খাদ্য ভেজাল ও বিএসটিআই: মানহীনতার জালে জনস্বাস্থ্য | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

খাদ্য ভেজাল ও বিএসটিআই: মানহীনতার জালে জনস্বাস্থ্য

ফারজানা আহমেদ  avatar   
ফারজানা আহমেদ
খাদ্য ভেজাল ও বিএসটিআই: মানহীনতার জালে জনস্বাস্থ্য
খাদ্য ভেজাল ও বিএসটিআই: মানহীনতার জালে জনস্বাস্থ্য
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের খাদ্য বাজারে ভেজাল এখন এক ভয়াবহ বাস্তবতা, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব ঘাতক হিসেবে কাজ করছে। ফলমূল থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাত খাবার, দুধ, এমনকি পা...

বাংলাদেশের খাদ্য বাজারে ভেজাল এখন এক ভয়াবহ বাস্তবতা, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য নীরব ঘাতক হিসেবে কাজ করছে। ফলমূল থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাত খাবার, দুধ, এমনকি পানীয় পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি খাদ্যদ্রব্যে ভেজাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি জনজীবনকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি বছর বিশ্বে প্রায় ৬০ কোটি মানুষ ভেজাল ও দূষিত খাদ্য গ্রহণের কারণে অসুস্থ হয়, যার মধ্যে ৪ লাখ ৪২ হাজার মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশেও প্রতি বছর প্রায় ৩ কোটি মানুষ খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হন, যার প্রধান কারণ খাদ্যে ভেজাল, রাসায়নিকের অপব্যবহার এবং অস্বাস্থ্যকর প্রস্তুত প্রক্রিয়া। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) সহ বিভিন্ন সরকারি সংস্থা কাজ করলেও, ভেজালের লাগাম টেনে ধরা কঠিন হয়ে পড়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন অভিযানে খাদ্যে ভেজালের alarming চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে বিএসটিআই বাজার থেকে সংগৃহীত ১ হাজার ৬টি নমুনার মধ্যে ৭৫০টি পরীক্ষা করে ৪৯টি পণ্যেই নিম্নমান বা ভেজাল পেয়েছে। এসব পণ্যের মধ্যে মুড়ি, চানাচুর, সেমাই, লবণ, সরিষার তেল, হলুদের গুঁড়া, সস, কেক এবং চিপস-এর মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য রয়েছে। এছাড়াও, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের পরীক্ষার প্রতিবেদনে দৈনন্দিন খাবারে বিষাক্ত উপাদানের ভয়াবহ উপস্থিতি প্রকাশ পেয়েছে। বিশেষ করে, বরিশাল থেকে সংগ্রহ করা মিল্ক পাউডারের নমুনায় সিসা শনাক্ত হয়েছে, যা শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয়ের জন্যই অত্যন্ত উদ্বেগজনক। Journal of Food Composition and Analysis-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের বাজারে প্রাপ্ত চিনির অধিকাংশ নমুনায় মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। এমনকি ঢাকা ওয়াসার পানিতেও ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এমন রাসায়নিক 'পিফাস' ধরা পড়েছে। সম্প্রতি, পাউরুটিতে ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান পটাশিয়াম ব্রোমেটের ব্যবহার বন্ধের প্রশ্নে হাইকোর্ট রুল জারি করেছেন, যা বেকারি পণ্যের মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। র‍্যাব এবং জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের যৌথ অভিযানে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় নকল শিশু খাদ্য উৎপাদনের দায়ে একটি প্রতিষ্ঠানকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে এবং ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহারের প্রমাণ মিলেছে। একইরকমভাবে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে চট্টগ্রামের মধুবন সুইটসকে ৩ লাখ টাকা এবং হোসেন ফুড কোম্পানীকে ২ লাখ টাকা জরিমানা করা হয় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদন ও নানা অনিয়মের অভিযোগে।

খাদ্য মান নিয়ন্ত্রণে বিএসটিআই একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হলেও, এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংস্থাটির প্রশাসনিক অনিয়ম, ব্যক্তি সখ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে পদোন্নতি ও বদলি, এবং চট্টগ্রাম, বরিশাল, রাজশাহী ও রংপুর বিভাগীয় অফিসের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবসায়ী হয়রানি ও অনৈতিক অর্থ আদায়ের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ২০২২ সালে বিএসটিআইয়ের ৩০০ কোটি টাকার দুর্নীতি ঢাকতে মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তার জড়িত থাকার অভিযোগ তুলেছিলেন। পণ্য সংখ্যা বাড়লেও বিএসটিআইয়ের মান নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতা বাড়ছে না। বর্তমানে বাধ্যতামূলক মান সনদের আওতাভুক্ত পণ্যের সংখ্যা ২৭৬টি হলেও, এসব পণ্যের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে কার্যকর তদারকির অভাব রয়েছে। এছাড়া, নিয়ন্ত্রক সংস্থার নজরদারির অভাবে অনেকে বিএসটিআইয়ের লোগো ছাপিয়ে মানহীন পণ্য বাজারজাত করছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পরিচালিত অভিযানও অনেক সময় বাধার সম্মুখীন হয়, যেমনটি হয়েছিল ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে বসুন্ধরা সিটি শপিং মলে।

বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল রোধে 'নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩' সহ একাধিক আইন ও অধ্যাদেশ বিদ্যমান রয়েছে, যেখানে ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান আছে। তবে, আইনের কঠোর প্রয়োগের অভাবে অপরাধীরা প্রায়শই পার পেয়ে যায়। মোবাইল কোর্ট বা বিচ্ছিন্ন অভিযান দিয়ে ভেজাল রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না, কারণ অভিযান শেষ হওয়ার কিছুদিন পর পুরোনো অনিয়ম আবার ফিরে আসে। এর অন্যতম কারণ হলো সমস্যার মূল জায়গা – উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে কার্যকর নজরদারির অভাব। এছাড়াও, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবও একটি বড় সমস্যা। অসাধু ব্যবসায়ীরা অতি মুনাফার লোভে খাদ্যে বিষাক্ত রাসায়নিক ও ভারী ধাতু মেশাচ্ছে, যা মানবস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই ভেজাল খাদ্যের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের জটিলতা, হৃদরোগ, হরমোনজনিত সমস্যা এবং শিশুদের বিকাশজনিত সমস্যা বাড়ছে।

এই নীরব ঘাতকের কারণে বাংলাদেশে ৪৫ লাখ মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে। প্রতি বছর ৩ লাখের বেশি মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে, দেড় লাখ ডায়াবেটিস এবং ২ লাখ কিডনি রোগে আক্রান্ত হচ্ছে ভেজাল খাদ্য খেয়ে। শিশুদের জন্য এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ, কারণ তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তারা সহজেই বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবারকে নীরব ঘাতক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা অপরিহার্য।

সুপারিশ: খাদ্য ভেজাল রোধে এবং বিএসটিআই-এর কার্যকারিতা বাড়াতে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা যেতে পারে: প্রথমত, বিএসটিআই এবং অন্যান্য তদারকি সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও অনিয়ম দূরীকরণে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩-এর যথাযথ ও কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা হবে, শুধুমাত্র জরিমানা করে ছেড়ে দেওয়া হবে না। তৃতীয়ত, উৎপাদন থেকে শুরু করে ভোক্তার হাত পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কার্যকর ও নিয়মিত নজরদারি বাড়াতে হবে এবং এ জন্য প্রয়োজনীয় জনবল ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। চতুর্থত, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় সাধন করতে হবে, যাতে ভেজালবিরোধী অভিযানগুলো আরও ফলপ্রসূ হয়। পঞ্চমত, খাদ্যের মান যাচাইয়ের জন্য আধুনিক ও অ্যাক্রেডিটেড ল্যাবের সংখ্যা বাড়ানো এবং বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা ও জরিপের মাধ্যমে খাদ্যের নিরাপদতার সঠিক চিত্র তুলে ধরা প্রয়োজন। পরিশেষে, জনসচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা চালাতে হবে, যাতে ভোক্তারা ভেজাল পণ্য চিনতে ও বর্জন করতে পারে এবং তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হয়।


🔎 অনুসন্ধানে: ফারজানা আহমেদ

ফারজানা আহমেদ, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: খাদ্য ভেজাল ও বিএসটিআই (BSTI) ওয়াচ।

Tidak ada komentar yang ditemukan


News Card Generator