক্তি। সরকার কর্তৃক পরিচালিত স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SEIP) এর মতো প্রকল্পগুলো দেশের অভ্যন্তরে দক্ষ জনবল তৈরির চেষ্টা করলেও, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মেধা ধরে রাখার জন্য পর্যাপ্ত উদ্যোগের অভাব রয়েছে। মেধাবীরা যখন দেখছে যে, তাদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার যথাযথ মূল্যায়ন এবং প্রয়োগের সুযোগ দেশে সীমিত, তখন তারা উন্নত পরিবেশের দিকে ঝুঁকছে। এই পরিস্থিতি দেশের গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতেও স্থবিরতা আনছে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে এমনভাবে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন, যাতে শুধু ডিগ্রিধারী তৈরি না হয়ে, উদ্ভাবনী ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হয়, যারা দেশের উন্নয়নে সরাসরি অবদান রাখতে পারে এবং বিদেশে স্কলারশিপ পেলেও দেশে ফিরে আসার অনুপ্রেরণা পায়।

শিক্ষাবর্ষ বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য যাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা (আনুমানিক) ইউজিসি'র গবেষণা খাতে বরাদ্দ (কোটি টাকা) কারিগরি শিক্ষায় ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর সংখ্যা (লক্ষ)
২০১১-১২ ২৮,০০০ ৮০ ২.৫
২০১৫-১৬ ৫২,০০০ ১২০ ৪.৮
২০১৯-২০ ৭৭,০০০ ১৫০ ৬.৫
২০২১-২২ ৯১,০০০ ১৮০ ৭.১

উৎস: ইউজিসি বার্ষিক প্রতিবেদন (বিভিন্ন সাল), ব্যানবেইস, আইইএলটিএস/টিওইএফএল পরীক্ষা কেন্দ্র, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর।

সুপারিশ

  • জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন নীতি (National Research and Innovation Policy) ২০২৪-এর দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করে ইউজিসি-এর মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা খাতে বরাদ্দ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি করতে হবে এবং গবেষণা অনুদান বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
  • কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এর সম্মিলিত উদ্যোগে Skill Development Act, ২০১২ এর অধীনে একটি উচ্চ পর্যায়ের 'মেধা সংরক্ষণ ও কর্মসংস্থান সেল' গঠন করতে হবে, যা বিদেশে উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণে যাওয়া শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ স্থাপন করবে এবং দেশে ফিরে আসার পর তাদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান ও গবেষণা-ভিত্তিক পদ সৃষ্টিতে সহায়তা করবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং BANBEIS-এর যৌথ উদ্যোগে একটি 'মেধা ডেটাবেজ' তৈরি করতে হবে, যেখানে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণকারী বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের তথ্য সংরক্ষণ করা হবে এবং তাদের অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতাকে কাজে লাগানোর জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা (যেমন: বিশেষায়িত গবেষণা ল্যাব স্থাপন, স্টার্টআপ ফান্ডিং) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. জহিরুল ইসলাম

ড. জহিরুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্রেন ড্রেন ও মেধা পাচার। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator