বাংলাদেশের অফুরন্ত প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং হাজার বছরের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাতকে অপার সম্ভাবনার দুয়ারে দাঁড় করিয়েছে। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত, বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন, পার্বত্য অঞ্চলের নয়নাভিরাম দৃশ্য এবং অসংখ্য প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেশের পর্যটন শিল্পকে বিশ্ব দরবারে অনন্য স্থান দিতে পারতো। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই সম্ভাবনাময় খাতটি দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম ও উদাসীনতার এক কালো ছায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে। অভ্যন্তরীণ সিন্ডিকেট, সরকারি প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা এবং প্রত্নসম্পদ পাচারের মতো গুরুতর অপরাধ দেশের ঐতিহ্য ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
প্রত্নতত্ত্ব খাতের চিত্র অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দেশের অমূল্য প্রত্নসম্পদ চুরি ও পাচারের ঝুঁকিতে রয়েছে, বিশেষত সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই ঝুঁকি আরও বেড়েছে। মূল্যবান পাথরের মূর্তি ও শিল্পসম্পদ লুটপাট হয়ে দেশের বাইরে পাচার হচ্ছে, যার মধ্যে সীমান্ত এলাকা যেমন বালুরঘাট (ভারতের পশ্চিমবঙ্গ) এবং নওগাঁ প্রধান রুট হিসেবে চিহ্নিত। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নিষ্ক্রিয়তা এবং প্রত্নসম্পদ সুরক্ষায় প্রণীত আইনগুলোর যুগোপযোগী না হওয়া এই পাচার চক্রকে আরও উৎসাহিত করছে। উদাহরণস্বরূপ, বরিশালের লাকুটিয়া জমিদারবাড়ির মতো ঐতিহাসিক পুরাকীর্তিগুলো অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর থেকে দেয়াল নির্মাণের সুপারিশ করা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। এছাড়াও, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগও গুরুতর। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক ড. নাহিদ সুলতানার বিরুদ্ধে তহবিল আত্মসাৎ, অবৈধ পদোন্নতি এবং কর্মচারীদের প্রতি অমানবিক আচরণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। এমনকি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে অদক্ষ শ্রমিক ব্যবহার করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগ সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হলেও দৃশ্যত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি, বরং তদন্ত প্রক্রিয়া গোপন রাখার চেষ্টা চলছে বলে জানা গেছে। মহাস্থানগড়ের মতো সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় মাজার উন্নয়নের নামে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ এবং খনন কাজ চালিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন নষ্ট করার ঘটনাও ঘটছে, যা হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে চলছে।
পর্যটন খাতেও অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র হতাশাজনক। দেশের প্রধান পর্যটন গন্তব্য কক্সবাজারসহ অন্যান্য স্থানে স্থানীয় সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং পর্যটকদের হয়রানি একটি সাধারণ ঘটনা। হোটেল, যানবাহন ও খাবারের মূল্য প্রতিনিয়ত ওঠানামা করে, বিশেষ করে ছুটির দিনে পর্যটকদের কাছ থেকে বাড়তি টাকা আদায় করা হয়। সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের (বিপিসি) হোটেল ও মোটেলগুলো আকর্ষণীয় স্থানে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও লোকসান গুনছে। এর কারণ হিসেবে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেশাদারিত্বের অভাব, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও আমলানির্ভরতাকে দায়ী করা হচ্ছে। কক্সবাজারের মোটেল উপল-এর মতো স্থাপনা ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে সংস্কার করা হয়নি। পর্যটন মন্ত্রণালয় কর্তৃক অবৈধ হোটেল চিহ্নিত করার নির্দেশ দেওয়া হলেও কক্সবাজারের প্রায় অর্ধেক হোটেলই অনিবন্ধিত। পারকি সমুদ্র সৈকতে নির্মিত পর্যটন কমপ্লেক্স পরিদর্শনে গিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা প্রকল্পের কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও নিম্নমানের কাজ দেখে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, যেখানে ৭৯ কোটি ২৫ লাখ টাকার প্রকল্পে ৬০ শতাংশ কাজও শেষ হয়নি এবং পূর্ববর্তী সরকারের আমলে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এছাড়াও, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে 'অস্তিত্বহীন' উন্নয়ন প্রকল্পে সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অভিযানে উন্মোচিত হয়েছে। এমনকি বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের প্রকৌশলী বিভাগে পদোন্নতি প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অসংগতির অভিযোগ ওঠায় সম্প্রতি সব ধরনের পদোন্নতি কার্যক্রম স্থগিত করা হয়েছে।
এই দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাতের অপার সম্ভাবনা অধরাই থেকে যাচ্ছে। অবকাঠামোগত দুর্বলতা, অপর্যাপ্ত বিনিয়োগ, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা এবং সমন্বয়হীনতা এই খাতের দ্রুত বিকাশে বড় বাধা। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের ২০২২ সালের 'ভ্রমণ ও পর্যটন উন্নয়ন সূচক' অনুযায়ী, বিশ্বের ১১৯টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯তম, যা দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো দেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক হলেও এগুলোর সুরক্ষা ও সংরক্ষণে উদাসীনতা জাতীয় পরিচিতিকে হুমকির মুখে ফেলছে। এই খাতগুলোর উন্নয়নে সঠিক পরিকল্পনা, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন অপরিহার্য হলেও, দুর্নীতির কারণে তা বারবার ব্যাহত হচ্ছে।
সুপারিশ: বাংলাদেশের পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব খাতের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে অবিলম্বে একটি সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা প্রয়োজন। প্রথমত, প্রত্নসম্পদ পাচার রোধে বিদ্যমান আইনগুলোকে যুগোপযোগী করে কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বাড়াতে হবে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি তদন্তে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী কমিটি গঠন করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। দ্বিতীয়ত, পর্যটন খাতে সিন্ডিকেট ও হয়রানি বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নিয়মিত মনিটরিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের হোটেল-মোটেলগুলোর আধুনিকায়ন ও সেবার মান উন্নয়নে বেসরকারি খাতের সঙ্গে অংশীদারিত্ব বাড়ানো যেতে পারে এবং এর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, অবৈধ হোটেল ও রিসোর্ট চিহ্নিত করে তাদের আইনি কাঠামোর আওতায় আনা এবং মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করতে হবে। চতুর্থত, পর্যটন ও প্রত্নতত্ত্ব সংক্রান্ত সকল উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে দুর্নীতি দমন কমিশনকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে এবং 'অস্তিত্বহীন' প্রকল্পের নামে অর্থ আত্মসাৎ বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। পরিশেষে, এই খাতগুলোর উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সকল অংশীজনের কার্যকর সমন্বয় অপরিহার্য।