তিস্তার পানি বণ্টন: আঞ্চলিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের কৌশল ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

তিস্তার পানি বণ্টন: আঞ্চলিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের কৌশল ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ

সায়েম মালিক  avatar   
সায়েম মালিক
তিস্তার পানি বণ্টন: আঞ্চলিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের কৌশল ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
তিস্তার পানি বণ্টন: আঞ্চলিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের কৌশল ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ
ছবি: সংগৃহীত
গত শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানি প্রবাহ সর্বনিম্ন মাত্রায় নেমে আসায় রংপুর অঞ্চলের প্রায় ১.১০ লক্ষ হেক্টর আবাদি জমির সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্...

গত শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে পানি প্রবাহ সর্বনিম্ন মাত্রায় নেমে আসায় রংপুর অঞ্চলের প্রায় ১.১০ লক্ষ হেক্টর আবাদি জমির সেচ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, যা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই পরিস্থিতি আবারও আঞ্চলিক কূটনীতিতে তিস্তার পানি বণ্টনের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য কতটা সংবেদনশীল ও অপরিহার্য, তা স্পষ্ট করে তুলেছে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা এই সমস্যার সমাধানে বাংলাদেশের কৌশল ও ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জগুলো এখন নতুন করে বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনা decades ধরে চললেও, পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা মূলত দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিলে সীমাবদ্ধ রয়েছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের উচ্চ-পর্যায়ের বৈঠকগুলোতে নিয়মিতভাবে বিষয়টি উত্থাপন করা হয়। তবে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ভিন্ন অবস্থান, এই চুক্তি সম্পাদনে প্রধান বাধা হিসেবে কাজ করছে। তিস্তা অববাহিকার কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে এই অনিশ্চয়তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী; বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এর গবেষণায় দেখা গেছে, তিস্তা সেচ প্রকল্পের অধীনে থাকা জমিতে সেচ সংকটের কারণে বোরো ধানের উৎপাদন ৫০% পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে। কৃষকদের জন্য বিকল্প ফসল বা সেচ পদ্ধতির প্রচলন এখনো পর্যাপ্ত মাত্রায় হয়নি, যা এই অঞ্চলের জীবন-জীবিকাকে আরও ভঙ্গুর করে তুলছে।

ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তন এবং উজানের বাঁধ নির্মাণ অন্যতম। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়ার হার পরিবর্তন এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে তিস্তার স্বাভাবিক প্রবাহে দীর্ঘমেয়াদী পরিবর্তন আসার পূর্বাভাস রয়েছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০৫০ সাল নাগাদ শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার গড় প্রবাহ বর্তমানের চেয়ে ২০-২৫% কমে যেতে পারে। একই সাথে, ভারতের অভ্যন্তরে বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও মাঝারি আকারের জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এবং সেচ অবকাঠামো নির্মাণ তিস্তার উজানে পানির প্রবাহকে আরও নিয়ন্ত্রণ করছে, যা বাংলাদেশের জন্য প্রতিকূল পরিস্থিতি তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে, শুধু দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক ফোরামগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার গুরুত্ব তুলে ধরা বাংলাদেশের জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর তত্ত্বাবধানে শুষ্ক সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন এবং উন্নত সেচ প্রযুক্তি যেমন ড্রিপ ইরিগেশন ও স্প্রিংকলার ব্যবহারের সম্প্রসারণের উপর জোর দেওয়া হচ্ছে, যা তিস্তার পানির উপর নির্ভরশীলতা কমাতে সাহায্য করতে পারে।

বছর তিস্তা ব্যারাজ পয়েন্টে গড় শুষ্ক মৌসুমের প্রবাহ (কিউসেক) তিস্তা সেচ প্রকল্পের আওতাধীন সেচিত জমি (লক্ষ হেক্টর) সেচ সংকটের কারণে বোরো ধানের ফলন হ্রাস (শতকরা)
২০১৪-১৫ ৬,৫০০ ১.১৫ ১৫%
২০১৮-১৯ ৪,০০০ ১.১০ ৩০%
২০২২-২৩ ২,১০০ ০.৯০ ৫০%

উৎস: পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে আঞ্চলিক কূটনীতিতে তিস্তার পানি বণ্টন ইস্যুকে দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (SAARC) এবং বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন (BIMSTEC) এর মতো বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোতে আরও সক্রিয়ভাবে উত্থাপন করতে হবে, যেখানে জলবায়ু পরিবর্তন ও আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনার উপর আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালার প্রয়োগের দাবি জানানো যেতে পারে।
  • পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) যৌথভাবে তিস্তা অববাহিকার কৃষকদের জন্য 'জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রকল্প' চালু করবে, যেখানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) কর্তৃক উদ্ভাবিত খরা-সহনশীল ফসল, যেমন - স্বল্প-পানি গ্রহণকারী ধান ও ভুট্টা চাষের প্রযুক্তিগত সহায়তা ও প্রণোদনা প্রদান করা হবে, এবং ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০,০০০ হেক্টর জমিতে আধুনিক সেচ প্রযুক্তি (যেমন ড্রিপ ইরিগেশন) বাস্তবায়ন করা হবে।
  • পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে তিস্তার পানির প্রবাহ হ্রাসের পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের জন্য একটি উচ্চ-পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করতে হবে এবং ২০২৬ সালের মধ্যে একটি 'তিস্তা অববাহিকা পরিবেশ পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা' প্রণয়ন করতে হবে, যা উজানের দেশগুলোর উপর আন্তর্জাতিক পরিবেশগত বাধ্যবাধকতা আরোপের জন্য কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টিতে সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সায়েম মালিক

সায়েম মালিক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator