স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় মহোৎসব | আই নিউজ বিডি

স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় মহোৎসব

রেহনুমা তাবাসসুম  avatar   
রেহনুমা তাবাসসুম
স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় মহোৎসব
স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় মহোৎসব
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত, যা দেশের কোটি মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত, তা আজ দুর্নীতির এক গভীর চক্রে আবর্তিত। চিকিৎসা সরঞ্জাম ও...

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত, যা দেশের কোটি মানুষের মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্বে নিয়োজিত, তা আজ দুর্নীতির এক গভীর চক্রে আবর্তিত। চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় অনিয়ম, অতিরিক্ত মূল্য ধার্য এবং নিম্নমানের পণ্য সরবরাহের অভিযোগ এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই খাতের ১১টি প্রধান দুর্নীতির উৎস চিহ্নিত করা হয়েছে, যার মধ্যে কেনাকাটা, নিয়োগ, পদোন্নতি, বদলি, চিকিৎসাসেবা এবং ওষুধ সরবরাহ অন্যতম। এই দুর্নীতি শুধু আর্থিক ক্ষতিই করছে না, বরং দেশের স্বাস্থ্যসেবার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে জনস্বাস্থ্যকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

বিশেষ করে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটায় দুর্নীতির চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘ ১৫ বছরের বেশি সময় ধরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেনাকাটা নিয়ন্ত্রণ করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই সিন্ডিকেট একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বারবার কাজ পাইয়ে দেওয়া, কালো তালিকাভুক্ত হওয়ার পর কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে পুনরায় কাজ নেওয়া এবং বাজার মূল্যের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দামে নিম্নমানের চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহের মতো অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছে। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ছেলের নেতৃত্বে একটি দুষ্টচক্র কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। ২০১৯ সালে দুদক স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতির ১১টি উৎস চিহ্নিত করে ২৫ দফা সুপারিশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিলেও, দুই বছর পরেও অধিকাংশ সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি। এর ফলস্বরূপ, করোনা মহামারীর সময় মাস্ক, পিপিই, স্যানিটাইজার, আইসিইউ সরঞ্জাম, ভেন্টিলেটর এবং টেস্ট কিট সংগ্রহে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়ম উন্মোচিত হয়, যা জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করে। রিজেন্ট হাসপাতালের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় সুবিধা না থাকা সত্ত্বেও কোভিড চিকিৎসার অনুমতি পেয়েছিল এবং টেস্ট জালিয়াতির মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত ছিল।

দুর্নীতির এই চক্র শুধু কেনাকাটাতেই সীমাবদ্ধ নয়, এর জাল বিস্তৃত হয়েছে নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি এবং এমনকি চিকিৎসাসেবার মতো মৌলিক ক্ষেত্রেও। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে না থাকার প্রবণতা, নিয়োগ-বদলি-পদোন্নতিতে নীতিমালা লঙ্ঘন এবং স্বার্থান্বেষী মহলের অর্থ আদায় একটি নিয়মিত ঘটনা। এছাড়া, হাসপাতালের কর্মচারীরা স্থানীয় দালালদের সাথে যোগসাজশে অসহায় রোগীদের কাছ থেকে অবৈধভাবে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করে। সরকারি হাসপাতালে নির্ধারিত ওষুধ থাকা সত্ত্বেও অনেক সময় রোগীদের তা দেওয়া হয় না, বরং কালোবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয় এবং রেজিস্টারে হিসাব মিলিয়ে রাখা হয়। প্রশিক্ষিত জনবল না থাকা সত্ত্বেও অপ্রয়োজনীয় ও দামি যন্ত্রপাতি কিনে ফেলে রাখা হয়, যা পরবর্তীতে অব্যবহৃত অবস্থায় মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে যায়, ফলে সরকারি অর্থের অপচয় হয়। সম্প্রতি, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২৪ কোটি টাকার ওষুধ কেনাকাটায় চার কোটি টাকার বেশি লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে হাসপাতালের পরিচালকসহ একটি সিন্ডিকেট জড়িত বলে জানা গেছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, স্বাস্থ্য খাতের প্রতিটি স্তরে দুর্নীতির শিকড় গভীরে প্রোথিত।

এই ব্যাপক দুর্নীতির কারণে দেশের স্বাস্থ্যসেবার মান তলানিতে ঠেকেছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের অর্থ অব্যয়িত থাকার হার অনেক বেশি, এবং চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে প্রকল্প বাস্তবায়নের হার মাত্র ৫.০৬ শতাংশ। এর ফলে প্রতি বছর প্রায় ৮ লাখ রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, স্বাস্থ্য খাতে ব্যয়ের ৭৩ শতাংশই জনগণকে নিজেদের পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ। দুদক বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করলেও, অনেক ক্ষেত্রেই মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। ঠিকাদার মোতাজ্জেরুল ইসলাম ওরফে মিঠুর মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা বিদেশে বসেই স্বাস্থ্য খাত নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে, যার বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত চলমান। সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে, স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি একটি কাঠামোগত সমস্যা, যা রাজনৈতিক প্রভাব এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে আরও শক্তিশালী হচ্ছে।

স্বাস্থ্য খাতের এই ভঙ্গুর অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কঠোর পদক্ষেপ অপরিহার্য। দুর্নীতিগ্রস্ত এই খাতকে ঢেলে সাজাতে না পারলে জনকল্যাণমুখী স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা অসম্ভব। বাজেট বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি তার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা অত্যন্ত জরুরি। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা প্রয়োজন।

সুপারিশ: স্বাস্থ্য খাতের সকল প্রকার কেনাকাটা, বিশেষ করে চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ ক্রয়ে একটি স্বাধীন, বিশেষজ্ঞ কমিটি দ্বারা কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। এই কমিটিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, দুদক, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর এবং নিরপেক্ষ কারিগরি বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্তি অত্যাবশ্যক। সকল দরপত্র প্রক্রিয়া ই-জিপির মাধ্যমে সম্পন্ন করা এবং ক্রয়কৃত পণ্যের মান ও মূল্য যাচাইয়ের জন্য তৃতীয় পক্ষের অডিট বাধ্যতামূলক করতে হবে। এছাড়া, দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত সকল স্তরের কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের সদস্যদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অনিয়ম করার সাহস না পায়।

📎 এই প্রতিবেদনের তথ্যপ্রমাণ

গুগল সার্চের মাধ্যমে এই প্রতিবেদনের গবেষণায় ব্যবহৃত প্রকৃত সোর্স:


🔎 অনুসন্ধানে: রেহনুমা তাবাসসুম

রেহনুমা তাবাসসুম, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: স্বাস্থ্য খাত, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও ওষুধ কেনাকাটা।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator