২০২২ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের ভারতীয় অংশে বাঘের মূল শিকার হরিণের সংখ্যা বিগত এক দশকে প্রায় ১৫% হ্রাস পেয়েছে, যার প্রধান কারণ হিসেবে লবণাক্ততার বৃদ্ধিতে মিষ্টি জলের উৎস কমে যাওয়াকে দায়ী করা হয়েছে। একই সময়ে, বাংলাদেশ বন বিভাগ ও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌথ পর্যবেক্ষণে সুন্দরবনের বাংলাদেশ অংশে বাঘের বিচরণক্ষেত্র ও শিকারের সহজলভ্যতায় উদ্বেগজনক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। বিশেষ করে, শরণখোলা রেঞ্জের অভ্যন্তরে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাঘের লোকালয়ে প্রবেশের ঘটনা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বনের অভ্যন্তরে খাদ্য ও জলের সংকটের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত বহন করে। এই সংকট কেবল বাঘের খাদ্যশৃঙ্খলকেই ব্যাহত করছে না, বরং সমগ্র বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্যকে মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনেও সুন্দরবনের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশকে দেশের জীববৈচিত্র্যের জন্য অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা ম্যানগ্রোভ বনের নিজস্ব অভিযোজন ক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
সুন্দরবনের প্রাণকেন্দ্র দিয়ে বয়ে যাওয়া নদী ও খালের মিষ্টি জলের প্রবাহ কমে যাওয়ায় সমগ্র বাস্তুতন্ত্রে লবণাক্ততার মাত্রা অপ্রত্যাশিতভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারত থেকে আসা উজানের পানির প্রবাহ হ্রাস এবং বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি — এই দুটি প্রধান কারণ সম্মিলিতভাবে এই সংকটকে তীব্রতর করেছে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়েছে সুন্দরবনের উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের উপর। রয়েল বেঙ্গল টাইগার, যার জীবনচক্র মিষ্টি জলের উৎস এবং নির্দিষ্ট প্রজাতির উদ্ভিদ ও প্রাণীর উপর নির্ভরশীল, তারা এই পরিবর্তনের শিকার হচ্ছে। বাঘের অন্যতম প্রধান শিকার চিত্রা হরিণ, বুনো শুয়োর এবং অন্যান্য ছোট প্রাণীর খাদ্য ও জলের উৎস লবণাক্ততার কারণে দূষিত হচ্ছে বা কমে যাচ্ছে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের অভ্যন্তরে মিষ্টি জলের পুকুর ও জলাধারগুলোর লবণাক্ততার মাত্রা শুষ্ক মৌসুমে বিপদসীমা অতিক্রম করে, যা বাঘসহ অন্যান্য বন্যপ্রাণীর জন্য পানীয় জলের তীব্র সংকট তৈরি করে। এর ফলে বাঘেরা বাধ্য হচ্ছে লোকালয়ের কাছাকাছি আসতে, যা মানুষ-বাঘ সংঘাতের ঝুঁকি বৃদ্ধি করছে এবং বাঘের স্বাভাবিক আচরণে পরিবর্তন আনছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর এক গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে যে, লবণাক্ততা বৃদ্ধি সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ প্রজাতির গাছের বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে, যা দীর্ঘমেয়াদে বনের ঘনত্ব ও খাদ্যশৃঙ্খলের ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে।
লবণাক্ততার এই আগ্রাসন সুন্দরবনের ইকোসিস্টেমের ভঙ্গুরতা প্রকটভাবে তুলে ধরেছে। কেবলমাত্র বাঘ বা হরিণ নয়, ম্যানগ্রোভ বনের অসংখ্য প্রজাতির পাখি, সরীসৃপ এবং উভচর প্রাণীও তাদের স্বাভাবিক আবাসস্থল হারাচ্ছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর উপকূলীয় কৃষি গবেষণা কেন্দ্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, সুন্দরবনের সংলগ্ন কৃষি জমিতেও লবণাক্ততার কারণে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং বনের উপর তাদের নির্ভরশীলতা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই নির্ভরশীলতা অবৈধভাবে বনজ সম্পদ আহরণ এবং বন্যপ্রাণী শিকারের প্রবণতা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা বাঘের অস্তিত্বকে আরও বিপন্ন করছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় লবণাক্ত সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন ও বিতরণে জোর দেওয়া হলেও, বনের অভ্যন্তরে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে আরও সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। লবণাক্ততার কারণে খাদ্যশৃঙ্খলে সৃষ্ট অস্থিতিশীলতা বাঘের প্রজনন হারকেও প্রভাবিত করতে পারে, কারণ দুর্বল ও অসুস্থ মা বাঘিনী পর্যাপ্ত শিকারের অভাবে শাবকদের সঠিকভাবে লালনপালন করতে পারে না। এর দীর্ঘমেয়াদী ফলস্বরূপ বাঘের সংখ্যা হ্রাস পেতে পারে, যা সুন্দরবনের অনন্য জীববৈচিত্র্যের জন্য এক অশনি সংকেত।
| বছর | সুন্দরবনের মিষ্টি জলের উৎসগুলিতে লবণাক্ততার গড় বৃদ্ধি (%) | বাঘের লোকালয়ে প্রবেশের ঘটনা (সংখ্যা) | চিত্রা হরিণের সংখ্যা পরিবর্তন (%) | বনজ সম্পদে নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর সংখ্যা (হাজার) |
|---|---|---|---|---|
| ২০১৪ | ০.৮ | ৭ | -২.৫ | ১২০ |
| ২০১৬ | ১.২ | ৯ | -৪.০ | ১২৫ |
| ২০১৮ | ১.৫ | ১২ | -৫.৫ | ১৩০ |
| ২০২০ | ১.৯ | ১৫ | -৬.৮ | ১৩৫ |
| ২০২২ | ২.৩ | ১৮ | -৮.২ | ১৪০ |
উৎস: বাংলাদেশ বন বিভাগ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, BARC এবং DAE এর যৌথ গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন।
সুপারিশ
- পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়কে সমন্বিতভাবে 'সুন্দরবন সুরক্ষা ও লবণাক্ততা প্রতিরোধ আইন, ২০২৩' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে উজানে মিষ্টি জলের প্রবাহ নিশ্চিতকরণ এবং সুন্দরবনের অভ্যন্তরে মিষ্টি জলের উৎস সংরক্ষণ ও নতুন জলাধার তৈরির জন্য সুনির্দিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
- বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI)-কে যৌথভাবে সুন্দরবনের বাস্তুতন্ত্রের জন্য লবণাক্ততা সহনশীল ম্যানগ্রোভ প্রজাতির উদ্ভিদ এবং বন্যপ্রাণীর খাদ্য উপযোগী ঘাসের জাত উদ্ভাবন ও বিস্তারে গবেষণা প্রকল্প হাতে নিতে হবে, যা 'জাতীয় কৃষি নীতি ২০১৮' এর অধীনে অগ্রাধিকার পাবে।
- কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এবং বন বিভাগকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য টেকসই বিকল্প জীবিকা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বনের উপর নির্ভরশীলতা কমে। এর অংশ হিসেবে 'জাতীয় বন নীতি, ২০১৭' এর আলোকে উপকূলীয় মৎস্য চাষে লবণাক্ততা সহনশীল প্রজাতির সম্প্রসারণ এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন শিল্পের বিকাশে বিশেষ প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা প্রদানের কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে।