প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: 'যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন' নাকি পরীক্ষাবিহীন অনিশ্চয়তা? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: 'যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন' নাকি পরীক্ষাবিহীন অনিশ্চয়তা?

কাজী মাকসুদুল হক  avatar   
কাজী মাকসুদুল হক
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: 'যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন' নাকি পরীক্ষাবিহীন অনিশ্চয়তা?
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: 'যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন' নাকি পরীক্ষাবিহীন অনিশ্চয়তা?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রবর্তিত নতুন শিক্ষাক্রম, বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে প্রথাগত পরীক্ষা পদ্ধতি থেকে সরে এসে 'যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায...

সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রবর্তিত নতুন শিক্ষাক্রম, বিশেষ করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে প্রথাগত পরীক্ষা পদ্ধতি থেকে সরে এসে 'যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন' পদ্ধতি চালুর ঘোষণা, দেশব্যাপী শিক্ষা সংশ্লিষ্ট মহলে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। ২০২২ সাল থেকে ধাপে ধাপে বাস্তবায়িত এই কারিকুলামে প্রথম, দ্বিতীয় এবং ষষ্ঠ, সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য পাবলিক পরীক্ষা বাদ দিয়ে শ্রেণিকক্ষে ধারাবাহিক মূল্যায়নের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক প্রণীত এই যুগান্তকারী পরিবর্তন একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের মুখস্থ-নির্ভরতা কমিয়ে বাস্তব দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি শিক্ষক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো এবং মূল্যায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করছে। বিশেষত, ২০২৪ শিক্ষাবর্ষে প্রথম, তৃতীয়, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম ও নবম শ্রেণিতে নতুন কারিকুলাম কার্যকর হওয়ায় এবং ২০২৫ সালের মধ্যে সকল শ্রেণিতে এর পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করায়, এই পদ্ধতির কার্যকারিতা ও দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ অপরিহার্য।

এই নতুন শিক্ষাক্রমের মূল দর্শন হলো শিক্ষার্থীদের শিখনফলকে শুধুমাত্র জ্ঞান অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে তাদের বাস্তব জীবনের সমস্যা সমাধানে সক্ষম করে তোলা, যা জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এর লক্ষ্যমাত্রার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। প্রচলিত পরীক্ষা পদ্ধতিতে যেখানে শিক্ষার্থীরা নম্বরের পেছনে ছুটতো, সেখানে যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়নে শিক্ষার্থীর জ্ঞান, দক্ষতা, দৃষ্টিভঙ্গি এবং মূল্যবোধের সামগ্রিক বিকাশকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে, মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। অনেক শিক্ষকই নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পাননি, যার ফলে শ্রেণিকক্ষে কার্যকর যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন প্রক্রিয়া ব্যাহত হচ্ছে। ব্যুরো অব নন-ফরমাল এডুকেশন স্ট্যাটিস্টিক্স (BANBEIS) এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৩৫% প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং ২৮% মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক এখনো নতুন কারিকুলামের উপর প্রয়োজনীয় দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ পাননি, যা এই পদ্ধতির সফল বাস্তবায়নে বড় বাধা। শিক্ষকদের উপর মূল্যায়নের বাড়তি চাপ এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও উপকরণের অভাবও একটি প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই পরিস্থিতি শিক্ষার্থীদের প্রকৃত যোগ্যতা পরিমাপের পরিবর্তে শিক্ষকদের ব্যক্তিগত মতামতের উপর নির্ভরশীল করে তুলতে পারে, যা মূল্যায়নের নিরপেক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।

অন্যদিকে, উচ্চশিক্ষার প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) তাদের অধীনস্থ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রে মাধ্যমিক পর্যায়ের এই নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি থেকে প্রাপ্ত ফলাফলের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে এখনো কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেয়নি। যেহেতু নতুন পদ্ধতিতে কোনো সনাতন 'নম্বরপত্র' বা 'গ্রেড পয়েন্ট এভারেজ' থাকবে না, তাই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কীভাবে শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাই করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর তাদের পলিটেকনিক ও কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়নের প্রাপ্ত ফলাফলকে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত করবে, তা নিয়েও স্পষ্ট রূপরেখার অভাব রয়েছে। এই অনিশ্চয়তা শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের ভীতি ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে, কারণ তাদের ভবিষ্যৎ উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনের পথ এই মূল্যায়নের উপর অনেকটাই নির্ভরশীল। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে এই বিষয়ে দ্রুত সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে, যাতে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সময় মতো প্রস্তুতি নিতে পারে এবং শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা দূর হয়। অন্যথায়, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের এই সংস্কার উচ্চশিক্ষার সাথে একটি বিচ্ছিন্নতা তৈরি করতে পারে, যা সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্য শুভকর হবে না।

শিক্ষাবর্ষ শ্রেণি নতুন কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত শিক্ষক প্রশিক্ষণের হার (আনুমানিক)
২০২২ প্রথম, দ্বিতীয়, ষষ্ঠ, সপ্তম হ্যাঁ ৬২%
২০২৩ প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, সপ্তম হ্যাঁ ৬৭%
২০২৪ প্রথম, তৃতীয়, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, নবম হ্যাঁ ৭২%
২০২৫ (লক্ষ্যমাত্রা) সকল শ্রেণি হ্যাঁ ১০০%

উৎস: শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ব্যানবেইস (২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিক পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী)

সুপারিশ

  • শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের সাথে সমন্বয় করে যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়নের একটি সুস্পষ্ট ও সর্বজনীন মানদণ্ড তৈরি করতে হবে, যা দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অভিন্নভাবে বাস্তবায়নযোগ্য হবে এবং শিক্ষকদের জন্য বিস্তারিত গাইডলাইন ও অনলাইন প্রশিক্ষণ মডিউল বাধ্যতামূলক করতে হবে।
  • বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) কে দ্রুত একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি গঠন করে নতুন কারিকুলামের যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়নের ফলাফলকে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তির ক্ষেত্রে কীভাবে মানসম্মত উপায়ে বিবেচনা করা যায়, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও পদ্ধতি প্রণয়ন করতে হবে, যা ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের পূর্বেই কার্যকর হবে।
  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং BANBEIS এর যৌথ উদ্যোগে যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়নের উপর শিক্ষকদের নিয়মিত দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ (CPD) কর্মসূচি চালু করতে হবে, যেখানে ব্যবহারিক কর্মশালা ও পর্যবেক্ষণমূলক ফিডব্যাক সেশনের মাধ্যমে শিক্ষকদের মূল্যায়ন কৌশল উন্নত করা হবে এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কাজী মাকসুদুল হক

কাজী মাকসুদুল হক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Tidak ada komentar yang ditemukan


News Card Generator