ইস্পাত শিল্পে কাঁচামাল সংকট: স্ক্র্যাপ আমদানিতে ডলারের চাপ ও বিকল্প ভাবনা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ইস্পাত শিল্পে কাঁচামাল সংকট: স্ক্র্যাপ আমদানিতে ডলারের চাপ ও বিকল্প ভাবনা

আলতাফ হোসেন  avatar   
আলতাফ হোসেন
ইস্পাত শিল্পে কাঁচামাল সংকট: স্ক্র্যাপ আমদানিতে ডলারের চাপ ও বিকল্প ভাবনা
ইস্পাত শিল্পে কাঁচামাল সংকট: স্ক্র্যাপ আমদানিতে ডলারের চাপ ও বিকল্প ভাবনা
ছবি: সংগৃহীত
চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৩) ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল স্ক্র্যাপ আমদানিতে ডলার সংকটের কারণে প্রায় ৩০% হ্রাস পেয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের...

চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৩) ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল স্ক্র্যাপ আমদানিতে ডলার সংকটের কারণে প্রায় ৩০% হ্রাস পেয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক আমদানিতে কঠোরতা আরোপ এবং ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধির ফলে এই শিল্পে প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলারের অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে, যা দেশের অবকাঠামো উন্নয়ন ও নির্মাণ খাতের মেরুদণ্ড ইস্পাত উৎপাদনকে সরাসরি প্রভাবিত করছে। দেশের শীর্ষস্থানীয় ইস্পাত উৎপাদক বিএসআরএম (BSRM) ও আরএসআরএম (RSRM) সহ অনেক প্রতিষ্ঠানই প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহে হিমশিম খাচ্ছে, যার ফলস্বরূপ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে এবং বাজারে ইস্পাতের মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ইস্পাত শিল্পের প্রধান কাঁচামাল হলো ফেরাস স্ক্র্যাপ, যার প্রায় ৯০-৯৫ শতাংশই আমদানি নির্ভর। বৈশ্বিক বাজারে স্ক্র্যাপের মূল্য বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, উভয়ই আমদানির ব্যয় বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (IMF) সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর চাপ আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে, যা ইস্পাত শিল্পের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। World Bank এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং উচ্চ সুদের হার আমদানিনির্ভর দেশগুলোর জন্য কাঁচামাল সংগ্রহকে আরও কঠিন করে তুলছে। এই পরিস্থিতিতে, স্থানীয় ব্যাংকগুলো লেটার অব ক্রেডিট (LC) খুলতে অনীহা দেখাচ্ছে, অথবা উচ্চ মার্জিন দাবি করছে, যা ছোট ও মাঝারি ইস্পাত উৎপাদকদের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে, দেশের নির্মাণ খাত, যেখানে ইস্পাতের ব্যবহার অপরিহার্য, সেখানে প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব এবং ব্যয় বৃদ্ধির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

ডলার সংকটের কারণে স্ক্র্যাপ আমদানি হ্রাস পাওয়ার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ছে দেশের ইস্পাত উৎপাদন সক্ষমতার ওপর। দেশের বার্ষিক ইস্পাত উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৯-১০ মিলিয়ন টন হলেও, কাঁচামালের অভাবে বর্তমানে তা ৫-৬ মিলিয়ন টনের বেশি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। এই উৎপাদন ঘাটতি দেশের বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প যেমন পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, এবং বিভিন্ন অর্থনৈতিক জোনের নির্মাণ কাজকে মন্থর করে দিচ্ছে। শুধু তাই নয়, স্থানীয় বাজারে ইস্পাতের সরবরাহ কমে যাওয়ায় এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতি টন রডের মূল্য গত এক বছরে প্রায় ১৫-২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি আবাসন শিল্প এবং সাধারণ ভোক্তাদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। Asian Development Bank (ADB) তাদের সর্বশেষ অর্থনৈতিক আপডেটে উল্লেখ করেছে যে, উৎপাদন খাতের কাঁচামাল আমদানিতে সৃষ্ট বাধা বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধিকে সম্ভাব্য ৪.৫% থেকে ৫.০% এর নিচে নামিয়ে আনতে পারে, যেখানে ইস্পাত শিল্প একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এই সংকট মোকাবেলায় সরকার এবং শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বিকল্প ভাবনা অত্যন্ত জরুরি। অভ্যন্তরীণভাবে স্ক্র্যাপ সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া একটি টেকসই সমাধান হতে পারে। বর্তমানে, দেশের মোট স্ক্র্যাপ চাহিদার মাত্র ৫-১০% স্থানীয় উৎস থেকে সংগ্রহ করা হয়। এছাড়াও, সরাসরি হ্রাসকৃত লোহা (Direct Reduced Iron - DRI) বা হট ব্রিকুয়েটেড আয়রন (Hot Briquetted Iron - HBI) এর মতো বিকল্প কাঁচামাল ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন, যা প্রাকৃতিক গ্যাস বা কয়লা ব্যবহার করে উৎপাদিত হতে পারে। যদিও এই প্রক্রিয়াগুলো প্রাথমিক বিনিয়োগ সাপেক্ষ, দীর্ঘমেয়াদে এটি আমদানিনির্ভরতা কমাতে এবং ডলারের ওপর চাপ লাঘব করতে সহায়ক হবে। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত শিল্প নীতিমালায় পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়া এবং কাঁচামালের বৈচিত্র্যকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হলে এই শিল্পে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।

বছর মোট ইস্পাত স্ক্র্যাপ আমদানি (মিলিয়ন টন) আমদানি মূল্য (বিলিয়ন মার্কিন ডলার) দেশীয় স্ক্র্যাপ সংগ্রহ (%) ইস্পাত উৎপাদন (মিলিয়ন টন)
২০২০-২১ ৪.৫ ১.৭৫ ৮ ৬.০
২০২১-২২ ৫.২ ২.৫০ ৭ ৭.৫
২০২২-২৩ ৩.৮ ২.২০ ১০ ৫.৫
২০২৩-২৪ (প্রক্ষেপিত) ২.৫ ১.৭০ ১২ ৪.০

উৎস: বাংলাদেশ স্টিল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন (BSMA) এবং বাংলাদেশ ব্যাংক রিপোর্ট

সুপারিশ

  • বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে ইস্পাত শিল্পের কাঁচামাল স্ক্র্যাপ আমদানিতে ডলারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার জন্য একটি বিশেষ তহবিল গঠন করতে পারে এবং এলসি খোলার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে অগ্রাধিকারমূলক নির্দেশনা প্রদান করতে পারে।
  • শিল্প মন্ত্রণালয় একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রণয়ন করে দেশীয় স্ক্র্যাপ সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহারের জন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলোকে (SMEs) প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং আর্থিক প্রণোদনা প্রদান করতে পারে, যাতে আগামী পাঁচ বছরে স্থানীয় উৎস থেকে স্ক্র্যাপের সরবরাহ কমপক্ষে ২৫% বৃদ্ধি পায়।
  • জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (NBR) ইস্পাত শিল্পের জন্য ব্যবহৃত বিকল্প কাঁচামাল যেমন DRI/HBI আমদানিতে শুল্ক ও কর সুবিধা প্রদান করতে পারে এবং এই ধরনের প্রযুক্তি স্থাপনে আগ্রহী উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষ বিনিয়োগ প্রণোদনা ঘোষণা করতে পারে, যা দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে উৎসাহিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: আলতাফ হোসেন

আলতাফ হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ভারী শিল্প, ইস্পাত ও সিমেন্ট। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator