ফিফা তহবিলের গোলকধাঁধা: তৃণমূল ফুটবলে পৌঁছায় কতটুকু? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ফিফা তহবিলের গোলকধাঁধা: তৃণমূল ফুটবলে পৌঁছায় কতটুকু?

জাহিদ রিজভি  avatar   
জাহিদ রিজভি
ফিফা তহবিলের গোলকধাঁধা: তৃণমূল ফুটবলে পৌঁছায় কতটুকু?
ফিফা তহবিলের গোলকধাঁধা: তৃণমূল ফুটবলে পৌঁছায় কতটুকু?
ছবি: সংগৃহীত
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ফিফার 'ফরোয়ার্ড প্রোগ্রাম ৩.০' এর অধীনে ২০২৫-২৮ সালের জন্য নির্ধারিত ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার তহবিল প্রাপ্তির...

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ফিফার 'ফরোয়ার্ড প্রোগ্রাম ৩.০' এর অধীনে ২০২৫-২৮ সালের জন্য নির্ধারিত ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার তহবিল প্রাপ্তির ঘোষণা দিয়েছে, যা দেশের ফুটবল উন্নয়নে ব্যয় হওয়ার কথা। তবে, এই অর্থের কতটুকু প্রকৃত অর্থে তৃণমূল পর্যায়ের ফুটবলারদের কাছে পৌঁছাচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে এবং ফুটবল বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর সংশয় বিদ্যমান। বিশেষত, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ফুটবল ক্লাব এবং একাডেমিগুলো প্রায়শই অভিযোগ করে যে, ফিফা বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে আসা তহবিলের সামান্য অংশই তাদের কাছে পৌঁছায়, যার ফলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ সরঞ্জাম এবং কোচিং প্রোগ্রামের মতো মৌলিক চাহিদাগুলো অপূর্ণ থেকে যায়।

এই বিশাল অঙ্কের তহবিলের উদ্দেশ্য হলো সদস্য অ্যাসোসিয়েশনগুলোকে ফুটবল উন্নয়নে সহায়তা করা, যার একটি বড় অংশ তৃণমূল ফুটবলের বিকাশ, যুব একাডেমি প্রতিষ্ঠা এবং কোচ ও রেফারি প্রশিক্ষণে ব্যয় করার কথা। কাগজে-কলমে এই অর্থ প্রতিটি সদস্য দেশের জন্য একটি বিশাল সুযোগ, কিন্তু বাস্তবে এর বিতরণ প্রক্রিয়া প্রায়শই অস্বচ্ছ এবং কেন্দ্রীভূত। উদাহরণস্বরূপ, গত এক দশকে ফিফা ফরোয়ার্ড প্রোগ্রামের অধীনে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) যে অর্থ পেয়েছে, তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জাতীয় দলের প্রস্তুতি, প্রশাসনিক ব্যয় এবং নির্দিষ্ট কিছু প্রকল্পের পেছনে ব্যয় হয়েছে, যেখানে তৃণমূলের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের সুষ্ঠু বন্টন ও ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এর বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পও একই ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।

তহবিল বিতরণে স্বচ্ছতার অভাব এবং জবাবদিহিতার দুর্বল কাঠামোই তৃণমূল পর্যায়ে অর্থ না পৌঁছানোর অন্যতম প্রধান কারণ। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশেষ করে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) মধ্যে সমন্বয়ের অভাবও একটি বড় বাধা। প্রায়শই দেখা যায়, আন্তর্জাতিক তহবিলগুলো সরাসরি জাতীয় ফেডারেশনের কাছে আসে এবং স্থানীয় পর্যায়ে এর ব্যবহারের তদারকি প্রক্রিয়া অত্যন্ত দুর্বল থাকে। ফলে, জেলা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলো (ডিএফএ) এবং স্থানীয় ক্লাবগুলো তাদের প্রয়োজনীয় অর্থ পায় না, যার কারণে তরুণ প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের খুঁজে বের করা এবং তাদের প্রশিক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো তৈরি করা সম্ভব হয় না। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (ADB) এর মতো সংস্থাগুলো যখন ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ করে, তখন তাদের প্রকল্পগুলোতেও স্থানীয় স্তরে কার্যকর তদারকির অভাবে প্রায়শই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায় না, যার ফলে অর্থ অপচয় হয় এবং তৃণমূলের উন্নতি ব্যাহত হয়।

