তিস্তার জলবণ্টন: এক দশক ধরে ঝুলে থাকা চুক্তি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পানিসুরক্ষা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

তিস্তার জলবণ্টন: এক দশক ধরে ঝুলে থাকা চুক্তি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পানিসুরক্ষা

সায়েম মালিক  avatar   
সায়েম মালিক
তিস্তার জলবণ্টন: এক দশক ধরে ঝুলে থাকা চুক্তি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পানিসুরক্ষা
তিস্তার জলবণ্টন: এক দশক ধরে ঝুলে থাকা চুক্তি ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পানিসুরক্ষা
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিস্তা নদীর জলপ্রবাহ শুষ্ক মৌসুমে গত দশকে গড়ে ৪০% কমেছ...

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিস্তা নদীর জলপ্রবাহ শুষ্ক মৌসুমে গত দশকে গড়ে ৪০% কমেছে, যা রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার প্রায় ১.৫ মিলিয়ন হেক্টর কৃষি জমিতে সেচ কার্যক্রমে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিশেষত, তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের আওতাধীন প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার হেক্টর জমিতে যেখানে প্রায় ৮৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান সম্ভব হওয়ার কথা, সেখানে পর্যাপ্ত পানির অভাবে মাত্র ২৫-৩০ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব হচ্ছে। এই সংকট শুধুমাত্র কৃষিক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নেই, বরং স্থানীয় জীববৈচিত্র্য, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এবং সামগ্রিক পরিবেশের উপরও সুদূরপ্রসারী চাপ সৃষ্টি করছে, যা বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ পানিসুরক্ষাকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

তিস্তা নদীর জলবণ্টন চুক্তি নিয়ে এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে আলোচনা চললেও, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্য সরকারের আপত্তির কারণে এটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফরের সময় এই চুক্তি স্বাক্ষরের কথা থাকলেও, শেষ মুহূর্তে তা স্থগিত হয়ে যায়। এরপর থেকে প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে, বিশেষ করে জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাস পর্যন্ত, তিস্তার ভারতীয় অংশে গজলডোবা ব্যারাজের মাধ্যমে একতরফাভাবে জল প্রত্যাহার করায় বাংলাদেশের অংশে পানির প্রবাহ উদ্বেগজনক হারে কমে যায়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE)-এর তথ্যমতে, তিস্তা অববাহিকায় ধান, পাট, গম ও ভুট্টা চাষে প্রতি বছর প্রায় ৩৫০-৪০০ বিলিয়ন লিটার পানি প্রয়োজন হয়, কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে গড় প্রবাহ ২০০০ কিউসেকের নিচে নেমে আসায় এই চাহিদা পূরণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর ফলে, তিস্তা ক্যানাল সেচ প্রকল্পের আওতাধীন এলাকাগুলোতে প্রতি বছর প্রায় ৫০,০০০ থেকে ৭০,০০০ হেক্টর জমি সেচ সুবিধার বাইরে থেকে যাচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে প্রান্তিক কৃষকদের জীবন-জীবিকা এবং জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তার উপর। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, তিস্তার পানি স্বল্পতার কারণে রংপুর অঞ্চলের বোরো ধানের উৎপাদন ক্ষমতা গত পাঁচ বছরে গড়ে ১৫-২০% হ্রাস পেয়েছে, যা দেশের চাল উৎপাদনে একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

এই দীর্ঘমেয়াদী জলসংকটের ফলে শুধু কৃষিক্ষেত্রে নয়, পরিবেশগত ও আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রেও গভীর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI)-এর বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন যে, তিস্তার পানির স্তর কমে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির উপর চাপ বাড়ছে, যার ফলে নলকূপের মাধ্যমে সেচ ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কিছু এলাকায় আর্সেনিকের মতো দূষণকারী পদার্থের উপস্থিতি বাড়ছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, তিস্তা নদীর জীববৈচিত্র্যে মারাত্মক অবনতি ঘটেছে; শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবে মিঠাপানির মাছের প্রজাতি এবং জলজ উদ্ভিদের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। তিস্তার চরাঞ্চলে বসবাসকারী লাখ লাখ মানুষ সরাসরি নদীর উপর নির্ভরশীল। মাছ ধরা, পশুপালন এবং কৃষিকাজ তাদের প্রধান জীবিকা। পানির অভাবে এসব কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় তাদের জীবনযাত্রার মান ক্রমশ নিম্নগামী হচ্ছে, যা আঞ্চলিক দারিদ্র্য ও খাদ্য নিরাপত্তাহীনতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। উপরন্তু, পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় নদীর নাব্যতা হ্রাস পাচ্ছে, যা অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহনে বাধা সৃষ্টি করছে এবং নদী ভাঙন বাড়িয়ে তুলছে। এই বহুমুখী সংকট নিরসনে একটি টেকসই ও কার্যকর জলবণ্টন চুক্তির বাস্তবায়ন বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।

বছর শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার গড় প্রবাহ (কিউসেক) তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্পের আওতায় সেচকৃত জমি (হেক্টর) ভূগর্ভস্থ পানির স্তর হ্রাস (মিটার/বছর)
২০১৩ ৪৫০০ ৭০,০০০ ০.৮
২০১৫ ৩২০০ ৫৮,০০০ ১.১
২০১৭ ২৫০০ ৪৫,০০০ ১.৪
২০১৯ ২০০০ ৩০,০০০ ১.৬
২০২১ ১৮০০ ২৫,০০০ ১.৮
২০২৩ ১৭৫০ ২২,০০০ ১.৯

উৎস: বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (BWDB), কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE), এবং পরিবেশ অধিদপ্তর (DoE) এর সম্মিলিত প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদীর জলবণ্টন সংক্রান্ত একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তি দ্রুত বাস্তবায়নের জন্য বাংলাদেশ পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়কে ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকারের সাথে উচ্চপর্যায়ে নিয়মিত কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রাখতে হবে, বিশেষত 'যৌথ নদী কমিশন' (JRC)-এর প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে একটি ন্যায্য ও বিজ্ঞানভিত্তিক সমাধান বের করতে হবে, যেখানে নদীর বাস্তুতন্ত্রের ন্যূনতম প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে।
  • তিস্তা অববাহিকার কৃষি উৎপাদনশীলতা রক্ষায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এবং বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এর যৌথ উদ্যোগে খরা-সহনশীল ফসল, যেমন BRRI ধান ৮১, ৮৯, ৯২ এবং বারি গম-৩৩ এর জাতসমূহ প্রচলন ও সম্প্রসারণ করতে হবে এবং সেচ কার্যক্রমে 'ড্রিপ ইরিগেশন' ও 'স্প্রিঙ্কলার সিস্টেম' এর মতো পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহারে কৃষকদের উৎসাহিত করার জন্য 'জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৮' এর অধীনে বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করতে হবে।
  • তিস্তা নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধার এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে 'বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫' ও 'বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন ২০১২' এর অধীনে একটি সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে নদীর দু'ধারে বনায়ন, জলাভূমি সংরক্ষণ, এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর কমে যাওয়ার প্রভাব পর্যবেক্ষণের জন্য নিয়মিত পরিবেশগত প্রভাব সমীক্ষা (EIA) পরিচালনা করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সায়েম মালিক

সায়েম মালিক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: পানি সম্পদ ও আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator