বাংলাদেশের আবাসন খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলেও এটি গভীর দুর্নীতি ও অনিয়মের জালে আবদ্ধ। সাধারণ মানুষের আবাসন স্বপ্ন প্রায়শই প্রতারণা, হয়রানি এবং দুর্নীতির কারণে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়। ভূমি রেজিস্ট্রেশন অফিস থেকে শুরু করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এবং কিছু অসাধু আবাসন প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে এই খাতে ব্যাপক অনিয়ম চলছে। সম্প্রতি বিভিন্ন তদন্ত ও প্রতিবেদনে এই খাতের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, যা সুশাসনের অভাব এবং জবাবদিহিতার ঘাটতিকেই প্রকট করে তোলে।
ভূমি রেজিস্ট্রেশন অফিসগুলো দুর্নীতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সরকারি ভূমি রেজিস্ট্রেশন অফিসগুলোতে দুর্নীতির ১০টি প্রধান উৎস চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে বিতর্কিত জমি রেজিস্ট্রেশন এবং জমির প্রকৃত বিনিময় মূল্য কম দেখিয়ে রেজিস্ট্রেশন করা অন্যতম, যেখানে দলিল লেখক ও সাব-রেজিস্ট্রারদের যোগসাজশ থাকে। ২০২০-২০২১ সালের দ্বিবার্ষিক প্রতিবেদনে দুদক এই তথ্য প্রকাশ করে। ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল সেবা চালু করা হলেও, এখনও ঘুষ গ্রহণ, হয়রানি, দালালদের দৌরাত্ম্য এবং নামজারিতে দীর্ঘসূত্রিতা একটি সাধারণ চিত্র। উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি সাভারের সাব-রেজিস্ট্রার জাকির হোসেনকে দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে তার দায়িত্ব থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়া, মৌজা ম্যাপ, খতিয়ান বা দলিলে কারচুপি এবং ক্ষতিপূরণের টাকা প্রদানে দুর্নীতির অভিযোগও নিয়মিত পাওয়া যায়।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) দুর্নীতির আরেকটি বড় আখড়া হিসেবে পরিচিত। হাইকোর্ট রাজউকের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধান করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, উচ্চমান সহকারী থেকে শুরু করে নিম্নমান সহকারী পর্যন্ত অনেক কর্মচারী ২০-৩০ হাজার টাকা মাসিক বেতন পেয়েও রাজধানীতে এক বা একাধিক বহুতল বাড়ি, আধুনিক গাড়ি, প্লট, ফ্ল্যাট ও দোকানপাটের মালিক। নকশা অনুমোদনে রাজউকের কর্মকর্তারা ব্যক্তি পর্যায়ে ৫০ হাজার থেকে ৪.৫ লাখ টাকা এবং রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারদের কাছ থেকে ২ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেন। এমনকি ১০ তলার বেশি ইমারতের নকশা অনুমোদনে রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারদের ১৫ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত ঘুষ দিতে হয়। রাজউক সরকারি ভূমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিধিবদ্ধ বিধান ও প্রক্রিয়া ক্রমাগত এবং ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘন করে বিশেষ সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের অনুকূলে কাজ করেছে বলে আদালতের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে। রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ৫ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার এবং পূর্বাচল কনভেনশন লিমিটেডে প্লট বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখছে দুদক।
আবাসন ব্যবসার নামে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের ঘটনাও অহরহ ঘটছে। 'সেবা আইডিয়াল অ্যান্ড লিভিং লিমিটেড' নামক একটি প্রতিষ্ঠান ১ লাখ টাকা লগ্নিতে দুই বছরে দ্বিগুণ লাভের প্রলোভন দেখিয়ে অন্তত ৫৭ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। একইভাবে, 'হলিস্টিক হোম বিল্ডার্স লিমিটেড' নামক প্রতিষ্ঠানের একজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালককে (ডিএমডি) প্রায় ১২০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের কাছাকাছি 'ওয়েলকেয়ার সিটি' আবাসন প্রকল্প জলাশয়, আবাদি জমি ও ফ্লাড ফ্লো-জোন দখল করে রাজউকের অনুমোদন ছাড়াই গড়ে তোলা হয়েছিল, যার ফলে দুই হাজার প্লট ক্রেতা প্রতারিত হয়েছেন এবং ৪০টি পৃথক প্রতারণার মামলা দায়ের করেছেন। 'গ্রেটওয়াল ল্যান্ড প্রোপার্টিজ লিমিটেড' নামক আরেকটি প্রতিষ্ঠানও পূর্বাচলে শতাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে প্লটের টাকা নিয়েও তা বুঝিয়ে দেয়নি, বরং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে গ্রাহকদের হয়রানি করেছে। রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (রিহ্যাব) জানিয়েছে, তাদের কাছে ফ্ল্যাট প্রতারণার শতাধিক অভিযোগ জমা পড়েছে, যার বেশিরভাগই রিহ্যাবের সদস্য নয় এমন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।
এই খাতের সামগ্রিক পরিস্থিতিও বহুমুখী সংকটে জর্জরিত। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, উচ্চ সুদের হার, নির্মাণ উপকরণের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ)-এর মতো নীতিগত জটিলতা আবাসন খাতকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। নগর পরিকল্পনার অভাব, জমির দুষ্প্রাপ্যতা এবং একদল 'অলিগার্কিক ল্যান্ড ডেভেলপারদের' একচ্ছত্র আধিপত্য সাশ্রয়ী আবাসনের পথ রুদ্ধ করছে। এমনকি সরকারি প্রকল্পেও দুর্নীতির চিত্র দেখা গেছে। '৩৬ জুলাই' নামক একটি আবাসন প্রকল্পে শহীদ ও আহতদের পরিবারের জন্য গৃহীত প্রকল্পে বিভিন্ন উপাদানে ৩ থেকে ৪৫ গুণ বেশি ব্যয় দেখানো হয়েছে, যা জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এই সকল অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে আবাসন খাত বিনিয়োগ হারানো এবং সাধারণ মানুষের আস্থা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
সুপারিশ: বাংলাদেশের আবাসন খাতকে দুর্নীতিমুক্ত, স্বচ্ছ ও জনবান্ধব করতে হলে ভূমি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজড করে দালালমুক্ত করতে হবে এবং সাব-রেজিস্ট্রার ও দলিল লেখকদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। রাজউকের সকল স্তরে দুর্নীতি দমনে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে, বিশেষ করে নকশা অনুমোদন ও প্লট বরাদ্দে স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) রাজউক এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থার কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উত্থাপিত দুর্নীতির অভিযোগগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে তদন্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আবাসন ডেভেলপারদের প্রতারণা রোধে রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং রিহ্যাবের সদস্য নয় এমন প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। এছাড়া, ড্যাপের মতো নীতিগত বিষয়গুলো আবাসন খাতের অংশীজনদের সাথে আলোচনা করে বাস্তবসম্মত ও জনকল্যাণমুখী করতে হবে এবং সরকারি আবাসন প্রকল্পগুলোতে ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও নিরীক্ষা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।