এর ফলস্বরূপ, স্থানীয় পর্যায়ে ফুটবল কার্যক্রমগুলো মুখ থুবড়ে পড়ছে। একসময় বাংলাদেশের গ্রাম ও শহরতলীগুলোতে যে প্রাণবন্ত ফুটবল সংস্কৃতির ঢেউ ছিল, তা এখন ম্লান প্রায়। খেলোয়াড়দের জন্য ভালো মাঠের অভাব, মানসম্মত প্রশিক্ষকের অপ্রতুলতা এবং আর্থিক সহায়তার অভাবে অনেক প্রতিভাবান তরুণ খেলোয়াড় ফুটবল ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যেতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার যদিও ক্রীড়া উন্নয়নে প্রতি বছর বাজেট বরাদ্দ করে, কিন্তু ফিফার মতো আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে প্রাপ্ত তহবিলের সাথে এর সমন্বয় সাধন এবং তৃণমূল পর্যায়ে তা পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর কৌশল এখনও অনুপস্থিত। এটি শুধু খেলোয়াড়দের স্বপ্নই ভঙ্গ করছে না, দেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

অনুদান/তহবিল প্রদানকারী প্রোগ্রাম/প্রকল্প আনুমানিক তহবিল (মিলিয়ন মার্কিন ডলার) সময়কাল মন্তব্য
ফিফা (FIFA) ফরোয়ার্ড প্রোগ্রাম ৩.০ ৬.০০ ২০২৫-২০২৮ প্রতি সদস্য অ্যাসোসিয়েশনের জন্য বরাদ্দ, যার একটি অংশ তৃণমূলের জন্য নির্ধারিত।
ফিফা (FIFA) ফরোয়ার্ড প্রোগ্রাম ২.০ ৫.০০ ২০১৯-২০২২ পূর্ববর্তী প্রোগ্রামের অধীনে বাফুফে কর্তৃক প্রাপ্ত অনুদান।
এএফসি (AFC) উন্নয়ন তহবিল ১.০০ ২০২০-২০২৪ (আনুমানিক) এশিয়ান ফুটবল ফেডারেশনের অধীনস্থ অ্যাসোসিয়েশনগুলির জন্য।
বাংলাদেশ সরকার (যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়) জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বাজেট ০.৫০ (ফুটবল অংশ, আনুমানিক) ২০২৩-২০২৪ ফুটবল উন্নয়নে সরকারি বাজেট, যা জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ কর্তৃক পরিচালিত।

উৎস: ফিফা ফরোয়ার্ড রিপোর্ট, এএফসি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম, বাংলাদেশ সরকারের বার্ষিক বাজেট প্রতিবেদন (বিভিন্ন বছরের তথ্য সংকলিত)।

সুপারিশ

  • জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ (National Sports Council) এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) এর মধ্যে একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠন করা হোক, যা ফিফা ফরোয়ার্ড প্রোগ্রামের মতো আন্তর্জাতিক তহবিল বিতরণে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে এবং তহবিল ব্যবহারের প্রতিটি ধাপে অডিট প্রক্রিয়া বাধ্যতামূলক করবে। এই টাস্কফোর্সকে স্থানীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (জেলা ও উপজেলা পর্যায়) এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে তৃণমূলের চাহিদা সরাসরি প্রতিফলিত হয়।
  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) যৌথভাবে একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে, যেখানে ফিফা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে প্রাপ্ত প্রতিটি তহবিলের উৎস, পরিমাণ, বরাদ্দ এবং ব্যয়ের বিস্তারিত তথ্য সর্বজনীনভাবে প্রকাশ করা হবে। এই প্ল্যাটফর্মে প্রতিটি স্থানীয় ক্লাব বা একাডেমির জন্য বরাদ্দকৃত তহবিলের পরিমাণ এবং ব্যবহারের অগ্রগতি ট্র্যাক করার ব্যবস্থা থাকবে, যা ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এর উন্নয়ন প্রকল্পগুলিতে ব্যবহৃত জবাবদিহিতা মডেলের অনুকরণে হতে পারে।
  • বাংলাদেশ সরকার, জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ এবং বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) এর মধ্যে একটি ত্রিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষর করা হবে, যেখানে ফিফা এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে প্রাপ্ত অর্থের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ (যেমন, কমপক্ষে ৩০%) সরাসরি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের ফুটবল একাডেমী এবং ক্লাবগুলির অবকাঠামো উন্নয়ন, সরঞ্জাম সংগ্রহ এবং কোচিং প্রশিক্ষণে ব্যয় করার জন্য বাধ্যতামূলক করা হবে। এই চুক্তি ADB (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) এর প্রকল্প বাস্তবায়নের কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করে একটি স্বাধীন মূল্যায়ন কমিটি দ্বারা নিয়মিত তদারকি করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহিদ রিজভি

জাহিদ রিজভি 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ফুটবলের তৃণমূল উন্নয়ন ও ফিফা ফান্ডিং। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator