সম্প্রতি, বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ (BHTPA) দেশের বিভিন্ন হাই-টেক পার্কে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ও টেস্টিং ফ্যাসিলিটি স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য একাধিক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সাথে প্রাথমিক আলোচনা শুরু করেছে, যা ২০২৫ সালের মধ্যে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজাইন সেন্টার প্রতিষ্ঠার রূপরেখা তৈরির ইঙ্গিত দেয়। যদিও সরাসরি চিপ উৎপাদন (ফ্যাব) এখনো সুদূর পরাহত, এই পদক্ষেপগুলো একটি 'ফ্যাববিহীন' মডেলের মাধ্যমে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকারের আশাবাদ জাগিয়ে তুলেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই স্বপ্ন কি কেবলই কল্পনার ফানুস, নাকি এর পেছনে রয়েছে একটি বাস্তবসম্মত রোডম্যাপ?
বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে প্রবেশাধিকারের আলোচনায় 'ফ্যাববিহীন' মডেল একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত দিক। এর অর্থ হলো, দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো চিপ ডিজাইন, গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D), এবং ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি (IP) সৃষ্টিতে মনোযোগ দেবে, যখন প্রকৃত উৎপাদন (ফ্যাব্রিকেশন) ভিনদেশী ফ্যাব্রিকেশন প্ল্যান্টগুলিতে আউটসোর্স করা হবে। এই মডেলটি তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর এবং ভারতের মতো দেশগুলোতে সফলভাবে ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে বিশাল বিনিয়োগের ফ্যাব স্থাপনের পরিবর্তে ডিজাইন ও উদ্ভাবনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে, ICT Division এর অধীনে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, ভিএলএসআই (VLSI) এবং এমবেডেড সিস্টেমের উপর দক্ষতা বিকাশের চেষ্টা চলছে। বিশেষ করে, a2i (অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন) প্রোগ্রাম বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে অংশীদারিত্বে এই খাতে দক্ষ জনবল তৈরির জন্য কারিকুলাম আধুনিকীকরণ এবং ল্যাব সুবিধা সম্প্রসারণে কাজ করছে। তবে, আন্তর্জাতিক মানের ডিজাইন টুলের সহজলভ্যতা এবং লাইসেন্সিং খরচ এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যা ছোট ও মাঝারি আকারের উদ্যোগগুলোর জন্য একটি বাধা।
এই খাতের উন্নয়নে BASIS (বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অফ সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস) এর সদস্যরা সফটওয়্যারভিত্তিক ডিজাইন ও টেস্টিং সেবায় নিজেদের সম্পৃক্ত করার আগ্রহ দেখালেও, প্রয়োজনীয় হার্ডওয়্যার ভিত্তিক অবকাঠামো এবং বিশেষায়িত ল্যাবের অভাব প্রকট। বিটিআরসি (BTRC) টেলিকমিউনিকেশন শিল্পের জন্য স্থানীয়ভাবে সেমিকন্ডাক্টর-ভিত্তিক ডিভাইস তৈরিতে নীতিমালা প্রণয়নের কথা ভাবলেও, এ পর্যন্ত কোনো সুনির্দিষ্ট ইনসেনটিভ প্যাকেজ বা দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ঘোষণা করা হয়নি। বৈশ্বিক ইলেকট্রনিক্স পণ্যের ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ইলেক্ট্রনিক্স অ্যাসেম্বলি শিল্পের বিকাশ সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইনের জন্য একটি প্রাকৃতিক বাজার তৈরি করতে পারে। তবে, এই সুযোগকে কাজে লাগানোর জন্য একটি সমন্বিত জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর কৌশল অপরিহার্য, যা কেবল ডিজাইন নয়, বরং প্যাকেজিং, টেস্টিং এবং এমনকি ছোট আকারের মডিউল অ্যাসেম্বলিতেও বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে। বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের দুর্বলতা এবং ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা বাংলাদেশকে স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য একটি সুযোগ করে দিয়েছে, তবে এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রীয় সমর্থন এবং বেসরকারি খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ।
| সূচক | ২০১৮ | ২০২১ | ২০২৪ (অনুমান) |
|---|---|---|---|
| বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজার (বিলিয়ন USD) | ৪৪৬ | ৫৮০ | ৬৮০ |
| বাংলাদেশের ইলেকট্রনিক্স আমদানি (মিলিয়ন USD) | ২,১০০ | ২,৭৫০ | ৩,২০০ |
| সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা বৃদ্ধি (বার্ষিক, বিশ্বব্যাপী) | ৮% | ১২% | ১৫% |
| BHTPA হাই-টেক পার্কে সেমিকন্ডাক্টর সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ (মিলিয়ন USD) | ০ | ২.৫ | ১০ (লক্ষ্য) |
উৎস: SIA, World Bank, BHTPA বার্ষিক প্রতিবেদন, বিভিন্ন শিল্প সমীক্ষা
সুপারিশ
- ICT Division কে একটি 'জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর কৌশল ২০৩৫' প্রণয়ন করতে হবে, যেখানে ফ্যাববিহীন মডেলের উপর জোর দিয়ে ডিজাইন, টেস্টিং ও IP ডেভেলপমেন্টের জন্য সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ, অর্থায়ন প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের কাঠামো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
- BHTPA কে হাই-টেক পার্কগুলোতে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন ও টেস্টিং ল্যাবের জন্য বিশেষ ইনসেনটিভ প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে, যার মধ্যে ট্যাক্স হলিডে, ডিজাইন টুল লাইসেন্সিংয়ে ভর্তুকি এবং বিদেশি বিশেষজ্ঞদের জন্য সহজ ভিসা নীতি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
- BASIS এবং BTRC কে যৌথভাবে একটি 'সেমিকন্ডাক্টর ইনোভেশন ফান্ড' প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা স্থানীয় স্টার্টআপ এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগগুলোকে সেমিকন্ডাক্টর ডিজাইন, এমবেডেড সিস্টেম ডেভেলপমেন্ট এবং আইওটি ডিভাইসের জন্য চিপ তৈরিতে গবেষণা ও উন্নয়নের জন্য সিড ফান্ডিং ও ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সহায়তা প্রদান করবে।