রেল ও নৌপথে দুর্নীতির কালোছায়া: হাজার কোটি টাকার লুটপাট ও জনদুর্ভোগ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

রেল ও নৌপথে দুর্নীতির কালোছায়া: হাজার কোটি টাকার লুটপাট ও জনদুর্ভোগ

নুসরাত জাহান  avatar   
নুসরাত জাহান
রেল ও নৌপথে দুর্নীতির কালোছায়া: হাজার কোটি টাকার লুটপাট ও জনদুর্ভোগ
রেল ও নৌপথে দুর্নীতির কালোছায়া: হাজার কোটি টাকার লুটপাট ও জনদুর্ভোগ
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি খাত হলো রেলওয়ে এবং নৌ-পরিবহন। দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে এ দুটি খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে দুঃখজনক হল...

বাংলাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুটি খাত হলো রেলওয়ে এবং নৌ-পরিবহন। দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে এ দুটি খাতের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, এই গুরুত্বপূর্ণ খাত দুটি দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অব্যবস্থাপনার এক কালোছায়ায় আচ্ছন্ন। সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন ও তদন্তে উঠে এসেছে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক কেলেঙ্কারি, নিয়োগ বাণিজ্য, জমি দখল এবং যাত্রী সুরক্ষায় চরম অবহেলার চিত্র। এই অনিয়মগুলো কেবল রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতিই করছে না, বরং সাধারণ মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

বাংলাদেশ রেলওয়েতে দুর্নীতির চিত্র অত্যন্ত ভয়াবহ। ২০১৯-২০ এবং ২০২০-২১ অর্থবছরেই রেলওয়েতে ৭৭ কোটি টাকার বেশি আর্থিক অনিয়ম হয়েছে, যা কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেলের (সিএজি) নিরীক্ষায় উঠে এসেছে। ডেমু ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি ও যন্ত্রাংশ ক্রয় এবং মেরামত দেখিয়ে টাকা উত্তোলন, বাজারমূল্যের চেয়ে বেশি দামে মালামাল কেনা, কারখানায় লোকো-কোচ-ওয়াগন না থাকা সত্ত্বেও মালামাল বাবদ খরচ দেখিয়ে বিল উত্তোলন, এবং কোনো মালামাল না কিনেই চালান দেখিয়ে টাকা নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এমনকি নিজস্ব কারখানায় কাজ করার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ঠিকাদার দিয়ে কাজ করানো এবং প্রয়োজন না থাকলেও অতিরিক্ত মালামাল ক্রয় করে সরকারের আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে। এছাড়া, রাষ্ট্রের ৩৫৮ কোটি টাকা ক্ষতির অভিযোগে বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক মহাপরিচালক শামসুজ্জামানসহ ছয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) মামলা করেছে। ১২৫টি লাগেজ ভ্যান কেনার সিদ্ধান্তে 'অবাস্তব ও বিকৃত' তথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে এই ক্ষতি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে ১৩ হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক অনিয়মের তথ্য দিয়েছে সরকারি অডিট। প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি এবং নিম্নমানের কাজের বিপরীতে অতিরিক্ত বিল পরিশোধের অভিযোগ উঠেছে। তৎকালীন প্রকল্প পরিচালক আফজাল হোসেনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাকে রেলের মহাপরিচালক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, যা জবাবদিহিতার অভাবকে প্রকট করে তোলে। আখাউড়া-লাকসাম ডুয়েল গেজ ডাবল রেললাইন নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালককে দুর্নীতির মামলায় অপসারণ করা হয়েছে।

নিয়োগ বাণিজ্য রেলওয়েতে দুর্নীতির আরেকটি বড় ক্ষেত্র। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে ৮৬৩ জন খালাসি নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক মহাব্যবস্থাপকসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে দুদক মামলা করেছে। জাল সনদ, বয়স জালিয়াতি এবং স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। এই মামলার তদন্ত তিন বছর পেরিয়ে গেলেও বিচারকাজ শুরু হয়নি। এছাড়াও, ১৮৫ জন সিপাহি নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগে সাবেক জিএমসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে দুদক মামলা করেছে। রেলওয়ের জমি দখলও একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা। সারাদেশে রেলওয়ের প্রায় ২৩ হাজার একরের বেশি জমি বেদখল হয়ে আছে। গাজীপুর, নাটোর ও খিলক্ষেতসহ বিভিন্ন স্থানে প্রভাবশালীরা রেলের জমিতে অবৈধভাবে দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এমনকি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও পার্ক নির্মাণ করেছে। উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলেও কিছুদিনের মধ্যেই আবার এসব জমি বেদখল হয়ে যায়, যা স্থানীয় প্রভাবশালীদের ছত্রছায়া এবং প্রশাসনের রহস্যজনক নীরবতার ইঙ্গিত দেয়। ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি রোধে সরকার 'টিকিট যার ভ্রমণ তার' নীতি চালু করলেও, সহজ ডটকম এবং রেলের কর্মচারীদের সিন্ডিকেট ফেসবুক গ্রুপ ও অন্যান্য উপায়ে কালোবাজারি চালিয়ে যাচ্ছে, যেখানে টিকিট দ্বিগুণেরও বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। রেললাইনের রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলাও বড় ধরনের অনিয়ম। রেললাইনের নাট-বল্টু, হুক, ফিসপ্লেট, স্লিপারসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ অবহেলিত থাকায় প্রায়শই ট্রেন লাইনচ্যুতির ঘটনা ঘটছে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও রিপোর্ট আলোর মুখ দেখে না এবং দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত হয় না।

নৌ-পরিবহন খাতেও দুর্নীতির চিত্র উদ্বেগজনক। নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমডোর নিজামুল হককে উপকূলীয় এলাকায় সাতটি রেডিও স্টেশন ও লাইটহাউজ প্রকল্পে আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়ায় প্রত্যাহার করা হয়েছে। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) অতিরিক্ত পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে দুদক। নৌপরিবহন অধিদপ্তরে সিডিসি (সার্টিফিকেট অব কম্পিটেন্সি) প্রদানে ১৪ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে অযোগ্য প্রার্থীদের সনদ দেওয়া হয়েছে। হাইকোর্ট দুদককে এ বিষয়ে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে। অভিযোগকারী একজন নাবিকের সিডিসি সনদ স্থগিত করা হয়েছে, যা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগকারীদের সুরক্ষার অভাবকে তুলে ধরে। নৌপথে চাঁদাবাজি ও ডাকাতি একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। চট্টগ্রাম-মোংলা, বরিশাল থেকে পাবনার বাঘাবাড়ী পর্যন্ত নৌপথে জলদস্যুদের উৎপাত, বিভিন্ন ঘাটে চাঁদাবাজি ও ডাকাতি বেড়েছে। ঠিকঠাক চাঁদা না পেলে নৌশ্রমিকদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নীরবতা এবং কিছু অসাধু কর্মকর্তার মদদে এই চাঁদাবাজি চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। গত সাত বছরে নৌপথে ৪৭৯১টি দুর্ঘটনায় ৪২৩৮ জনের প্রাণহানি হয়েছে। অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ত্রুটিপূর্ণ কাঠামো, অদক্ষ চালক এবং অনিবন্ধিত নৌযান দুর্ঘটনার প্রধান কারণ। 'অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল আইন, ২০২১' এর খসড়া আটকে আছে, যার ফলে নৌপথে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। সম্প্রতি বিআইডব্লিউটিএ’র দুই কর্মকর্তাকে জ্বালানি তেল সরবরাহের ঠিকাদারি কাজে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

এই সামগ্রিক পরিস্থিতি দেশের রেল ও নৌ-পরিবহন খাতের দুর্বল শাসনব্যবস্থা, জবাবদিহিতার অভাব এবং আইনের শাসনের অনুপস্থিতিকেই নির্দেশ করে। উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়া এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণে দীর্ঘসূত্রিতা বা নিষ্ক্রিয়তা সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি করছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম, নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, এবং জননিরাপত্তায় অবহেলা এই খাতগুলোকে আরও ভঙ্গুর করে তুলছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো কিছু পদক্ষেপ নিলেও, তা সমস্যার গভীরতা বিবেচনায় যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ ছাড়া এই দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া কঠিন।

সুপারিশ: রেলওয়ে ও নৌ-পরিবহন খাতে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে নিম্নলিখিত সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা জরুরি: ১. সকল উন্নয়ন প্রকল্পে তৃতীয় পক্ষের স্বাধীন নিরীক্ষা ও তদারকি বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে জড়িতদের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, পদোন্নতির পরিবর্তে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ২. রেলওয়ে ও নৌ-পরিবহন খাতে সকল নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করতে হবে, যেখানে মানবীয় হস্তক্ষেপ ন্যূনতম পর্যায়ে থাকবে। নিয়োগ সংক্রান্ত সকল অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দোষীদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ৩. রেলওয়ে ও নৌ-পরিবহন খাতের সকল জমি ও সম্পদ ডিজিটাল পদ্ধতিতে সংরক্ষণ ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। অবৈধ দখলদারদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং উচ্ছেদ অভিযানকে টেকসই করতে হবে। ৪. নৌপথে চাঁদাবাজি ও ডাকাতি বন্ধে নৌ পুলিশ ও কোস্টগার্ডের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তাদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। নৌপথে নিরাপত্তা জোরদার করতে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং নিয়মিত টহল বাড়াতে হবে। ৫. নৌযান দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নৌযানের ফিটনেস, রেজিস্ট্রেশন এবং চালকদের দক্ষতা যাচাইয়ে কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করতে হবে। অনিবন্ধিত নৌযান চলাচল বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং 'অভ্যন্তরীণ নৌ চলাচল আইন, ২০২১' দ্রুত চূড়ান্ত ও বাস্তবায়ন করতে হবে। ৬. টিকিট কালোবাজারি রোধে এনআইডিভিত্তিক টিকিট ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে এবং কালোবাজারি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে। ৭. দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) রেল ও নৌ-পরিবহন খাতে দুর্নীতির তদন্তে আরও ক্ষমতা ও স্বাধীনতা দিতে হবে এবং তদন্তের ফলাফল দ্রুত প্রকাশ ও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: নুসরাত জাহান

নুসরাত জাহান, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: রেলওয়ে ও নৌ-পরিবহন ওয়াচ।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator