জলবায়ু তহবিলে ২১০০ কোটি টাকার দুর্নীতি: সুশাসনের চরম সংকট.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জলবায়ু তহবিলে ২১০০ কোটি টাকার দুর্নীতি: সুশাসনের চরম সংকট..

ওয়াসিফ ইকবাল  avatar   
ওয়াসিফ ইকবাল
জলবায়ু তহবিলে ২১০০ কোটি টাকার দুর্নীতি: সুশাসনের চরম সংকট..
জলবায়ু তহবিলে ২১০০ কোটি টাকার দুর্নীতি: সুশাসনের চরম সংকট..
ছবি: সংগৃহীত
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গঠিত তহবিল ও পরিবেশগত প্রকল্পগুলো দেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায.....

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গঠিত তহবিল ও পরিবেশগত প্রকল্পগুলো দেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে, সম্প্রতি ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর একাধিক গবেষণা প্রতিবেদন এবং দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর তদন্তে এই খাতে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে, যা গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। জলবায়ু তহবিল এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে সুশাসনের চরম সংকট দেশকে আরও ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

টিআইবি-এর এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ড (বিসিসিটিএফ)-এর অধীনে অনুমোদিত ৮৯১টি প্রকল্পে প্রায় ২,১১০ কোটি টাকা (প্রায় ২৪৮.৪ মিলিয়ন ডলার) দুর্নীতি ও আত্মসাতের ঘটনা ঘটেছে। এটি এই প্রকল্পগুলোর জন্য বরাদ্দকৃত মোট অর্থের অর্ধেকেরও বেশি, সুনির্দিষ্টভাবে ৫৪ শতাংশ। এই দুর্নীতির ক্ষেত্রগুলো ছিল বহুমুখী: প্রকল্প অনুমোদনে ঘুষ ও অবৈধ লেনদেন বাবদ ১৭৫ কোটি টাকা, ঠিকাদার নিয়োগে অনিয়মের মাধ্যমে ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ, এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে ১,২৮০ কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। এমনকি তদারকি পর্যায়েও ৫৪ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষ করে, সৌর সড়কবাতি স্থাপন সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোতে অতিমূল্যায়নের মাধ্যমে ১৭০ কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে টিআইবি অনুমান করে। এই অনিয়মগুলোতে রাজনৈতিক বিবেচনা, যোগসাজশ ও স্বজনপ্রীতির প্রবণতা স্পষ্ট ছিল, যেখানে বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট (বিসিসিটি)-এর কর্মকর্তারা অনিয়ম রোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু নিশ্চিত করেছেন যে, দুদক টিআইবি-এর এই অভিযোগগুলো তদন্ত করছে এবং ২০০৯-১০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত প্রকল্পের তথ্য দুদককে সরবরাহ করা হয়েছে।

জলবায়ু তহবিলের পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তরও দুর্নীতির করাল গ্রাসে নিমজ্জিত। টিআইবি-এর গবেষণা অনুযায়ী, পরিবেশ অধিদপ্তরে দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ ঘটেছে। পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান ও নবায়ন এই দুর্নীতির অন্যতম প্রধান ক্ষেত্র। জরিপে দেখা গেছে, ৬৬ শতাংশ শিল্পকারখানাকে পরিবেশগত ছাড়পত্র পেতে নিয়মবহির্ভূতভাবে ৩৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৮ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ দিতে হয়। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ৫৭ শতাংশ শিল্পকারখানা কোনো প্রকার পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা (ইএমপি) ছাড়াই ছাড়পত্র পেয়ে যায়। এমনকি আবাসিক এলাকায় শিল্পকারখানা স্থাপন নিষিদ্ধ হলেও, ৭২ শতাংশ কারখানার অবস্থান আবাসিক এলাকায়, যা অবৈধ ছাড়পত্রের মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে। অধিদপ্তরের 'নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ' প্রকল্পের অধীনে অযৌক্তিকভাবে একই কর্মকর্তার ১০ বারসহ মোট ২৯৩ জন কর্মকর্তার বিদেশে প্রশিক্ষণের নামে অর্থ অপচয় করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর এবং দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যোগসাজশের মাধ্যমে জরিমানা মওকুফ করা হয় বা ইটিপি (বর্জ্য শোধনাগার) অচল রাখা হয়। জনবলের তীব্র সংকটও (১১৪১টি পদের মধ্যে ৬৭৬টি শূন্য) অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করছে।

এই দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র কেবল জলবায়ু তহবিল বা পরিবেশ অধিদপ্তরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বন অধিদপ্তরের প্রায় ১,৫০০ কোটি টাকার 'টেকসই বন ও জীবিকা' (সুফল) প্রকল্পেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, যার তদন্ত শুরু করেছে দুদক। কৃষি ও পরিবেশ অডিট অধিদপ্তরও ২৬টি আপত্তিতে ১,৭১২.৫৪ কোটি টাকার অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে। খুলনার 'শেখ রাসেল ইকো পার্ক' নির্মাণে জলবায়ু তহবিল থেকে ৮.৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও, এটি তহবিল অপচয়ের একটি দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনা বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং পরিবেশ সংরক্ষণের প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। দেশের উপকূলীয় অঞ্চলগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ছে এবং এই পরিস্থিতিতে তহবিলের অপচয় ও দুর্নীতি জলবায়ু সহনশীলতা অর্জনের পথে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।

সরকার যদিও পরিবেশ ও জলবায়ু খাতে সুশাসন নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে এবং দুদক তদন্ত চালাচ্ছে, তবে এই ব্যাপক দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। জলবায়ু অর্থায়নের সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং এর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য আন্তর্জাতিকভাবেও আহ্বান জানানো হয়েছে। সম্প্রতি, জলবায়ু অর্থায়নে অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং অংশীদারদের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করতে বাংলাদেশ ক্লাইমেট ডেভেলপমেন্ট পার্টনারশিপ (বিডিসিপি)-এর একটি ওয়েব পোর্টাল তৈরির কাজ চলছে, যা স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। তবে, কেবল প্রযুক্তিগত সমাধানই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

সুপারিশ: জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা উচিত: ১. টিআইবি-এর প্রতিটি গবেষণা প্রতিবেদনের অভিযোগের ভিত্তিতে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ২. বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট (বিসিসিটি) এবং পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানে অভ্যন্তরীণ অডিট ও তদারকি ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে এবং এর কার্যকারিতা নিয়মিত জনসম্মুখে প্রকাশ করতে হবে। ৩. প্রকল্প অনুমোদন ও ঠিকাদার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব ও স্বজনপ্রীতি বন্ধ করে একটি কঠোর, স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক পদ্ধতি চালু করতে হবে। ৪. পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণরূপে ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করে মানবীয় হস্তক্ষেপ কমানো এবং ঘুষ লেনদেনের সুযোগ বন্ধ করতে হবে। ৫. পরিবেশ অধিদপ্তর ও বন অধিদপ্তরের মতো সংস্থাগুলোতে জনবল সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে এবং কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও নৈতিকতার মান উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে। ৬. জলবায়ু তহবিলের অর্থায়নে গৃহীত প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন, ব্যয় এবং ফলাফল সম্পর্কে নিয়মিতভাবে জনগণের কাছে তথ্য প্রকাশ বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। ৭. জলবায়ু অর্থায়নের সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং এর ব্যবহার নিরীক্ষণে একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী মনিটরিং কমিটি গঠন করতে হবে, যেখানে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: ওয়াসিফ ইকবাল

ওয়াসিফ ইকবাল, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্প অডিট।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator