ভাঙা জাহাজের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ভাঙা জাহাজের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা

জাহাঙ্গীর আলম  avatar   
জাহাঙ্গীর আলম
ভাঙা জাহাজের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
ভাঙা জাহাজের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: পরিবেশ সুরক্ষায় বাংলাদেশের চ্যালেঞ্জ ও সম্ভাবনা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত 'ব্রেকিং দ্য সার্কেল: ইমপ্রুভিং শিপ রিসাইক্লিং ইন বাংলাদেশ' শীর্ষক প্রতিবেদনে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে জাহাজ ভাঙা শিল্পের...

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত 'ব্রেকিং দ্য সার্কেল: ইমপ্রুভিং শিপ রিসাইক্লিং ইন বাংলাদেশ' শীর্ষক প্রতিবেদনে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকূলে জাহাজ ভাঙা শিল্পের পরিবেশগত ঝুঁকি এবং এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা পুনরায় সামনে এনেছে। এই প্রতিবেদন শুধু দেশের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ এই খাতের বর্তমান অবস্থাকেই তুলে ধরেনি, বরং পরিবেশ সুরক্ষা ও শ্রমিকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবেলায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জগুলোকেও বিশেষভাবে চিহ্নিত করেছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে যে, বছরে প্রায় ২.৬ মিলিয়ন টন স্টিল ও অন্যান্য ধাতু পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে দেশের ইস্পাত শিল্পের কাঁচামালের প্রায় ৫০-৬০% যোগান দেওয়া এই খাত, একই সাথে বিপুল পরিমাণ বিপজ্জনক বর্জ্য, যেমন – অ্যাসবেস্টস, হেভি মেটাল, পিএচসি ও তেল জাতীয় পদার্থ পরিবেশে নিঃসরণ করছে, যার কারণে সমুদ্র ও উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প, যা মূলত চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপকেন্দ্রিক, বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত জাহাজ পুনর্ব্যবহারের একটি অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। প্রতি বছর শত শত পুরাতন জাহাজ এখানে আসে তাদের শেষ গন্তব্যে। এই শিল্প দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও, এর বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পদ্ধতি অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ। পুরাতন জাহাজে থাকা অ্যাসবেস্টস, পলিক্ষ্লোরিনেটেড বাইফিনাইল (PCBs), ভারী ধাতু যেমন সীসা, ক্যাডমিয়াম, পারদ এবং তেল ও তৈলাক্ত পদার্থ (oil sludge) সরাসরি মাটি ও পানিতে মিশে যায়। এতে উপকূলীয় পরিবেশ, বিশেষ করে ম্যানগ্রোভ বন, মাছের প্রজনন ক্ষেত্র এবং স্থানীয় পানীয় জলের উৎস মারাত্মকভাবে দূষিত হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE) কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন গবেষণায় সীতাকুণ্ডের উপকূলীয় মাটির নমুনায় স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ক্যাডমিয়াম ও সীসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে, যা মানবস্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদী হুমকি সৃষ্টি করছে। শ্রমিকদের সুরক্ষামূলক সরঞ্জাম ছাড়া বিপজ্জনক বর্জ্য হ্যান্ডলিংয়ের কারণে ক্যান্সার, শ্বাসকষ্ট এবং চর্মরোগের মতো স্বাস্থ্যগত ঝুঁকিও বাড়ছে।

এই শিল্পের পরিবেশগত চ্যালেঞ্জগুলো বহুমাত্রিক হলেও, এর অর্থনৈতিক গুরুত্বকে অস্বীকার করা যায় না। বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে শিল্প মন্ত্রণালয়, এই খাতকে একটি শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং এর আধুনিকায়নে কিছু উদ্যোগও গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিকভাবে 'হংকং কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড রিসাইক্লিং অফ শিপস' (হংকং কনভেনশন) স্বাক্ষরিত হলেও, এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে। বাংলাদেশ সরকার হংকং কনভেনশন অনুসমর্থন করেছে, কিন্তু এর শর্তাবলী মেনে জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডগুলোর আধুনিকায়ন এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণে ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে, বিপজ্জনক বর্জ্য সংরক্ষণের জন্য আধুনিক ফ্যাসিলিটিজ, যেমন – HazMat (Hazardous Materials) ডাম্পিং সাইট এবং বিপজ্জনক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ প্লান্টের অভাব প্রকট। এর ফলে, World Bank এবং ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই খাতে টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষার জন্য প্রযুক্তিগত সহায়তা এবং আর্থিক বিনিয়োগের প্রস্তাব দিলেও, সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন এখনো সীমিত। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এই শিল্পের পরিবেশগত ও শ্রম নিরাপত্তার মান উন্নয়নে বিভিন্ন বিধিমালা প্রণয়ন করলেও, মাঠ পর্যায়ে তদারকি ও প্রয়োগের দুর্বলতা বিদ্যমান।

বর্জ্যের প্রকার পরিমাণ (আনুমানিক) পরিবেশগত প্রভাব উৎস
স্টিল ও অন্যান্য ধাতু ২.৬ মিলিয়ন টন/বছর পুনর্ব্যবহারযোগ্য কাঁচামাল, কিন্তু প্রক্রিয়াকরণে দূষণ বিশ্বব্যাংক, শিপ রিসাইক্লিং রিপোর্ট (২০২৩)
অ্যাসবেস্টস ৮,০০০-১০,০০০ টন/বছর বায়ু ও জল দূষণ, ক্যান্সার ঝুঁকি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর
তেল ও তৈলাক্ত পদার্থ (Oil Sludge) ২৫,০০০-৩০,০০০ টন/বছর সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি, মাটি ও জল দূষণ পরিবেশ অধিদপ্তর, স্থানীয় গবেষণা
ভারী ধাতু (সীসা, ক্যাডমিয়াম, পারদ) অনির্দিষ্ট, কিন্তু ব্যাপক মাটি, জল ও খাদ্যশৃঙ্খলে দূষণ; মানবস্বাস্থ্যে ঝুঁকি বিশ্বব্যাংক, স্থানীয় গবেষণা

উৎস: বিশ্বব্যাংক (২০২৩), বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর (বিভিন্ন সমীক্ষা), সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (শিল্প ও পরিবেশ)

সুপারিশ

  • শিল্প মন্ত্রণালয়কে দ্রুত 'হংকং কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড রিসাইক্লিং অফ শিপস' এর পূর্ণ বাস্তবায়নের জন্য একটি বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে প্রতিটি জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডের জন্য বিপজ্জনক বর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ ও সংরক্ষণের জন্য আধুনিক অবকাঠামো নির্মাণ বাধ্যতামূলক করা হবে এবং World Bank ও ADB-এর আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সহায়তা কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হবে।
  • পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ বিধিমালা, ১৯৯৭ এর আওতায় জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে উৎপন্ন বিপজ্জনক বর্জ্যের জন্য একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও প্রয়োগ করতে হবে, যার মাধ্যমে অ্যাসবেস্টস, PCB এবং ভারী ধাতুযুক্ত বর্জ্যের নিরাপদ অপসারণ ও নিষ্কাশন নিশ্চিত করা হবে।
  • শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে শ্রম আইন, ২০০৬ এবং বাংলাদেশ শ্রম বিধিমালা, ২০১৫ এর অধীনে জাহাজ ভাঙা শিল্পের শ্রমিকদের জন্য বাধ্যতামূলক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ এবং ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) ব্যবহারের কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষত বিপজ্জনক বর্জ্য হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ব্যবস্থা করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহাঙ্গীর আলম

জাহাঙ্গীর আলম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Комментариев нет


News Card Generator